সেদিন তখন আর বেশিক্ষণ কথা হল না। মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকারের দোকান থেকে ভোরবেলাই বেরিয়ে এসেছিল কান্ত। বেশ ভোর। শেষরাতেই বলা যায়। বড় বিশ্বাস করেছিল তাকে সরখেলমশাই। আহা, চাল-ডাল কিনে নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছিল। তার কাছ থেকে চিঠি চুরি করতে কেমন যেন মায়া হয়েছিল কান্তর। বিশেষ করে চিঠিটা পড়বার পর আর সেটা নিতে সাহস হয়নি। চিঠিটা দেখবার পর যদি মরালীর ওপর অত্যাচার আরও বেড়ে যায়। যদি সবাই জানতে পারে হাতিয়াগড়ের রাজা নিজের রানিবিবিকে না-পাঠিয়ে তার বদলে তার নফরের মেয়েকে পাঠিয়েছে, তা হলে তো দু’জনেরই ক্ষতি হবে। শোভারাম বিশ্বাস মশাইকেও গিয়ে ডিহিদারের লোক জিজ্ঞেস করবে, তোমার মেয়ে কোথায় বলো! হাতিয়াগড়ের রাজাসাহেবকে গিয়েও বলবে তোমার বউরানি কোথায় বলো! তার চেয়ে যা হয়ে গেছে তা গেছে। নতুন করে আবার কেন সে তাদের বিপদ ডেকে আনে।
সমস্ত রাস্তাটাই সে ভেবেছে কেবল। মোল্লাহাটি থেকে বেরিয়ে নৌকো করতে হয়েছে। গহনার নৌকো। নৌকোর মাঝিটা ছিল বুড়ো। এক ফাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল কলকাতার খবর কিছু রাখেন নাকি বাবু?
কলকাতার কীসের খবর?
মাঝি বলেছিল–শুনলাম নাকি আমাদের নবাবের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের লড়াই হয়েছিল?
হ্যাঁ, শুনেছি হয়েছিল। তা তোমরা কোথায় শুনলে?
কান্ত মাঝির মুখের দিকে চাইলে। একটু দাড়ি রয়েছে। আধ ঘণ্টা অন্তর অন্তর নামাজ পড়ে কেবল। মাটির হাঁড়িতে রাখা পান্তভাত একটু নুন লঙ্কা দিয়ে খেয়ে সারা দিন-রাত নৌকো চালায়। বুড়ো মাঝি আর তার জোয়ান ছেলে। ওরা জলের মানুষ, জলের ওপরেই সারাজীবন কাটিয়ে দেয় ওরা। কিন্তু ডাঙার খবরের ওপর আগ্রহ আছে। আজ এখানে কাল ওখানে করে করে দুমাস একবছর পরে একদিন হয়তো নিজের দেশে গিয়ে হাজির হয়। বিবির জন্যে জাহাঙ্গিরাবাদের শাড়ি কিংবা মেয়ের জন্যে বহরমপুরের খাডু কিনে নিয়ে যায়। একদিন কি দু’দিন বাড়িতে থেকেই আবার পাড়ি দেয় নদীতে। যখন ফরাসডাঙায় যায় তখন সেখানকার খবর শোনে। তারপর যখন আবার কলকাতায় যায় তখন সেখানকার খবর শোনে। আবার যখন মুর্শিদাবাদে আসে তখন শোনে নবাবের খবর। এইরকম করেই এক দেশ থেকে আর এক দেশে খবর আনা-নেওয়া করে।
এদের কাছে থেকে কান্তর একবার মনে হয়েছিল, এদের সঙ্গে জলে জলে ভেসে বেড়ালে কেমন হয়। কোনও আর ভাবনা থাকে না তা হলে। ফিরিঙ্গিদের চাকরিও তার টিকল না, নবাবের চাকরিও তার টিকবে না। তার চেয়ে এই-ই ভাল।
মাঝির কথায় কিন্তু কান্ত অবাক হয়ে গিয়েছিল। মাঝিটা বলেছিল–ডাঙায় যেমন বাঘ আছে বাবু, জলেও তেমনি কুমির আছে, কোথাও স্বস্তি নেই গো বাবু, কোথাও শান্তি নেই
বশির মিঞার সঙ্গে দেখা করে সোজা সারাফত আলির খুশবু তেলের দোকানে এসে পড়ল। বাদশা। সকাল-সকালই উঠেছে। বাদশা দেখতে পেয়েছে। বললে–কোথায় ছিলেন কান্তবাবু?
