ভুলভুলাইয়া?
ভুলভুলাইয়া মানে যাকে আমরা বলি গোলকধাঁধা। শেষকালে তুমি ভয় পেয়ে ভুলভুলাইয়ার মধ্যে ঢুকে পড়েছিলে! ভাগ্যিস আমি দেখতে পেলাম।
তারপর মরালীকে ধরে তুলে বললে–চলল চলল, এখনও কেউ কিছু টের পায়নি-কী সব্বনাশ হত বলো দিকিনি
বলে মরালীকে ঘরে এনে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল চুপি চুপি। বললে–রাত্তিরে আবার আসব ভাই। আজ ঠিক তৈরি থেকো, নানিবেগমের কাছে নিয়ে যাব আমি এখন যাই–বুঝলে
সমস্ত রাত ঘুম হয়নি মরালীরা আর ঘুমের ঘোরেই কেটে গেল দিনটা। নজর মহম্মদ বোধহয় একবার ঘরে এসেছিল। কিন্তু ঘুমোচ্ছে দেখে কিছু বলেনি। বাঁদিটাও এসে গোসলখানায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল। চান করিয়ে চুল বেঁধে দিতে চেয়েছিল। খাবার এনে মাথার কাছে রেখেছিল। মরালী সারাদিন ওঠেনি, চান করেনি, চুল বাঁধেনি, খায়নি। কিছুই করেনি। কেবল নিজের মনেই আকাশ-পাতাল ভেবেছিল। এ কী রকম ভুলভুলাইয়া। তার জীবনটার মতোই যেন ভুলভুলাইয়ার জালে জড়িয়ে পড়েছিল সে। কোথায় হাতিয়াগড় আর কোথায় এই ভুলভুলাইয়ার গোলকধাঁধা। একদিনের মধ্যে যেন সমস্ত জীবনটা তার গোলকধাঁধায় জড়িয়ে গেল।
আবার অনেক রাত্রের দিকে চুপি চুপি গুলসন এসে হাজির। বললে–চলল ভাই, আজ যেন আর রাস্তা ভুলে যেয়ো না, আমার হাত ধরে থাকবে
বলে বেরোতে যাবার মুখেই হঠাৎ চারদিকে একটা তুমুল শোরগোল উঠল। চেহেল সুতুনের বাইরে যেন হাজার হাজার মানুষের চিৎকার শোনা গেল। নবাব মির্জা মহম্মদ সিরাজ-উ-দ্দৌলা হেবাৎ জঙশাকুলি খান বাহাদুর আলমগির কি ফতে
আর সঙ্গে সঙ্গে দুমদাম শব্দে আতস বাজি ফুটতে লাগল। হাউই বাজি আকাশের গায়ে উঠে গিয়ে ফুলঝুরি ফুটিয়ে তুলতে লাগল। চেহেলসূতুনের ভেতরেও যেন দৌড়োদৌড়ি শুরু হল। যারা ঘুমিয়ে পড়েছিল তারা জেগে উঠেছে। জেগে উঠে বাইরে এসে আকাশের দিকে চেয়ে দেখতে লাগল। নহবতখানায় ইনসাফ মিঞা মুলতান রাগে সুর ধরল। ছোট শাগরেদ ডুগি-তবলায় চাটি দিয়ে বলে উঠল-বহোত আচ্ছা মিঞাসাব-বহোত আচ্ছা
চেঁচামেচি শুনেই গুলসন মরালীর হাতটা ছেড়ে দিয়েছে। খানিকক্ষণ কান পেতে রইল বাইরের দিকে। তারপর বললে–সব্বনাশ হয়েছে ভাই, নবাব ফিরে এসেছে-তুমি দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়ো, আমি যাই এখন–
বলে নিঃশব্দে পাশের গুপ্ত দরজা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
*
মধুসূদন কর্মকারের দোকানের পেছন দিকে সরখেলমশাই তখন নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। মোল্লাহাটি নিঃঝুম হয়ে এসেছে। সেই সকালে এসে পর্যন্ত অনেক খাতির করেছে সরখেলমশাই। বলেছে–এ মোল্লাহাটিতে আর কীই বা খাবার জিনিস আছে, একবার দয়া করে যাঝে আমাদের কেষ্টনগরে, এমন সরভাজা খাওয়াব যে ভুলতে পারবেন না
