তারপর আরও কথা শোনবার জন্যে কান পেতে রইল।
নজর মহম্মদ বললে–চেহেল সুতুন কখনও বরবাদ হতে পারে মিঞাসাহেব?
সারাফত আলি বললে–চেহেল্-সুতুন তো চেহেল্ সুতুন, হিন্দুস্থানের বাদশা ভি বরবাদ হতে পারে। তোরাই তো বাদশাকে বাদশা বানিয়েছিস, তোরাই ফিন মরজি হলে বাদশাকে হটিয়ে দিতে পারিস। যে বাদশা চেহেল্-সুতুন বানায় সেবাদশাকে তোরা কেন রেখেছিস? তাকে হটিয়ে দে। না হটাতে পারিস তো বাদশার চেহেল্-সুতুন হটিয়ে দে!
নজর মহম্মদ আর বোধহয় শুনতে পারলে না। তার বোধহয় ভয়ভয় করতে লাগল। হিন্দুস্থানের মোগল-পাঠান নবাববাদশার নিমক খেয়ে খেয়ে যার হাড়মাংস সমস্ত কিছু বেড়ে উঠেছে, তার এসব কথা শুনলে তো ভয় করবেই।
আমি তা হলে আসি মিঞাসাহেব, আদাব
আর সঙ্গে সঙ্গে কান্ত এসে হাজির হয়েছে সামনে।
আরে কান্তবাবু? তুই কখন লৌট এলি?
নজর মহম্মদও ফিরতে গিয়ে কান্তকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই বাবুজিকে চেহেল্-সুতুনে নিয়ে গেলেই একটা মোহর দেবে সারাফত আলি। এক ফুঁ দিয়ে এক মোহরের মালিক হওয়া যাবে। অত সহজে এ বাবুজিকে এড়ানো যায় না।
আজ ভি চেহেল্-সুতুন যায়েঙ্গে জনাব?
সারাফত আলি জিজ্ঞেস করলে–কখন এলি রে তুই কান্তবাবু? আমার তো মালুম পড়েনি
কান্ত সেকথার উত্তর না-দিয়ে বললে–আমি আর ওনোকরি করব না মিঞাসাহেব। আমার আর ভাল লাগছে না। আমার আর ভাল লাগছে না ওনোকরি করতে!
তা না করিস ছেড়ে দে। আমি তো তোকে বলেই দিয়েছি আমি তোকে খিলাব। লেক চেহেল্-সুতুন পে যানে হোগা, ওই যা তাকে বলেছি সব করতে হবে!
নজর মহম্মদ আবার জিজ্ঞেস করলে–আজ ভি যাইয়ে গা জনাব?
সারাফত আলি বললো রে বাবা, যাবে, যাবে! তোকেও তো বলেছি মোহর মিলেগা
কথা আদায় করে নিয়ে নজর মহম্মদ চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার দিকে একটা হইহই হল্লা উঠল। চকবাজারের সমস্ত লোক হইহই করে ভিড় করে উঠল কাকে ঘিরে। ক্যা হুয়া? কী হয়েছে? সকলের মুখেই এক কথা। চকবাজারের দোকানদাররা পর্যন্ত ছুটে গিয়ে হাজির হল রাস্তার মধ্যে। একটা বুড়ো মানুষ মাথায় করে সরাব নিয়ে যাচ্ছিল। মাটির হাঁড়িতে সরাব ছিল। পাশ দিয়ে নবাবের হাতির দল পিলখানায় যাচ্ছিল, ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে বুড়োকে। জায়গাটা গন্ধে ভুরভুর করছে একেবারে।
কান্ত কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চারদিকে মানুষের ভিড়। ভেতর দিয়ে ঢোকা দায়।
কী হয়েছে লোকটার?
আরে মশাই, মিঞাসাহেব আর একটু হলে হাতির পায়ের তলায় চাপা পড়ত। খোদা বাঁচিয়ে দিয়েছে–
লোকটা কে?
ইব্রাহিম খাঁ।
কে ইব্রাহিম খা?
