চারদিক নিঃসাড়। কান্ত আগুনের মালসাটার কাছে এল। তারপর চিঠিটা বার করলে পুঁটলি থেকে। তারপর ভাজ খুলে সেই অল্প আলোয় পড়তে লাগল
শ্রীল শ্রীযুক্ত নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার
নৃপতিবরেষু
আপনার পত্রবাহক মারফত আপনার পত্রটি পাইলাম। আপনি যে-দোষে আমাকে দোষান্বিত করিয়াছেন। আমি সে-দোষে দুষ্ট নহি। আমিও আপনার মতোই নবাবের পতনাকাঙ্ক্ষী! আপনার মতোই আমিও মনে-প্রাণে নবাবের নিপাত কামনা করি। অপিচ আপনার শরণাপন্ন হইয়া আমি আমার এই অভিপ্রায়ই ব্যক্ত করিয়াছিলাম। কিন্তু আপনি ভুল শুনিয়াছেন। আসলে আমি আমার প্রাণাধিকা পত্নীকে বের চেহেল্-সুতুনে পাঠাইনাই। বরং তাহাকে হত্যা করাই শ্রেয় মনে করিয়া তাহাই সাধন করিয়াছি। আমার পত্নী আর ইহজগতে নাই জানিবেন। হাতিয়াগড়ের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজ পত্নীকে হত্যা করা উপযুক্ত কর্ম বিধায় তাহা সাধন করিতে দ্বিধা করি নাই। তবে নবাবের রোষভাজন না হওনের জন্য কিঞ্চিৎ ছল-চাতুরির আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছি। আমার নফর শোভারাম বিশ্বাসের বিবাহিতা কন্যাকে তাহার পরিবর্তে পাঠাইয়াছি। এই স্বকৃত পাপের জন্য ঈস্বর আমাকে ক্ষমা করিবেন কিনা জানি না। তবে যাহা করিয়াছি তাহা স্বীয় দেশের মুখ চাহিয়াই করিয়াছি। যদি ঈশ্বর আমাদিগের সহায় হন তাহা হইলে নবাবের অপরাধের প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়া একদিন এই স্বকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিব প্রতিজ্ঞা করিতে মনস্থ করিলাম। অলমিতি বিস্তরেণ–ভবদীয়…
চিঠিটা পড়তে পড়তে কাস্তর হাতটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তা হলে সত্যিই সেই রানিবিরিকে সে আনেনি, মরালীকে সঙ্গে করে এনেছিল সেদিন। তা হলে কাটোয়ার সরাইখানাতে মরালীর সঙ্গেই কথা বলেছিল। চেহেল্-সুতুনের ভেতরে গিয়ে তা হলে মরালীর সঙ্গেই দেখা করেছিল। মোল্লাহাটির সেই মধুসূদন কর্মকারের দোকানের দাওয়ায় বসে সেই রাত্রেই যেন নিজের সমস্ত জীবনটা সে পরিক্রমা করে এল!
