তার মানে?
এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন কান্তর মাথায় কখনও আসেনি। এ নিয়ে আলোচনা করতেও তার যেন একটু লজ্জা হল।
বশির মিঞা বললে–না, তোর জানা দরকার, নবাবদের এত বেগম থাকে কেন! খোদাতালার বেহেস্তে যেমন হুরি-পরি থাকে নবাবদের হারেমেও তেমনি বেগম বাদি থাকে। কেউ আসে খোরাসান থেকে, কেউ কান্দাহার থেকে, কেউ চাটগাঁ থেকে, কেউ কালাপানির ওপার থেকে।আমার তলব বাড়লে। আমি তো ইয়ার ঠিক করেছি একটা ইহুদি আওরাত রাখব। ইহুদি আওরাত দেখেছিস?
কান্তর বিরক্তি লাগছিল। বললে–ওসব কথা থাক এখন–
সেদিন ওই পর্যন্ত কথা হয়েছিল বশির মিঞার সঙ্গে। হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে চেহেল সুতুনের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে সেদিনকার মতো কান্তর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। আবার কোনও নতুন হুকুম হলেই বশির মিঞা তাকে জানাবে বলেছিল। কিন্তু তারপর হুড়মুড় করে সব কী যেন ঘটে গেল। তখন যা কিছু ঘটেছে সব তার চোখের আড়ালে। তখন সে বেগম সেজে বোরখা পরে চেহেল সুতুনের ভেতরে লুকিয়ে আছে মরিয়ম বেগম সেজে।
তখন সবাই জানে কান্তই মরিয়ম বেগম। বোরখা পরার পর কেউ আর তাকে চিনতে পারেনি।
মরিয়ম বেগমকে ধরবার জন্যে তখন সমস্ত মুর্শিদাবাদে তোলপাড় পড়ে গেছে। কোথায় মরিয়ম বেগমসাহেবা? মরিয়ম বেগমসাহেবা কোথায়?
মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছেছে কর্নেল ক্লাইভ। জোর হুকুম দিয়েছে? মরিয়ম বেগমসাহেবাকে চাই।
অথচ চেহেল্-সুতুনের ভেতরে অন্য সব বেগমসাহেবারা তখন সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সুরমা দিয়েছে। বুকে কাঁচুলি পরেছে। পায়ে পাঁয়জোড়। সবাই সার বেঁধে অপেক্ষা করছে কখন কার ডাক পড়বে আম-দরবার থেকে।
কিন্তু তখনও কাঁদছে কে?
মনে আছে একদিন আবার কান্ত গিয়ে হাজির হয়েছিল বশির মিঞার কাছে।
বশির মিঞা বলেছিল–আবার তোর কীসের দরকার?
কান্ত বলেছিল–একটা কথা ছিল তোর সঙ্গে। একটু আড়ালে আসবি, চুপি চুপি বলব—
বশীরের যেন এসব কথা শোনবার সময়ও ছিল না। আগ্রহও ছিল না। তার তখন অনেক কাজ। তাড়াতাড়ি বললে–তোর নোকরির কথা আমি কিছু বলতে পারব না।
আমি চাকরির কথা বলছি না–
নোকরির কথা বলছিস না তো কী কথা বলছিস?
চাকরির কথা কান্তর কিছু বলবার ছিলও না। বড়চাতরা থেকে একদিন যখন চলে এসেছে তখন তার কাছে ফিরিঙ্গি কোম্পানি যা, নবাব-নাজিমও তাই। চাকরিই হয়তো তার কপালে নেই। যেমন অনেক জিনিসই তার কপালে নেই। এখন মুর্শিদাবাদের মসনদে কেউ বসুক আর না বসুক, তাতে কিছুই আসে যায় না তার।
কী বলবি জলদি বল!
সেই হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে সেদিন নিয়ে এসেছিলাম, তার কথা বলছি—
সে তো হারেমে আছে। তার সঙ্গে তোর কীসের দরকার ইয়ার?
তার সঙ্গে একটু দেখা করতে পারলে ভাল হত—
তোর কি মাথা খারাপ! তুই হারেমের মধ্যে যাবি? খোঁজা-সর্দার তোর গর্দান রাখবে?
