মরালী দেখেছিল সেটা। উঠোনের উলটো দিকে একটা ছোট ঘর। দরজা নেই, জানালা নেই, ঘুলঘুলি নেই, কিছু নেই, চারদিক থেকে ইট দিয়ে থরে থরে গাঁথা। দেখলেই মনে হয় যেন চেহেল্-সুতুনের একটা আর্তনাদ ওখানে যোবা হয়ে বন্দি হয়ে রয়েছে। জলে রোদে শীতে সে আর্তনাদ বছরের পর বছরের পরিক্রমায় নির্জীব নিষ্প্রাণ হয়ে পাথরে পরিণত হয়েছে।
ওই-ই তো ফৈজি! নবাবজাদা রাগ করে একদিন ফৈজিকে ওইখানে রাজমিস্ত্রি ডেকে ইট দিয়ে চারদিক থেকে গেঁথে দিয়েছিল।
কেন?
নবাবের মা-তুলে কথা বলেছিল যে সে!
মরালী বললে–তা নবাবের মা-ও ওইরকম নাকি?
গুলসন বললে–সবাই-ই তো ওইরকম। বাদটা কে আছে? নানিবেগমের মেয়েরা কেউ ভাল নয়, জানো। একটা করে রাত কাটাবার লোক কারও বাকি নেই। জামাইরা সব বাইরে বাইরে ষড়যন্ত্র করে বেড়াচ্ছে, কার কাছ থেকে টাকা মেরে দেওয়া যায় সেই চেষ্টা করছে, আর মেয়েরা বাড়ির ভেতর বসে ওই করছে! বড় জামাই নওয়াজেস মহম্মদ সাহেব তো কেবল এই মুর্শিদাবাদেই পড়ে থাকত শ্বশুরের কাছে, আর মেয়ে পড়ে থাকত ঢাকায়, সেখানকার দেওয়ানের সঙ্গে তার লটঘটি চলত–
কে দেওয়ান?
ওই যে কেষ্টবল্লভের বাবা রাজা রাজবল্লভ! যাকে কলকাতা থেকে ধরে নিয়ে এসেছে নবাব। সেই বড় মেয়েই তো হল সবকিছুর মূল। তাকেই তো ধরে রেখেছে এখেনে। কারও সঙ্গে কথা বলতে দেয় না, ঘরের বাইরে বেরোতে দেয় না,-নবাবজাদি হওয়ার এই তো সুখ!
গুলসন মেয়েটা অনেক রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে আসত আর চুপিচুপি অনেক কথা গল্প করত। বোধহয় নেশা করত। নেশার ঘোরে আর চুপ করে থাকতে পারত না। মরালীর বিছানায় শুয়ে শুয়ে অন্ধকারে মরালীকেই জড়িয়ে ধরত। মরালীকে আদর করত। গালে মুখে ঠোঁটে চুমু খেত। আদরে আদরে একেবারে ভাসিয়ে দিত মরালীকে। বলত–তোমায় আদর করছি বলে কিছু মনে যেন কোরো না ভাই
মরালী গুলসনের আদরে আদরে আড়ষ্ট হয়ে উঠত।
গুলসন বলত–তুমি যদি বেটাছেলে হতে তো খুব ভাল হত ভাই, দু’জনে বেশ একসঙ্গে এমনি করে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকতুম।
মরালী প্রথম প্রথম লজ্জায় কিছু বলতে পারত না। নতুন জায়গায় এসেছে, তখনও কারও সঙ্গে জানাশোনা হয়নি, কেমন যেন ভয় ভয় করত কিছু বলতে।
একদিন আর পারলে না, গুলসনকে ঠেলে সরিয়ে দিলে। বললে–তুমি নেশা করেছ, আমার কাছ থেকে চলে যাও
গুসন কিছু কথা বললে–না। গুম হয়ে মাথা নিচু করে রইল। তারপর বললে–ঠিক আছে, আমি আর তোমার কাছে আসব না–আমি চললুম
অল্প আলোয় মরালী দেখলে গুলসনের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। মনে বড় কষ্ট হল। এমন করে কষ্ট দেওয়া উচিত হয়নি মেয়েটাকে। কাছে গিয়ে বললে–তুমি কেঁদো না ভাই, আমি বুঝতে পারিনি।
গুলসন মরালীর হাতটা ছাড়িয়ে নিলে। তার বোধহয় তখন চৈতন্য হয়েছে। একেবারে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। বললে–তুমি ঠিক করেছ ভাই, আমাকে তুমি তাড়িয়ে দিয়ে ভালই করলে আমি আর আসব না তোমার কাছে-কথা দিচ্ছি আর আসব না
বলে চলেই যাচ্ছিল। কিন্তু মরালী তবু ছাড়ল না। বললে–কিন্তু তুমি কাঁদছ কেন?
