সারাফত আলি মৌতাতের মধ্যেও কান পেতে শুনছিল। জিজ্ঞেস করলে–তারপর?
তারপর মিঞাসাহেব, রাত তখন অনেক, মেহেদি নেসার সাহেব আমার চেহেল্-সুতুনে এসে হাজির। বললে, মতিঝিলে মহফিল হবে, হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে দেখব! আমি নেসার সাহেবকে নিয়ে মরিয়ম বেগমের ঘরে গেলুম। দেখি ঘর ফাঁকা, কেউ নেই। মেহেদি নেসার সাহেব ঘরে বসে রইল–
মরিয়ম বেগম কঁহা চলি গয়ি?
মিঞাসাহেব, মরিয়ম বিবি গিয়েছিল লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবার কাছে। আমি সব নজর রেখেছিলাম, কিন্তু নেসার সাহেবকে কিছু বলিনি। কিন্তু ওই মেহেদি নেসার শালা আমার নামে কাছারিতে নালিশ পেশ করেছে আমি নাকি ঘুষ নিয়ে বাইরের আদমিকে চেহেল্-সুতুনের ভেতরে নিয়ে যাই। আমি ভাবতুম, দেখি নেসার সাহেব কী করে! যেই মরিয়ম বেগম ঘরে এসেছে নেসার সাহেব হেসে হেসে বাত বলতে শুরু করেছে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবাকে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছি যে, নেসার সাহেব মরিয়ম বিবির ঘরে ঘুষেছে। খবর দিতেই লুৎফুন্নিসা বেগমসাহেবা একেবারে নানিবেগমকে নিয়ে বরাবর এসে হাজির। একেবারে হাতেনাতে ধরে ফেলেছে নেসার সাহেবকে!
তারপর?
মৌতাতের মধ্যেও সারাফত আলির টনটনে কৌতূহল জেগে উঠল–ঠিক কিয়া! উসকা বাদ? তারপর?
তারপর নেসার সাহেব নানিবেগমকে দেখেই ঘর থেকে ছুটে ভেগে গেল। বাইরে সাহেবের তাঞ্জাম দাঁড়িয়ে ছিল। তাতে ওঠবার আগে আমাকে বলে গেল, রানিবিবিকে মতিঝিলে আজ পাঠাতে হবে না, অন্য কাউকে পাঠিয়ে দে। বনের চিড়িয়াকে পহেলে নাচা-গানা শিখলাতে হবে, তবে তো বুলি বলবে! আমি শুনে মনে মনে হাসলুম মিঞাসাহেব। ভাবলুম আমিও খোজা নজর মহম্মদ, আমি তোমার মতো বহোত আমির-ওমরাহ দেখেছি, আমার নামে নালিশ পেশ করা! তা মিঞাসাহেব আমিও একটা মতলব ঠিক করেছি
কী? ক্যা মতলব?
ঠিক করেছি, আমিও নানিবেগমের দরবারে নালিশ পেশ করব নেসার সাহেবের নামে!
কী নালিশ?
বলব মরিয়ম বেগম লস্করপুরের তালুকদার কাশিম আলির লেড়কিনয়, ও হাতিয়াগড়ের জমিদারের দোসরা তরফের বিবি ছোটি রানিবিবি–
সারাফত আলি অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলে–এখনও নানিবেগমের মালুম হয়নি যে ও রানিবিবি
না মিঞাসাহেব, আভি তক মালুম নেহি। সবকুছ নেসার সাহেবের বদমাসি। নানিবেগমের কাছে কোরান ছুঁয়ে কসম খেয়েছে নেসার সাহেব যে ও হাতিয়াগড়ের রানিবিবি নয়। হাতিয়াগড়ের বড়ি রানিবিবি যে নানিবেগমের কাছে চিঠি লিখেছিল–
তা তুই এক কাম কর নজর।
সারাফত আলি গড়গড়ার নলে দু’বার দম টেনে ধোঁয়া ছেড়ে বললে–তুই এক কাম কর, সকলকে আমার আরক পিলিয়ে দে। আরও বেশি করে আরক পিলিয়ে দে। ওই নানিবেগম, লুৎফুন্নিসা বেগম, কাউকে ভি ছাড়িসনি। চেহেল্-সুতুন ভেঙে গুঁড়িয়ে দে, গোরস্তান বানিয়ে দে
নজর মহম্মদ বললে–নেহি মিঞাসাহেব, এ কভি নেহি হো সকতা। চেহেল্-সুতুন চলে গেলে আমরা কী খাব মিঞাসাহেব, নোকরি কে দেবে? আমরা কোথায় যাব?
