মরালী আস্তে আস্তে দরজায় টোকা মারলে।
ভেতর থেকে মেয়েলি গলায় সাড়া এল–কে?
আর তারপর দরজাটা খুলে গেল! মরালী ভেবেছিল দরজা খুলে হয়তো দেখবে গুলসনকে। কিন্তু এ অন্য আর একজন। যে দরজা খুলে দিলে সে চিনতে পারলে না মরালীকে। একজন বাঁদি।
আপ কৌন?
মরালী বললে–এ-ঘরে গুলসন বেগম থাকে?
ততক্ষণে ভেতর থেকে আর একজন বেরিয়ে এসেছে। বড় সুন্দর এর মুখখানা। কিন্তু বড় করুণ এর চেহারা। বেশি গয়নাগাঁটি গায়ে নেই। ফিকে জর্দা রঙের একটা ঘাগরা আর ফিকে সবুজ ওড়নি পরেছে গায়ে।
তুমি কে?
কী বলবে মরালী বুঝতে পারলে না। কিন্তু মেয়েটার মুখখানা দেখে মনে হল একে যেন সব কথা খুলে বলা যায়।
গুলসন বেগমকে আমি খুঁজতে এসেছিলাম। তার মহলটা কোন দিকে?
মেয়েটি জিজ্ঞেস করলে তুমি কে? তুমি কি নয়া এসেছ এখানে?
মরালী তবু জবাব দিতে পারলে না। মেয়েটি বললে–এসো, ভেতরে এসো তুমি, এত রাত্তিরে। তুমি গুলসনকে খুঁজতে বেরিয়েছ কেন? ডর কী? ভেতরে এসো
মরালী ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকল। সাদাসিধে একটা বিছানা। মখমলের চকচকে চাদর। পায়ে একজোড়া জরিদার চটি। হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসাল। তারপর বাঁদিটাকে বললে–সিরিনা, তু যা ইহাসে
বাঁদিটা চলে গেল। মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করলে তোমাকে তো চেহেল-সূতুনে আগে দেখিনি কখনও, তুমি কি নয়া এসেছ?
হা!
কতদিন এসেছ?
অনেকদিন। ঠিক করতে পারছি না কতদিন। মনে হচ্ছে যেন কত বচ্ছর এখানে এসেছি। ঘরের মধ্যেই থাকি কিনা দিনরাত!
মেয়েটি গলায় মিষ্টি সুর দিয়ে জিজ্ঞেস করলে–তোমার নাম কী?
মরিয়ম বেগম।
সাকিন?
লস্করপুর। সেদিন গুলসনের ওপর খুব রাগ করেছিলুম বলে আর যায়নি আমার মহলে, তাই খুঁজতে বেরিয়েছি। এখানকার খোজারা আমাকে মোটে ঘরের বাইরে বেরোতে দেয় না। গুলসন লুকিয়ে লুকিয়ে আমার মহলে আসত, কেউ জানতে পারত না। আজ কদিন থেকে মোটে আসছে না সে, তাই রাত্তিরে বেরিয়েছিলাম খুঁজতে
কিন্তু গুলসনকে তো এখন মিলবে না!
মিলবে না? কেন?
সে মতিঝিলে গেছে, সেখানে মহফিল হচ্ছে–
গুলসনের কথাটা মনে পড়ল। গুলসন বলেছিল, যার মতিঝিলে ডাক পড়বে সে ভাগ্যবতী! এক রাত্রেই তার কপাল ফিরে যাবে! হয়তো শেষপর্যন্ত গুলসনের কপাল ফিরল।
আপনি কে?
আমি? আমার নাম লুৎফুন্নিসা বেগম।
মরালীর মাথায় যেন সঙ্গে সঙ্গে বজ্রাঘাত হল। নবাবের আসল বেগম। ভয়ে দাঁড়িয়ে উঠল মরালী। বললে–আমায় মাফ করবেন বেগমসাহেবা, আমি না-জেনে আপনার ঘরে ঢুকে পড়েছি, আমি নতুন মেয়ে, কিছুই জানতুম না
লুৎফুন্নিসা একটু ম্লান হাসি হাসল। বললে–বোসো, তোমার কোনও গুনাহ হয়নি। তুমিও যা আমিও তাই তুমি বোসো
তবুমরালীর বসতে কেমন সংকোচ হল। বললে–আপনার কথা গুলসন আমাকে বলেছে, আমরা আপনার বাঁদি, আপনার সঙ্গে কি আমাদের তুলনা?