সারাদিনই খাবার গল্প করেছে। নিজের হাতে রান্না করেছে। কিন্তু হাতের পুঁটলিটা একবারও হাতছাড়া করেনি। বড় সাবধানী মানুষ সরখেলমশাই।
রাত্তিরবেলা সরখেলমশাইয়ের নাক ডেকে উঠতেই কান্ত আস্তে আস্তে উঠল। পুঁটলিটাকে বালিশ করেই শুয়েছিল সরখেলমশাই। কিন্তু ঘুমের ঘোরে বালিশ থেকে মাথা সরে গেছে।
কান্ত আস্তে আস্তে পুঁটলিটা টেনে নিয়ে তার ভেতরে হাত পুরে দিলে। ওপরেই ছিল তেলচিটচিটে গামছাখানা। তার নীচে একটা ফেরো ঘটি। তার নীচে পানের ডিবে। চকমকি পাথর একটা। তার নীচেয় খড়মজোড়া। একে একে সবগুলো বার করলে। বশির মিঞা বলেছিল চিঠি একটা থাকবেই। হাতিয়াগড়ের রাজার নিজের হাতে লেখা চিঠি। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে লেখা। জরুরি।
বাইরে কোথায় একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেয়ে সরে আসতে গিয়েই পানের ডিবেটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে ঝনঝন আওয়াজ করে উঠল।
কিন্তু না, সরখেলমশাইয়ের ঘুম বড় গাঢ়। একবার শুধু পাশ ফিরে শুল। ঘুমের ঘোরে পুঁটলিটার কথা আর মনেও পড়ল না।
কান্তর কেমন মনে হতে লাগল এ সে করছে কী! চাকরির জন্যে চুরি করতে যাচ্ছে সে! পুঁটলিটার তলার দিকে একটা চিঠি বেশ ভাজ করে রাখা। সেখানা নিতে গিয়েও কেমন হাতটা কেঁপে উঠল তার। কেন সে চিঠিটা চুরি করবে! বশির বলেছে নবাবের কাজ। নবাব মানেই ভগবান। যে-ভগবানকে সে রোজ ডাকে সেই ভগবানই কি নবাব। ভগবান তো কোনও অন্যায় করে না। কিন্তু নবাব কেন অন্যায় করে। কেন হাতিয়াগড়ের রানিবিবিকে নিজের চেহেল্-সুতুনে নিয়ে আসে ভোগের জন্যে! নবাবের রাজত্বে কেন এত অত্যাচার। সারাফত আলি তা হলে কেন হাজি আহম্মদের বংশকে দিনরাত অভিশাপ দেয়।
কিন্তু আবার মনে হল, নবাব যদি অত্যাচার করে তো তার ফল ভোগ করবে নবাবই। সে কেন অন্যায় করবে। তার অন্যায়ের ফল ভোগ তো তাকেই করতে হবে।
বাইরে কুকুরটা আবার ডেকে উঠল।
কিন্তু না, এবার সরখেলমশাই আর পাশ ফিরল না। কান্ত আস্তে আস্তে ভাঁজ করা কাগজটা হাত ঢুকিয়ে নিয়ে নিলে। বাইরের দাওয়ায় মালসায় খুঁটের আগুন জ্বলছিল। সেখানে এসে দাঁড়াল। সামনেই মুর্শিদাবাদের রাস্তাটা সোজা চলে গিয়েছে। এত রাত্রে রাস্তায় বেরোতে ভয় করতে লাগল। চিঠিটা নিয়ে হাতের মুঠোয় রাখলে। তারপর নিজের পুঁটলিতে পুরল। আর একটু ভোর হলেই এখান থেকে হাঁটা দিতে হবে। মধুসূদন কর্মকার ওঠবার আগেই।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ইচ্ছে সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে দিলে। চিঠিটার ভেতর কী লিখেছে হাতিয়াগড়ের রাজা! কী এমন লিখেছে যার জন্যে তাকে পাঠাতে হল এই মোল্লাহাটিতে!
