সোহানাল্লা, সোহানাল্লা
শেষপর্যন্ত যখন নেয়ামত আলি সরাবের ভাড়ার খুলে উজাড় করে দিয়েছিল তখন কে-ই বা নবাব
আর কে-ই বা বান্দা। তখন কে-ই বা বেগম আর কে-ই বা জারিয়া। তখন মতিঝিলের মহফিলের ফুর্তির ফোয়ারায় নবাব বান্দাবাদি বেগম সব একাকার হয়ে যায়!
কিন্তু বশির মিঞা শেষপর্যন্ত সবটা দেখতে পায়নি। এসব মহফিলের মধ্যে বশির মিঞার মতো। ছুটকো লোকদের থাকবার এক্তিয়ার নেই। লুকিয়ে লুকিয়ে নেয়ামতকে তোয়াজ করে যতটুকু ফাঁকি দিয়ে ভোগ করে নেওয়া যায় সেইটুকুই ফায়দা। জাফরির ফাঁক দিয়ে নবাব-আমির ওমরাহদের কেচ্ছা কেলেঙ্কারি বশির মিঞা বরাবর এমনি করেই ফাঁকি দিয়ে দেখে এসেছে। দুটো বিবি আছে বশিরের। কিন্তু দুটো বিবিই বশিরের কাছে পুরনো হয়ে এসেছে। আর নতুন বিবি রাখবার হিম্মৎ নেই। আজকাল বিবি পোষবার খরচা বেড়ে গেছে। বিবিদের খাই বেড়ে গেছে। বিবিরা একটু সুবিধে পেলেই বড় বড় আমির ওমরাহ পাকড়াতে চায়। একটু খুবসুরত বিবি হলেই আমির ওমরাহদের নজর পড়ে যায় তার ওপর। আর, একবার নজর পড়লে আর তাদের ঘরে পুরে রাখা দায়। সবাই চায় চেহেল্-সুতুনে গিয়ে বেগম বনতে। একবার বেগম হতে পারলে আখের ভাল হয়ে যাবে। নসিবে থাকলে নবাবের নজরে পড়ে যেতেও পারে। তখন হিন্দুস্থানের বাদশাই বা কে আর সে-ই বা কে। তখন হিন্দুস্থানের সনদে বসে খোদাতালাকেও শায়েস্তা করতে চাইবে!
যা হোক, সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা বশির মিঞা ভেবেছিল মতিঝিলের মহফিলে হাতিয়াগড়ের রানিবিবির ডাক পড়বে। নতুন আমদানি বেগম। হয়তো মেহেদি নেসার সাহেব তাকেই এত্তেলা দেবে। তাই একবার দেখবার ইচ্ছে হয়েছিল নতুন আমদানিটা কেমন!
নেয়ামতকেও খোশামোদ করে অনেক কষ্টে ভজিয়ে রেখেছিল। বলেছিল–থোড়া মুঝে ভি দারু পিলাও নেয়ামত ভাইয়া আমিই তো রানিবিবিকে হাতিয়াগড় থেকে আনাবার ইন্তেজাম করেছি।
আমিও থোড়া দেখব নতুন আমদানিটা ক্যায়সি চিজ
কিন্তু গুলসন বেগম আসাতে মনটা একটু ভেঙে গিয়েছিল বশির মিঞার। এত কোশিস করেও কোনও নাফা হল না। বরবাদ হয়ে গেল খোশামোদি। শেষপর্যন্ত যখন ফুর্তির ফিকির টুটে গেল তখন যে কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি একটু ভাল করে নজর করে দেখবে তারও উপায় রাখলে না নেয়ামত আলি। তাড়াতাড়ি এসে হাঁকিয়ে দিলে। বললে–ভেগে যা এখান থেকে, ভেগে যা
বশির মিঞা একটু রেগে গিয়েছিল। সবে মহফিল জমেছে, এখনই ভেগে যেতে বলছে?
তা হলে দারু দিলি কেন? দারু পিয়ে তবিয়ত গরম হয়ে গেল, এখন ভাগা যায়?
তুই ভাগ এখন, আমি বাত শুনতে চাই না, নেসারসাহেব এখন বেসামাল হয়ে পড়বে
সে তো ভালই, আমি তো তাই দেখতে এসেছি।
দুর বেল্লিক, যদি নবাব ভি বেসামাল হয়ে পড়ে?
