বলে তাড়াতাড়ি তাঞ্জামে উঠে পড়ল নেসার সাহেব।
মেহেদি নেসার চলে যেতেই পিরালি খাঁ আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। চলতি তাঞ্জামটা ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতেই নজর মহম্মদ মুখ ফিরিয়ে বললে–সর্দার, শালা হারামির বাচ্চা
পিরালি গম্ভীর মানুষ। বললে–নানিবেগমকে খবর দিলে কে? তুই?
নজর মহম্মদ বললে–জি সর্দার–নেসার সাহেব কাছারিতে আমার নামে নালিশ পেশ করেছে সর্দার, আমি নাকি বাইরের জওয়ানদের চেহেল্-সুতুনের অন্দরে ঢোকাই মোহর নিয়ে। আমি নাকি ঘুষ নিই। তাই নানিবেগমকে খবর দিয়ে দিলুম,খবর দিয়ে শালাকে বেইজ্জৎ করে দিলুম। খোজাদের সঙ্গে বেত্তমিজি করতে এসেছে।
আরও সব কত কী কথা রাগের মাথায় বলতে লাগল নজর মহম্মদ। কলকাতার লড়াই ফতে করে এসে মাথা গরম হয়ে গেছে আমির-ওমরাহদের। মাথা গরম করবে বাইরে গরম করো। চেহেলসূতুনের বাইরে। মতিঝিলে নেয়ামতকে পেটো। চেহেল্-সুতুন তোমার এক্তিয়ারে নয়। এখানে আমি খোজা সর্দার পিরালির নৌকর। পিরালি খাঁ হুকুম করলে আমি তা মাথা পেতে তামিল করব। এতদিন এত নবাব এসেছে গেছে, এতদিন এত বেগম এসেছে গেছে, কেউ খোজাদের এক্তিয়ারে কখনও হাত দেয়নি। তুমি যে-ই হও, আমি খোঁজা। আমি তোমার চেহেল সুতুন মর্জি হলে ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলতে পারি, আবার বানাতেও পারি। কোন ফঁক দিয়ে তোমার নুকসান করব তুমি জানতেও পারবে না। তোমার বনের চিড়িয়া আমার মর্জি হলে আমি আশমানে উড়িয়ে দিতে পারি। আমার মর্জি আমি মোহর নিই, তাতে তোমার কী? তুমি ঘুষ নাও না? জমিদার তালুকদার ডিহিদার ফৌজদার তাদের কাছ থেকে তুমি রিসশোয়ত নাও না? হাজারি মনসবদার বানাতে–তুমি ঘুষ নাও না? কেয়া সর্দার, ঠিক বাত বলিনি?
পিরালি খাঁ বললে–বেশ করেছিস
নজর মহম্মদের তখনও গোঁসা যায়নি। বললে–আমি মেহেদি নেসার সাহেবের দুশমনি ভাঙব সর্দার, আমাদের এক্তিয়ারে হাত দিয়েছে, আমি শালাকে রেহাই দেব না
পিরালি খাঁ ঠান্ডা মাথায় জিজ্ঞেস করলে–মতিঝিলে আজ কাকে পাঠালি?
নজর মহম্মদ বললে–গুলসন বেগমকে, বেচারি বহোত রোজ ধরে আমার খুশামোদ করছিল, কেবল বলছিল, আমাকে একবার নবাবের সামনে পাঠিয়ে দাও নজর! তা দিলুম আজ পাঠিয়ে। যদি গুলসনের নসিব ফেরে তো ফিরুক না, আমার কী!
বেশ করেছিস!
তারপর নজর মহম্মদ হঠাৎ নিচু গলা করে পিরালিকে বললে–সর্দার, আর একটা খবর, জুবেদার বাচ্চা হবে!
পিরালির চোখ দুটো গোল হয়ে উঠল।
কৌন জুবেদা?
মরিয়ম বেগমের বাঁদিটা!
কে করলে? কোন বেল্লিক?
নজর মহম্মদ বললে–তালাস পাচ্ছি না।
ওকে পুছেছিস?
ও কী বলবে? ও তো বোবা! কোন উল্লু-কি পাঠটা বেইমানি করে গেছে।
তা হলে লটকে দে ওকে!
দেব লটকে?