কেন? কেউ খুঁজছিল নাকি আমাকে?
আবার কে খুঁজবে? মালিক খুঁজছিল! আমাকে পুছছিল–কান্তবাবু কোন রোজ আসবে—
এখন মিঞাসায়েব উঠেছে?
না বাবু, এখন তো মালিকের মাঝরাত!
সকালবেলার দিকে চকবাজার ঠান্ডা থাকে। দোকানপাট দেরি করে খোলল। তখন গঙ্গা থেকে ভারীরা বাঁকে করে হাঁড়ি-ভরতি জল দিয়ে যায় বাড়িতে বাড়িতে। মুরগিগুলো ভোর থেকে রাস্তায়। বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু যত বেলা বাড়ে তত কাজকর্ম বাড়তে থাকে। তখন কাছারিতে আসতে শুরু করে। ভিনদেশি মানুষ। মামলার তদবিরে কাজির কাছারিতে এসে ধরনা দেয়। কাছারির কাজেও আসে, আবার রাজধানীর দোকান-পসরা থেকে মালপত্র গস্ত করে নিয়ে যায়। ভাল শাখা কেনে, চকবাজারের কামারের দোকান থেকে ভাল হাতাখুন্তি কেনে। কিন্তু রাত্তিরবেলাতেই চকবাজারের আসল শোভা। তখন নবাবের হাতির দল রাস্তা কাঁপিয়ে চান করে ফেরে গঙ্গা থেকে। তখন চেহেলসূতুন থেকে দু’-একটা তাঞ্জাম বেরোয়। তখন গণতকাররা রাস্তার ধারে পাঁজি-পুঁথি-খড়ি নিয়ে বসে যায় ভাগ্যগণনা করতে। তখন সারাফত আলি দোকানের সামনে গিয়ে বসে। আগরবাতি জ্বেলে দেয়, গড়গড়ার মাথায় কলকে বসিয়ে দিয়ে যায় বাদশা, তখন ভুড়ুক ভুড়ুক করে ধোয়া ছাড়ে সারাফত আলি। তখন আফিমের মৌতাত জমে ওঠে।
নজর মহম্মদ একদিন রোজ এসেছে। এত বড় যে একটা লড়াই হয়ে গেল ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে, তাতে। মুর্শিদাবাদের কিছুই ইতর-বিশেষ হয়নি। দোকানের কেনা-বেচা, খদ্দেরের আনাগোনায় কোনও তফাত-ফারাক হয়নি। নজর মহম্মদ যেমন আগেও আসত তেমনিই রোজ এসেছে। লড়াই হচ্ছে, সে তো নবাবের সঙ্গে ফিরিঙ্গিদের, তাতে তোমার আমার কী? একদিন এসে বলেছিল–সেই বাবু কোথায়। গেল মিঞাসাহেব?
বোধহয় মোহরের মোহ লেগে গিয়েছিল নজর মহম্মদের।
মিঞাসাহেব বলেছিল–সে বাবু বাইরের কামে গেছে। তা চেহেল্-সুতুনের খবর কী নজর মহম্মদ?
খবর মিঞাসাহেব খুব জবর!
ক্যায়সা?
নজর মহম্মদ গলাটা নিচু করে বললে–জুবেদার লেড়কা হবে
তৌবা! তৌবা! সারাফত আলি জিভ আর তালু দিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দ করলে। অর্থাৎ হায়-হায়—
পিরালি খাঁকে বলেছি। পিরালি বলেছে লটকে দিতে দেব লটকে
সারাফত আলির লাল চোখ দুটো আরও লাল হয়ে উঠল আতঙ্কে। বললে–সাচ সাচ লটকে দিবি?
হরগিজ লটকে দেব। বেগমদের শায়েস্তা করতে জুবেদাকে না লটকালে আর চলছে না মিঞাসাহেব! কাল তো গুলসন বেগমকে পাঠিয়েছিলাম মতিঝিলে। আমার কী! যদি নবাবকে খুশ করে নিজের নসিব ফিরিয়ে নিতে পারে তো নিক না। কাল তো খুব মহফিল হয়েছে সারি রাত। মেহেদি নেসার সাহেব, ইয়ারজান সাহেব, সফিউল্লা সাহেব একেবারে বুজদিল হয়ে ফুর্তি করেছে। গুলসন খুব নেচেছে, খুব ইনাম পেয়েছে নেসার সাহেবের কাছ থেকে। বড়ি খুশি হয়েছে বেগমসাহেবা।
