বেগমসাহেবা।
পেছন থেকে ডাক শুনে মরালী মুখ ফেরাল। সেই বাঁদিটা। সিরিনা।
বেগমসাহেবাকে এত্তেলা দিয়েছেন!
মরালী আবার লুৎফুন্নিসার ঘরে ফিরে গেল। বেগমসাহেবা বললে–একটা কথা শোনো
মরালী অবাক হয়ে গেছে। আবার কী জরুরি কথা বলবে তাকে।
আর একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। তুমি বহেন নয়া এসেছ, রাত্তিরে এখানে দরওয়াজা বন্ধ করে। শোবে।
মরালী বললে–তা তো শুই-ই!
এখানকার কোনও বেগমও যদি দরওয়াজা খুলতে বলে তো খুলো না, জানো। কোনও বেগমকেও তোমার ঘরে রাত্তিরে শুতে দিয়ো না। এখানকার বেগমরাও ভাল নয়, বিশ্বাস করে কোনও কথাই কাউকে বোলো না। এখানকার ইটেরও কান আছে। এখানকার বেগমরা পুরুষদের চেয়েও খারাপ! যাও
মরালী হতবাক হয়ে গেল কথাগুলো শুনে। তারপর যেমন এসেছিল তেমনি আবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর রাস্তা চিনে চিনে নিজের মহলের কাছে আসতেই দেখলে নজর মহম্মদ ঘরের সামনের রোয়াকের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। নজর মহম্মদকে দেখেই বুকটা হুঁত করে উঠল। যদি বকে!
কিন্তু না, কিছুই বললে–না!
মরালী নিঃশব্দে নিজের ঘরে ঢুকতে গিয়েই যেন সাপ দেখে এক হাত পিছিয়ে এল। বেশ ফরসা টকটকে গায়ের রং, ছোট একটু দাড়ি, গোঁফ জোড়া পাকিয়ে দু’পাশে ছুঁচোলো করে দেওয়া। চোস্ত-পাজামা, মেরজাই পরা একজন লোক যেন এতক্ষণ মরালীর জন্যেই তার ঘরের ভেতরে অপেক্ষা করছিল।
মরালী ঘরে ঢুকতেই লোকটা সসম্ভমে উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে কুর্নিশ করলে!
বন্দেগি বেগমসাহেবা।
মরালী নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। ভয়ে বুকটা তার থরথর করে কাঁপছে তখন।
আমাকে চিনতে পারছেন না বেগমসাহেবা! মির্জার শাদির সময় বেগমসাহেবাকে হাতিয়াগড়ের বজরার জানালাতে দেখেছিলুম। এমন খুবসুরত শকল জিন্দগিতে কখনও দেখিনি, তাই ভেবেছিলাম বসোরার গুলাব কি হাতিয়াগড়ের মরুভূমিতে মানায়! তাই তো ডিহিদারকে দিয়ে পরোয়ানা ভেজিয়ে চেহেলসতুনে নিয়ে এসেছি রানিবিবিকে!
বলে লোকটা একটা বিজয়োল্লাসের চাপা হাসি হেসে উঠল!
মরালী তখনও কী করবে বুঝতে পারছে না। বুঝতে পারছে না কে এ লোকটা! বাইরের অন্ধকারে নজর মহম্মদ তখনও পঁড়িয়ে আছে। লোকটা কি রাত্তিরে তার ঘরেই থাকতে চায় নাকি!
হাতিয়াগড়ের জমিনদার সাহাবের তবিয়ত কেমন আছে বেগমসাহেবা? খ্যয়রিয়ত তো?
মরালীর মনে হল এক থাপ্পড় কষে দেয় লোকটার গালের ওপর। কিন্তু ভয়ও করতে লাগল। লোকটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তখন একমনে দেখছে মরালীকে। যেন যাচাই করে নিচ্ছে। হয়তো সন্দেহ হচ্ছে ঠিক রানিবিবি না অন্য কেউ। কিংবা হয়তো ভাবছে অনেকদিন আগে নবাবের বিয়ের সময় দূর থেকে দেখা মুখটার সঙ্গে এ-মুখের মিল আছে কি না!