তাও দেখব!
দুর বেত্তমিজ! কেউ জানতে পারলে আমার নৌকরি খতম হয়ে যাবে যে ভেগে যা ভেগে যা–
শেষকালে একেবারে জোর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল নেয়ামত মতিঝিল থেকে। মতিঝিলের ত্রিসীমানায় আর থাকতে দেয়নি বশিরকে। সেই যে মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গিয়েছিল তা আর ঠান্ডা হল না। সারারাত ঘুমই হল না। ভোরবেলাই উঠে পড়েছিল। আর ঠিক সেই সময়েই কান্ত এসে ডেকেছে।
কী রে, এত সকালে? কখন এলি মোল্লাহাটি থেকে?
কান্ত বললে–এই তো সোজা সেখান থেকে আসছি।
তা সরখেলের সঙ্গে দেখা হল? চিঠি পেলি?
কান্ত একটু দ্বিধা করতে লাগল।
বশির আবার জিজ্ঞেস করলে–চিঠি পাসনি?
কান্ত বললে–না
না মানে? ডিহিদার কি ঝুট-খবর পাঠিয়েছে? সে যে জানিয়েছে হাতিয়াগড়ের রাজা মহারাজার সেরেস্তার লোকের হাতে চিঠি পাঠিয়েছে? তুই উজবুক নাকি? তার সঙ্গে মুলাকাত হল তোর, আর চিঠিটা সরাতে পারলি না? আমি আমার ফুপাকে কী জবাব দেব? তুই কোনও কম্মের নয়–একটা আস্ত পাঁঠা
কান্ত অনেকক্ষণ পরে বললে–আমি এ-চাকরি করতে পারব না ভাই–সেই কথা তোর কাছে বলতে এসেছি
সেদিন কান্তর কথাটা শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিল বশির মিঞা। দুনিয়ায় এমন আহাম্মক কেউ আছে নাকি যে নিজামতি নোকরি ছেড়ে দিতে চায়। সারা হিন্দুস্থান থেকে লোক এসে ভিড় করে মুর্শিদাবাদের দরবারে। এমন দেশ কোথায় পাবে হিন্দুস্থানে? এমন সস্তা-গণ্ডার দেশ? তবু সব নিমকহারামের বাচ্চা, নিজামতের নোকরি করবে আর নিজামতকেই গালাগালি দেবে!
কান্ত বললে–না ভাই, এ-নোকরিতে মনে শান্তি পাচ্ছি না—
শান্তি? টাকা থাকলেই তো শান্তি বাপ বাপ করে আসবে! তুই তলব পাচ্ছিস না? আরামসে আছিস, তলব পাচ্ছিস আর ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিস। আজ হাতিয়াগড় কাল মোল্লাহাটি পরশু কেষ্টনগর। কত দেশে বেড়াতে পাচ্ছিস–তা তোর তকলিফটা কী? কী কষ্ট হচ্ছে তোর?
কান্ত বললে–আমার আর ভাল লাগছে না ভাই
কাম করতে তো ভাল লাগবেই না। বেশ নবাবের মতো পায়ের ওপর পা তুলে আরাম করবার নোকরি কে তোকে দেবে? আর নোকরি করবি না তো খাবি কী?
সে কথাটা সত্যি বটে! কিন্তু এ কাজ ছাড়া কি আর কোনও রকমের চাকরি নেই? নিজামতে কি সবাই এই চরের চাকরি করছে? সেরেস্তার চাকরি নেই? কাছারির চাকরি নেই? খালসা-দেওয়ানজির দফতরে চাকরি নেই? তার জন্যেই ঠিক বেছে বেছে কেবল এই চাকরি?
আচ্ছা, ঠিক আছে, এখন তুই ঘরে যা, আরাম কর গে যা। এখন তোর মাথা গরম আছে, পরে বাত বলব তোর সঙ্গে। তুই এই সহজ কামটা করতে পারলি না, আর তুই করবি খালসা দেওয়ানজির দফতরের কাম? সেকাম তো আরও কড়া রে–সেখানে কেবল দফতরে বসে বসে হিসেব লিখতে হবে–সে যে আরও শক্ত কাম