গুলসন বললে–তুমি যদি ভাই আমাদের কষ্টটা জানতে তো আজকে আমাকে এমন করে অপমান করতে পারতে না–তা অপমান করেছ ভালই করেছ। আমার আগেই জানা উচিত ছিল–তুমি মুসলমান আর আমি হিন্দু মেয়ে–
মরালী বললেছি ছি, তুমিও শেষকালে আমাকে ভুল বুঝলে? আমি কি তাই বলেছি?
গুলসন বললে–না ভাই, আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। এই চেহেসতুনের ভেতরে থেকে থেকে আমি একেবারে পাথর হয়ে গেছি। তাই ভালবাসার কাউকে পেলে একেবারে বত্তে যাই আমরা, কেউ ভালবাসলেও আমরা কিন্তু হয়ে যাই কিন্তু তুমি আমায় ঠিক শিক্ষা দিয়েছ, আমি আর এমন কাজ কক্ষনও করব না ।
বলতে বলতে সেই যে ফস করে গুলসন চলে গিয়েছিল আর আসেনি। একদিন নানিবেগমের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে দু’জনে চলতে গিয়ে ভুলভুলাইয়ার মধ্যে আটকে গিয়েছিল মরালী, তারপর নবাব এসে পড়াতে আর কিছুই করা হয়নি। গুলসনও আগেকার মতন রাত্রে আর আসেনা। সেই যে সে রাগ করে চলে গেছে আর তার দেখা নেই। কেন সে অমন করে বলতে গেল।
সেদিন রাত্রে আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরোল মরালী। কোথায় কোন মহলে গুলসন থাকে তা জানে না। তবু যদি তার দেখা পাওয়া যায়, গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসবে তার কাছে। বাইরে সেই রকমই ঝাপসা অন্ধকার, কোন কোণে টিমটিম করে একটা আলো জ্বলছে। পথ দেখে দেখে চলতে চলতে যদি কোথাও হঠাৎ কাউকে দেখতে পাওয়া যায়, তাকেই জিজ্ঞেস করবে গুলশনের কথা।
এবার চিনতে পারলে মরালী সেই ভুলভুলাইয়ার রাস্তাটা। সেটাকে এড়িয়ে আরও ভেতরে চলে গেল। অনেক হাসি, অনেক গান চলেছে কোথাও। মরালী সাবধানে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল। চেহেল-সুতুন তো নয়, এও যেন একটা ছোটখাটো হাতিয়াগড়। মাথার ওপর একটা ছাদ। আশেপাশে বারান্দা-ঘর।
একটা ঘরের সামনে এসে চুপ করে দাঁড়াল মরালী। মনে হল ভেতরে যেন আলো জ্বলছে। আলো যখন জ্বলছে তখন ভেতরে যে আছে সে নিশ্চয়ই জেগে আছে। মরালী অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইল সেখানে। যদি কেউ জিজ্ঞেস করে সে কে, তা হলে সে কী উত্তর দেবে?
আশেপাশে চারদিকে চেয়ে দেখলে মরালী। বরকত আলি কি নজর মহম্মদরা যদি কেউ দেখতে পায় তা হলে হয়তো বিপদ হতে পারে।