আরে ইব্রাহিম খাঁ-কে চেনেন না জনাব? মতিঝিলে সরাবখানায় কাম করে। সত্তর বছরের বুড়ো মিঞাসাহেব।
ততক্ষণে অন্য লোকেরা বেশ মজা পেয়ে গিয়েছে। খাঁটি সরাব। নবাব নবাবজাদাদের খাবার জন্যে সরাবখানায় নিয়ে যাচ্ছিল। খুব দামি মাল। চকবাজারের ভাটিখানায় যে-সরাব বিক্রি হয় এ তা নয়। এর অনেক কিম্মৎ। রাস্তায় পড়ে গিয়ে সরাব চারদিকে ছত্রাকার হয়ে গিয়েছিল। ভাঙা হাঁড়ির টুকরোর মধ্যে যেটুকু এখানে-ওখানে পড়ে ছিল তাই নিয়েই কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল তখন। হাঁড়ির কানাগুলো যারা পেয়েছে তারা তা চেটে খাচ্ছে। আহা, খাসা মাল। খাস খোরাসান ইস্তানবুল থেকে আমদানি! বেগম বাদশা-নবাবদের জন্যে বাছাই করা আঙুরের রস দিয়ে বানানো। বঢ়িয়া চিজ। লোকে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মাটির ওপর। তখনও যদি কিছু পড়ে থাকে তলানি। কিন্তু ইব্রাহিম খাঁ তখনও কাতরাচ্ছে। সে-দিকে কারও নজর নেই।
নজর মহম্মদও দেখছিল। বললে–খুদ দারু পিয়েছে—
হাতির দল যেমন যাচ্ছিল তেমনই সোজা চলে গেছে পিলখানায়। নবাবের হাতি। ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে লড়াই ফতেহ করে এসেছে, কে মরল কে বেঁচে রইল তা দেখবার দায় নেই তাদের। নবাবের নিজামতে মানুষের চেয়ে হাতির কদর বেশি। মানুষ মরে মরুক, কিন্তু একটা হাতির অনেক দাম।
হঠাৎ হইহই করে কোতোয়ালের লোক এসে হাজির। ভিড় হটাও ভিড় হটাও। লাঠি উঁচিয়ে তাড়া করতে শুরু করেছে তারা। বড়ে আদমি লোকদের তাঞ্জামের রাস্তা ছাড়ো। নবাববাদশাদের ঘোড়া যেতে পারবে না, হাতি যেতে পারবে না, পালকি যেতে পারবে না। হটো হারামজাদা
কোতোয়ালের লোকদের এরা ভারী ভয় করে। ঊর্ধ্বশ্বাসে যে-যেদিকে পারলে দৌড়োতে লাগল। নজর মহম্মদ এক ফাঁকে কান্তর হাতটা ধরলে। বললে–চলিয়ে জনাব ইধার আইয়ে, এবার মারপিট শুরু হবে।
কিন্তু ইব্রাহিম খাঁ তখনও কাতরাচ্ছে। তার দিকে কেউ দেখছে না।
কান্ত কাছে গিয়ে ইব্রাহিম খাঁ’র মুখখানা নিচু হয়ে দেখলে। তারপর পেছন থেকে তার পিঠেও একটা লাঠির চোট এসে পড়ল।
নজর মহম্মদ দূর থেকে দেখছিল। সেখান থেকেই কলে-ইধার আইয়ে বাবুজি, ভাগ যাইয়ে—
কান্তর মনে হল পিঠটা যেন তার ভেঙে গেছে। কিন্তু ইব্রাহিম খাঁ’র চোটটা বোধহয় আরও বেশি। সে তখনও কাতরাচ্ছে।
কান্ত নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করলে হাঁটতে পারবে খা-সাহেব–হেঁটে যেতে পারবে?
ইব্রাহিম খাঁ উত্তর দিতে পারলে না। কান্ত আর দেরি করলে না। কোতোয়ালের সেপাইরা তখন পাগলের মতো যাকে সামনে পাচ্ছে তাকেই পিটছে।
কান্ত তাড়াতাড়ি ইব্রাহিমকে পাঁজাকোলা করে তুলল। সত্তর বছরের বুড়ো হলে কী হবে, একেবারে ফাঁপা। শুকনো ক’খানা হাড় শুধু শরীরে, আর কিছু নেই। কোনওরকমে তুলে নিয়েই সারাফত আলির দোকানে এসে নামিয়ে দিলে৷