বেগমসাহেবা বসুন না!
মরালীর মনে হল আরও কাছে থেকে দেখতে চায় তাকে! তবুমরালী বসল না।
লোকটা এবার নিজেই দাঁড়িয়ে উঠল।
বেগমসাহেবা না বসলে বান্দা তো বসে থাকতে পারে না।
কিন্তু পঁড়িয়ে উঠে সোজা হয়ে ঠিক দাঁড়াতেও পারলে না। টলতে লাগল। হয়তো মাতাল। মরালীর নাকে একটা কড়া গন্ধ এসে লাগল। চারদিকে এত আতর, পান-জর্দা, খুশবু তেলের গন্ধ, তবু যেন মদের গন্ধটা সকলকে ছাপিয়ে উঠে নাকে এসে লাগল।
বেগমসাহেবা বুঝি টহল দিতে বেরিয়েছিলেন! এত রাতে টহল দিলে নিদ কখন যাবেন। বেগমসাহেবা!
হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই নজর মহম্মদ ঘরে ঢুকে পড়ল খোদাবন্দ, নানিবেগম
নানিবেগমের নাম শুনেই লোকটা যেন জ্ঞান ফিরে পেল। চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। তারপর চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আর ঠিক তার পরেই এসে ঢুকল লুৎফুন্নিসা বেগম। সঙ্গে আর একজন। এই-ই বোধহয় নানিবেগম।
মহলে কে এসেছিল বহেন?
মরালী ঘটনার আকস্মিকতায় এমনিতেই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এবার আরও বাকরোধ হয়ে এল তার।
নানিবেগম মাথায় হাত দিয়ে আদর করতে করতে বললে–বেটি।
বড় আদরের সুর গলায় বেজে উঠল নানিবেগমের। মরালীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
কব আয়ি বেটি!
বেশ বয়েস হয়েছে। মরালীর মনে হল যেন ঠিক তার ঠাকুমার মত। ঠাকুমাকে ভাল করে দেখেওনি কখনও। খুব ছোটবেলায় আবছা আবছা মনে পড়ত। নয়ানপিসিও কখনও যেন এমন করে আদর করেনি। নয়ানপিসি চুল বেঁধে দিয়েছে। সাজিমাটি দিয়ে গা ঘষে মেজে দিয়েছে। কিন্তু নানিবেগমকে নয়ানপিসির চেয়েও দেখতে আরও সুন্দর। সাদা পাতলা পোশাক।
ইহা কিউ আয়ি বিটি? কৌন লায়া? কে তোমাকে নিয়ে এল এখানে মা?
মরালী নানিবেগমের বুকের মধ্যে মাথা গুঁজে দিয়ে অঝোরে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগল। নানিবেগমও মরালীকে দুই হাতে নিজের বুকের মধ্যে টেনে নিলে।
মেহেদি নেসার বাইরের নহবতখানার নীচে দাঁড়িয়ে যেন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লে। তাঞ্জাম। তৈরিই ছিল। নজর মহম্মদকে কাছে ডেকে বললে–খুব হুঁশিয়ার নজর মহম্মদ, বড়ি খুবসুরত জেনানা–লেকন
নজর মহম্মদ হুকুম শোনবার অপেক্ষায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।
লেকন, নাচা গানা সব শেখাতে হবে। একদম আনাড়ি জেনানা, ভাল করে আদব কায়দা এখনও শেখেনি, আমির-ওমরাহদের কেমন করে কুর্নিশ করতে হয় তাই-ই জানে না এখনও। ওস্তাদজিকে হুকুম দিয়ে দেবে খুব জলদি তালিম দিতে। মির্জাকে খুশ করতে হবে তো-বনের চিড়িয়াকে পিজরায় পুরলে কী হবে, তাকে তো বুলি শেখাতে হবে
