গুলসন বললে–তা হলে তুমি এতক্ষণ ছাই বুঝেছ, ওরাই তো হল এখানকার সব! ওরাই তো এইসব চালাচ্ছে। ওরা খুশি থাকলে তোমাকে একেবারে নবাবের খাস বেগম করে দিতে পারে। একেবারে লুৎফুন্নিসা বেগমকে হটিয়ে দিয়ে তোমাকে নবাবের কোলে বসিয়ে দিতে পারে। ওদের এত ক্ষেমতা।
মরালী বললে–তা হলে নানিবেগমের কাছে নালিশ করলে তো আমারই ক্ষতি
সে ভাই তুমি যা ভাল বোঝো করো! এ হল সেই শাঁখের করাত দু’দিকেই কাটে। এগোলেও নির্বংশের বেটি, পেছোলেও নির্বংশের বেটি। আমাদের হয়েছে তাই, তাই তো আমরা মুখ বুজে সব সহ্য করি আর বিষ খাই। তা যদি বলো তো বিষই খাও
মরালী বললে–না, তবু একবার নানিবেগমের কাছে গিয়েই দেখি না। গেলে তো আমার গলাটা আর কেটে দেবে না। কেউ না জানতে পারলেই হল! তারপর যদি ভাল বুঝি তো বলব! তা আমি যে। এখেনে এসেছি তা জানে তো নানিবেগম?
কে আর জানাবে! জানে না বলেই তো তোমাকে এখেনে একটেরে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে। পাছে নানিবেগম জানতে পারে। নানিবেগম জানতে পারলেই ওদের জিজ্ঞেস করবে কে তুমি, কোত্থেকে এলে, কবে কখন এলে; হেনতেন সব কথার জবাবও ওরা দিতে পারবে না
তা নানিবেগম কি এখানকার সবাইকে চেনে?
সবাইকে চেনে। শুধু তোমাকেই এখনও দেখেনি। আগে তো এখেনে অনেক বেগম ছিল। সব একে একে দূর হয়েছে। বুড়ি হয়ে গেলে তাদের খোজারা বাইরে তাড়িয়ে দিয়ে আসে। যতদিন জোয়ান বয়েস থাকে তদ্দিনই খাতির। নানিবেগম না থাকলে আরও কত জোয়ান মেয়ে আসত।
এখন ক’জন বেগম আছে?
তা ভাই গুনে দেখিনি। গোনা যায় না।
তারপর একটু থেমে বললে–তা এখন যাবে তুমি নানিবেগমের কাছে? এখন তো অনেক রাত, এখন গেলে কেউ দেখতে পাবে না, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি
মরালী বললে–কিছু মনে করবে না তো?
না, মনে আবার করবে কী!
কিন্তু এখন কি জেগে আছে নানিবেগম?
রাত্তিরে প্রায় ঘুমোয়ই না নানিবেগম! আর আজ তো জুম্মাবার। জুম্মাবারে সারাদিন কোরান পড়ে, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে এসে ঘরে বসে কোরান পড়ে খালি। আর পাশে থাকে নবাবের বিবি লুৎফুন্নিসা বেগম। তোমার কিছু ভয় নেই। আমি তোমাকে দূর থেকে ঘরটা দেখিয়ে দেব, তুমি ঢুকে পড়ে কুর্নিশ করবে। তারপর যা জিজ্ঞেস করবে বলবে–
মনে আছে, সেদিনই প্রথম গুলসন এক অদ্ভুত পথ দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল মরালীকে। সেসব পথ সকলে জানে না। গুলসন মেয়েটা এমহলের কানাচ দিয়ে ও-মহলের পেছন দিয়ে, কোথা দিয়ে কোথায় নিয়ে চলেছিল তার কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। সব যেন ঝাপসা। চারদিকে যেন ফিসফিস শব্দ। চারদিকে যেন সবাই ফিসফিস করে ষড়যন্ত্র