আলবত দিবি! নানিবেগম যদি কিছু বলে তো বলিস, পিরালি খাঁ’র হুকুম। আমাকে এত্তেলা দিলে যা বলবার আমি বলব–
বলে পিরালি খাঁ নিজের কাজে চলে গেল।
*
ওদিকে তখন সারারাত মহফিল চলেছে মতিঝিলে। কলকাতার লড়াই ফতেহ করে নবাবি ফৌজের লোকরা শহরে এসে ফুর্তির ফোয়ারা ছুটিয়েছে। কলকাতা থেকে যা পেয়েছে লুঠপাট করে এনেছে। কেউ লুঠেছে চাদি, কেউ লুঠেছে মেয়েমানুষ, কেউ লুঠেছে ফিরিঙ্গিদের জামা, জুতো। যে কিছু পায়নি, সেও একটা বকলেস কি একটা পালকের কলম নিয়ে এসেছে। কলকাতার কেল্লায় মানিকচাঁদকে একলা রেখে নবাব হলওয়েলকে গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে মুর্শিদাবাদে। আর আছে কৃষ্ণবল্লভ, আর উমিচাঁদ। উমিচাঁদের বাড়িটাও লুঠপাট করতে গিয়েছিল নবাবি ফৌজের লোকেরা। কোটি কোটি টাকার মালিক উমিচাঁদ সাহেব। কিন্তু গিয়ে দেখলে, কেউ বাড়িটাতে আগেই আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। বাড়ির ভেতরে একটা সিন্দুক ছিল। তার ভেতরে মোহর সোনা চদি কেউ আগেই সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তার পাশেই উমিচাঁদের সেপাই জগমন্ত সিংয়ের পোড়া দেহটা পড়ে আছে। আগাগোড়া পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে। চেনা যায়নি তাকে।
আগে ফুর্তি হোক, আগে মহফিল হোক, তারপরে বিচার হবে হলওয়েলের। ফিরিঙ্গিরা জাহাজ নিয়ে একেবারে ফলতার মোহানায় গিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। মেহেদি নেসার, ইয়ারজান, সফিউল্লা, তারা সবাই নবাবকে বুঝিয়েছে এ-রাতটায় আর কোনও কাজ নয়, শুধু মহফিল! নজর মহম্মদকে হুকুম করেছিল মেহেদি নেসার যে, চেহেল্-সুতুন থেকে ভাল বাইজি পাঠিয়ে দিতে হবে মতিঝিলে। যে ভাল নাচতে পারবে, গাইতে পারবে, নবাবের দিল খুশ করতে পারবে
তারপর সেখান থেকে এসেছিল গুলসন বেগম।
তা গুলসন নেচেছে ভাল। এককালে হিন্দু মেয়ে ছিল বটে। কিন্তু চেহেল্-সুতুনে এসে আচ্ছা ওস্তাদের হাতে পড়ে নাচ-গান সব রপ্ত করে নিয়েছে। গুলসন একাই মহফিল মশগুল করে দিয়েছে। মতিঝিলের মেঝের ওপর সাদা কিংখাবের চাদর পেতে দেওয়া হয়েছিল। চাদরের নীচেয় আবির ছড়ানো ছিল। চাদরের ওপর নেচে নেচে পায়ের ঘা দিয়ে দিয়ে একটা আস্ত ফোঁটা পদ্মফুল এঁকে ফেলেছিল গুলসন। তারপর সেই আবিরের লালে-লাল কিংখাবের চাদরের ওপর মেহেদি নেসার একটা মোহর ফেলে দিয়েছিল। গুলসনের কেরামতি আছে বলতে হবে। নাচতে নাচতে কোমর বেঁকিয়ে ঠোঁট দিয়ে কামড়ে সেই মোহর তুলে নিয়ে নবাবের কপালের ওপর রেখে দিয়েছিল।
ভারী খুশি নবাব মির্জা মহম্মদ!
অনেকদিন পরে নবাবের মুখে হাসি ফুটতে দেখে মেহেদি নেসারের মুখেও হাসি আর ধরেনি। নবাবের খুশির জন্যেই তো মহফিল। নবাব খুশি থাকলেই তো হিন্দুস্থান খুশি রইল। নবাব খুশি থাকলেই তো খোদাতালা খুশি থাকল। আসলে দিন-দুনিয়ার নবাবই তো দিন-দুনিয়ার খোদাতালা!