কান্তর মুখখানা আরও করুণ হয়ে উঠল। বললে–তুই চেষ্টা করলে পারিস, তোর ফুপা মনসুর আলি সাহেব থাকতে কেউ তোকে কিছু বলবে না–তোর হাত দুটো ধরে বলছি ভাই, একটু দয়া কর তুই–
হঠাৎ বশির মিঞার কেমন সন্দেহ হল।
কেন বল তো? তোর এত টান কেন? তুই কি রানিবিবিকে দেখেছিস নাকি?
হ্যাঁ
কী করে দেখলি? সেপাই দিয়ে বোরখা পরিয়ে আনবার কথা ছিল, দেখলি কী করে? মুখ দেখেছিস?
হ্যাঁ!
বশির মিঞা যেন খেপে লাল হয়ে উঠল। এই জন্যেই তো কাফেরদের দিয়ে এইসব কাজ করাতে চায়নি মনসুর আলি সাহেব। নেহাত পীড়াপীড়ি করলে বশিরটা, তাই এই কাজের ভার দেওয়া। কোথা থেকে কোন হিন্দুর বাচ্চাকে ধরে এনে কিনা বললে–একে নোকরি দাও–!
বশির মিঞার তখন সত্যিই অনেক কাজ। মাথা ঘুরে যাবার মতো অবস্থা। নবাব মারা যাবার পর থেকে চারদিক থেকে শকুনেরা এসে ওত পেতে বসে আছে লুঠের মালে ভাগ বসাবে বলে। মহম্মদি বেগ নিজে মাল সাবাড় করেছে, সুতরাং তারই যেন পাওনাটা বেশি! ওটা কে না করতে পারত? নবাবকে ধরে দুটো হাত দড়ি দিয়ে বেঁধে একটা চাকু বুকের ওপর চালিয়ে দিয়েছে। একবার দু’বার তিনবার। একবারেই মামলা ফতে হয়ে গিয়েছিল। তবু সাবধানের মার নেই। হাত দুটো খুনে লাল। ভেবেছিল, মিরনের যখন দোস্ত সে, তখন দোস্তালির হকদার হতে পারবে সে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। হকদার এই কদিনেই অনেক পয়দা হয়েছে। সবাই মিরজাফর আলি খাঁ’র দিকে হা করে চেয়ে আছে। সে-ই যেন বেহেস্তের আফতাব পাইয়ে দেবে!
কান্ত বললে–একটিবার শুধু দেখা করিয়ে দে ভাই বশির আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল রানিবিবি
তোর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল? বলছিস কী তুই? তুই রানিবিবির সঙ্গে কথাও বলেছিস নাকি–?
হ্যাঁ!
যেন অমার্জনীয় অপরাধ করে ফেলেছে কান্ত, এমনি করে তার দিকে চাইলে বশির।
তুই যে কথা বলেছিস এটা কেউ জানে? কেউ দেখেছে?
কান্ত বললে—না—
কেউ দেখেনি তো?
না, আমি লুকিয়ে দেখা করেছি—
কিন্তু তুই তো জানিস নবাবের হারেমের বিবিদের সঙ্গে কারও মোলাকাত করার এক্তিয়ার নেই, দেখা করা গুনাহ–
কান্ত বললে–কিন্তু আমাকে যে রানিবিবি ডেকে পাঠিয়েছিল ভাই–আমার কী দোষ।
তোকে ডেকে পাঠিয়েছিল? কোথায়? কী জন্যে?
কান্ত বললে–কাটোয়াতে!
কী কথা বললে রানিবিবি?
এবার যেন বশির মিঞাও কান্তকে হিংসে করতে লাগল। এমন জানলে বশির মিঞা নিজেই তো হিন্দু কাফের সেজে রানিবিবিকে নিয়ে আসত। কিন্তু ওদিক থেকে হুকুম ছিল, রানিবিবিকে আনতে পাঠাবার জন্যে যেন নবাব-নিজামত সরকারের হিন্দু আমলা পাঠানো হয়। নইলে এসব কাজের জন্যে কখনও লোকের অভাব হয় নাকি।