লুৎফুন্নিসা বললে–কে বাঁদি আর কে মালকিন তা খোদাই জানে ভাই! গুলসন তোমাকে সব ঝুট বাত বলেছে! তুমি নতুন এসেছ তাই কিছুই জানো না এখনও, পরে সব জানতে পারবে। তা ছাড়া তুমি কেন আসতে গেলে এখানে? তুমি গলায় দড়ি দিতে পারলে না? যখন তোমাকে এরা এখানে নিয়ে আসছিল তুমি নদীতে ঝাঁপ দিতে পারলে না? জানো, তোমার মতো কত বেগম আছে এখানে? জানো, তাদের কী হেনস্থা?
বলতে বলতে লুৎফুন্নিসা একটু থামল। তারপর আবার বলতে লাগল আর তা ছাড়া আমিই কি সাধ করে এখেনে এসেছি? আমি কি চেয়েছিলুম এই নবাবের বেগম হতে? আমি গান গাইতে এসেছিলুম এই মুর্শিদাবাদে মুজরো নিয়ে। আমি দেহলীর নটুনি। গান গাওয়া ছিল আমার পেশা। তারপর খোদার মর্জিতে এখানে এসে পড়েছি, আর বেরোতে পারিনি!
বলে হাসতে লাগল লুৎফুন্নিসা বেগম ঠিক তেমনি করে।
তারপর বললে–যাক গে এসব কথা, তুমি নতুন এসেছ, তোমাকে মিছিমিছি ভয় পাইয়ে দেব না–তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
মরালী বললে–গুলসন আমাকে বলেছিল নানিবেগমসাহেবার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেবে।
কী জন্যে নানিবেগমের সঙ্গে দেখা করতে চাও?
মরালী বললে–শুনেছি তিনি খুব ভাল লোক—
গুলসন বলেছে ভাল লোক?
গুলসন আপনারও খুব প্রশংসা করেছে।
আমার কথা থাক, তুমি এত রাত্তিরে নানিবেগমের সঙ্গে দেখা করতে চাওই বা কেন? তিনি তো এখন কোরান পড়েন
তাও শুনেছি। কিন্তু রাত ছাড়া আর কী করেই বা দেখা করব তাঁর সঙ্গে! দিনেরবেলা নজর মহম্মদ আমার ঘরে নজর রাখে। কোথাও বেরোতে দেয় না। কারও ঘরে যেতে আমাকে বারণ করেছে। কারও সঙ্গে কথা বলতেও দেয় না। যে বাঁদিটা আসে সেও বোবা, কথা বলতে পারে না। আমি যে এরকম একলা থাকতে থাকতে মারা যাব শেষকালে!
লুৎফুন্নিসা হাসতে হাসতে বললে–নতুন এসেছ তো, এখন একটু একটু অসুবিধে হবেই, তারপর আস্তে আস্তে সব গা-সওয়া হয়ে যাবে, তখন অন্য বেগমরা যেমন করে দিন কাটায়, তুমিও তেমনি করে দিন কাটাবে! তা নানিবেগমকে কিছু বলতে হবে?
মরালী বললে–শুধু বলব, আমি যেন এখানকার সকলের সঙ্গে মিশতে পারি, কথা বলতে পারি
লুৎফুন্নিসা বললে–আচ্ছা তুমি যাও, আমি নানিবেগমকে তোমার কথা বলব, তুমি কিছু ভেবো না–তুমি একলা মহলে ফিরে যেতে পারবে তো? সিরিনাকে পাঠাব তোমার সঙ্গে?
মরালী বললে–না, তার দরকার নেই, আমি যেতে পারব একলা–
বলে লুৎফুন্নিসা বেগমকে মুসলমানি কায়দায় কুর্নিশ করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল। এতক্ষণ যেন আড়ষ্ট হয়ে কথা কইছিল মরালী। কিন্তু তবু ভাল লাগল। এ যেন গুলসনের মতো নয়। অত গায়ে পড়ে আলাপ করতেও চাইলে না, আবার গায়ে পড়ে উপকার করতেও আগ্রহ দেখালে না। অথচ আদবকায়দার কোনও ত্রুটিও রাখলে না। নবাবের খাস বেগম, নবাব ফিরে এসেছে মুর্শিদাবাদে, তবু তো খাস বেগমের কাছে একবার দেখাও করতে এল না। আর এত রাতে একা একা জেগেই বা বসে আছে কেন? কার জন্যে বসে আছে? এই খাস বেগম থাকতে নবাব কেন গুলসনকে ডেকে পাঠিয়েছে। মতিঝিলে? গুলসরে কি আজ এক রাত্রেই ভাগ্য ফিরে যাবে?