সারাফত আলি বললে, তোরা মরে যাবি, আমরা ভি মরে যাব। নবাব, বাদশা, আমির-ওমরা সবাই মরে যাবে, আবার নয়া দুনিয়া বনবে চেহেল্-সুতুনের গোরস্থানের ওপর
আপনার বড় গোঁসা মিঞাসাহেব চেহেল্-সুতুনের ওপর!
না রে নজর, নয়া দুনিয়া হলে ইনসানের ভাল হবে, তাই জন্যেই তো বলছি। চেহেল্-সুতুন থাকলে ইনসানের ভাল হবে না। সারা হিন্দুস্থানটাকে আজ বাদশা চেহেল-সুতুন বানিয়ে ফেলেছে। চকবাজারের মানুষরা মরে যাচ্ছে রে নজর। খেতে পাচ্ছে না গরিব লোকেরা, দুমুঠো ভিক্ষে দিলে তাদের কোনও ফায়দা হবে না, তাতে কেবল ফকির ভিখিরির দল বেড়ে যাবে রে নজর আসলি ফায়দা হবে না হিন্দুস্থানের
নজর মহম্মদ এত কথা বুঝতে পারে না। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল সারাফত আলির মুখের দিকে। তার কাছে এসব আজব কথা। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে সে বরাবর দেখে এসেছে সচ্ছলতা। সে দেখেছে টাকা-মোহর আর মেয়েমানুষের ছড়াছড়ি। দারিদ্র্য কাকে বলে তা তাকে দেখতে হয়নি কখনও। বুড়ো মিঞাসাহেবের কথা শুনে সে যেন ঘাবড়ে গেল।
এ কী আজব বাত বলছেন মিঞাসাহেব? নয়া-দুনিয়া কী করে বনবে? নবাব তো দুনিয়ার মালিক, নবাব তো খোদাতালা
সারাফত আলি হেসে উঠল দাঁত বার করে। বললে–খোদাতালা হল ফিরিঙ্গিরা
ফিরিঙ্গিরা?
হা রে, ফিরিঙ্গিরা। খোদাতালাই ফিরিঙ্গি বাচ্চাদের পাঠিয়ে দিয়েছে হিন্দুস্থানে চেহেল্-সুতুন ভাঙবে বলে, দুনিয়া থেকে চেহেলসূতুন বিলকুল বরবাদ করবে বলে।
বলে সারাফত আলি আরও জোরে হাসতে লাগল।
পেছনের ঘরের মেঝের ওপর কান্ত শুয়ে শুয়ে সব শুনছিল। সারারাত মাঝিদের সঙ্গে গল্পগাছা করেছে, অনেকখানি রাস্তা হেঁটেছে, তারপর বশির মিঞার কাছে গিয়ে দেখা করেছে। আর তারপর খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আসলে মনটাই ভাল ছিল না তার। তার মধ্যে মনে হচ্ছিল কার গলা যেন শুনতে পাচ্ছে। আস্তে আস্তে তন্দ্রাটা কেটে যেতেই স্পষ্ট শুনতে পাওয়া গেল সারাফত আলির গলা। বোধহয় খদ্দেরের সঙ্গে কথা বলছে মিঞাসাহেব। কিন্তু তার পরেই বুঝতে পারলে খদ্দের আর কেউ নয়, নজর মহম্মদ। বুঝতে পেরেই উঠে বসল। বুঝল, মরালীকে নিয়েই কথা হচ্ছে। মরালীকে মেহেদি নেসার সাহেব দেখতে এসেছিল। তারপর নানিবেগম আসাতে বেঁচে গেছে সে।