করছে। কোথাও কান্না, কোথাও হাসি, কোথাও বিদ্রূপ, কোথাও খোশামোদ। হাসি, কান্না, বিদ্রূপ, খোশামোদ নিয়েই যেন চেহেল্-সুতুনের কারবার। চেহেল্-সুতুন অনেক দেখেছে, অনেক ভুগেছে, অনেক লজ্জা পেয়েছে, আবার অনেক ভয়ও পেয়েছে। তবু যেন তার দেখা, ভোগা,লজ্জা পাওয়া আর ভয় পাওয়ার তখনও শেষ হয়নি। শেষ পরিচ্ছেদটা দেখবার জন্যেই বুঝি তখন মরালীকে আনতে হয়েছে তার ভেতর। মরালীই বুঝি চেহ্নেসূতুনের শেষ পরিচ্ছেদের শেষ জিজ্ঞাসার চিহ্ন।
চলতে চলতে হঠাৎ কোথায় কী একটা শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে চমকে উঠেছে গুলসন। গুলসন বললে–শিগগির এদিকে চলে এসো ভাই, পিরালি খাঁ…
বলেই গুলসন পাশের দিকে সরে পড়ল। মরালীও সঙ্গে সঙ্গে পেছনে পেছনে গেল। এত নিঃশব্দে কাণ্ডটা ঘটল যে কারও জানবার কথা নয়। মরালী লক্ষ করলে পাশ দিয়ে পিরালি খাঁ চলে গেল, টেরও পেল না কিছু। তারপর সেই আড়ালটা থেকে বেরিয়ে চারদিকে চেয়ে দেখলে। কোথায় গেল গুলসন! ডাকতেও ভরসা হল না। যদি খোজারা শুনতে পায়। আসবার সময় মরালী নিজের ঘর অন্ধকার করে। রেখে এসেছিল। সবাই জানবে মরিয়ম বেগম ঘুমিয়ে পড়েছে। মরালী পাশের একটা সরু গলির মধ্যে ঢুকে পড়ল। গুলসন বোধহয় তারই মধ্যে আছে। কিন্তু গলিটার যেন আর শেষ নেই। গলিটা যতদুর গিয়েছে ততদূর গেল মরালী। সেখানেও যেন শেষ নয় গলিটার। সেদিকেও এগিয়ে যেতে লাগল মরালী। তার পরেও যেন গলিটা আছে। আরও অনেক দূর গেলেই যেন বেরোবার রাস্তা পাওয়া যাবে। মরালী আরও এগিয়ে চলল। আরও আরও আরও অনেক দূরে। শেষকালে পা ব্যথা করতে লাগল। এ কোথায় এসে পড়ল সে। কোনদিকে এর শুরু কোনদিকে এর শেষ! কোথায় এনে ফেললে তাকে গুলসন! একবার ভাবলে গুলসনের নাম ধরে ডাকে। আবার ভয়ও করতে লাগল। যদি কেউ টের পায়। যদি কেউ জানতে পারে। মরালী সমস্ত রাত ধরে কেবল ছটফট করতে লাগল সেখানে ঘুরে ঘুরে। চিৎকার করবার উপায় নেই, পালাবার উপায় নেই, সাহায্য পাবারও উপায় নেই। সে এক অমানুষিক যন্ত্রণা। সমস্ত হাতিয়াগড়টাই যেন সে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেল। তারপর একসময় আর পারলে না। সেখানেই বসে পড়ল। তারপর একেবারে সেই ঠান্ডা পাথরের মেঝের ওপরটাতে লুটিয়ে পড়ল। তখন আর তার জ্ঞান নেই..
পরের দিন সকালবেলা গুলসনই এসে ডাকলে।
মরালী চেয়ে দেখে চিনতে পারলো বললে–আমি কোথায় আছি ভাই?
গুলসন বললে–আমি তোমাকে বললুম আমার সঙ্গে আসতে, তুমি কোনদিকে চলে গেলে বুঝতে পারলুম না ভাবলুম বোধহয় তোমার নিজের ঘরেই গিয়েছ, সেখানেও নেই। আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। শেষকালে মনে সন্দেহ হল। ভাবলাম একবার ভুলভুলাইয়াটা দেখে আসি