কান্ত দাঁড়িয়ে উঠল।
তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে দেখলে সরখেলমশাই তখনও নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। পাশেই তার পুঁটলিটা পড়ে আছে ঠিক তেমনি ভাবে। কান্ত আস্তে আস্তে আবার সব জিনিসগুলি বার করলে। গামছা, পানের ডিবে, চকমকি পাথর, খড়মজোড়া। ভাজকরা চিঠিখানা ভেতরে যেমন ছিল তেমনই রেখে দিয়ে সব জিনিসগুলো আবার একটার পর একটা সাজিয়ে রাখলে। তারপর বাইরে দাওয়ায় এসে বসে তারাভরা আকাশটার দিকে চেয়ে রইল। আমাকে তুমি শাস্তি দিয়ো ভগবান। আমি নবাবের কাজে অবহেলা করলাম, আমি হুকুম তামিল করতে পারলাম না, তার জন্যে তুমি আমাকে মার্জনা কোরো না। আমি পাপ করলাম, এ-চিঠি আমি বশির মিঞার হাতে তুলে দিতে পারব না। এর জন্যে যা শাস্তি তুমি। আমাকে দেবে সব আমি মাথা পেতে নেব। অপরাধ হলেও কিন্তু এ আমার অজ্ঞাত অপরাধ। আমার অপরাধের জন্যে মরালীর যেন কোনও ক্ষতি না হয়। মরালীর যেন ধর্ম নষ্ট না হয়। মরালী যেন চেহেল্-সুতুনের কয়েদখানা থেকে সসম্মানে মুক্তি পায়। তাকে তুমি দেখো ভগবান, তাকে তুমি রক্ষে কোরো।
তারপর সেই নিঃশব্দ নিঃসীম রাত্রির তারাভরা আকাশের অদৃশ্য দেবতাকে উদ্দেশ করে কান্ত বারবার দুই হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করতে লাগল। মরালীর যেন কোনও অনিষ্ট না হয় ভগবান, কোনও অনিষ্ট হয়।
*
খানিক পরেই আবার এল গুলসন। চারদিকে তখন বেশ ব্যস্ততা। সমস্ত চেহেল্-সুতুনে বেশ সাড়া পড়ে গেছে। সাজ সাজ রব উঠে গেছে মহলে মহলে। নানিবেগমের ঘরেও খবরটা দিয়ে এসেছিল পিরালি খা।
কলকাতার লড়াই ফতেহ করে এসেছে নবাব। সঙ্গে এনেছে হলওয়েল সাহেবকে। উমিচাঁদ, রাজবল্লভ, কৃষ্ণবল্লভ, সবাইকে।
তাদের কোথায় এনে রেখেছে?
পিরালি বললে–মতিঝিলে, বেগমসাহেবা! নেয়ামতের কাছে খবর পেয়েছি
চেহেল-সুতুনে আসবে না মির্জা?
মালুম নেই বেগমসাহেবা!
কেউ জানে না নবাবের কী মর্জি। খোদাও বলতে পারে না নবাবের কী মতিগতি। কিন্তু তা না বলতে পারুক, তৈরি থাকতেই হবে সকলকে। সকলকে সেজেগুজে আসর গুলজার করবার জন্যে তৈরি থাকতে হবে। কিংবা হয়তো কারও ডাক পড়বে। হয় তক্কি বেগম, নয় বব্বু বেগম, নয় গুলসন বেগম। যার ডাক পড়বে সে সেদিন বড় ভাগ্যবতী। তার ভাগ্য এক রাত্রের জন্যে ফিরে যাবে। নবাবকে যদি খুশি করতে পারে, তা সে যে-কোনও ভাবেই হোক, হয় গান শুনিয়ে, নয় বীণ বাজিয়ে, নয় তো বা নেচে, তার হাতে আকাশের চাঁদ নেমে আসতে পারে। সবই নির্ভর করছে নসিবের ওপর। চেহেল সুতুনে যখন যার নসিব খুলেছে সে রাতারাতি মুর্শিদাবাদের মসনদ পেয়ে গেছে। আগে একবার পেয়েছিল ফৈজি বেগম। একটা মুঠোর মধ্যে ধরা যেত তার কোমরটা। তার একটা কথায় মুর্শিদাবাদের যে-কোনও। মানুষের গর্দান যেত। আলিবর্দির আমলেও ফৈজির মুখের কথাই ছিল নবাবের মুখের কথা। ফৈজির জন্যে তাঞ্জাম তৈরি থাকবে দিনরাত। সে যেখানে খুশি যাবে, যেখানে খুশি বেড়াবে, তার জন্যে কাউকে কৈফিয়ত দেবার পরোয়া ছিল না তার। কিন্তু বড় বাড় বেড়েছিল সে। মুখের ওপর যাকে-তাকে যা-তা বলত। নবাবের মাকেই একদিন যা-তা বলে বসল ফৈজি! সেদিন উঠতি নবাবজাদা সে অপমান আর। সহ্য করেনি।
ওই যে দেখছ উঠোনের ওপাশে ওই ঘরটা?
