গুলসন কিন্তু সেই তখনই এসেছিল। সেই কান্ত চলে যাবার পরই।
এসেই বলেছিল–কী হল? কে এসেছিল? সত্যিই তোমার কোনও জানাশোনা লোক নাকি ভাই?
তারপর মরালীর মুখের দিকে চেয়ে বলেছিল–একী ভাই, তুমি কাঁদছ নাকি?
বলে নিজের ওড়নি দিয়ে মরালীর চোখ-মুখ মুছিয়ে দিয়েছিল।
মরালী বলেছিল–তুমি যাও, শেষকালে কেউ দেখে ফেললে তোমাকেই হয়তো কষ্ট দেবে ওরা। তখন আবার তম্বি করবে!
হু, তম্বি করবে। তম্বি অমনি করলেই হল কিনা। প্রথম প্রথম আমিও তোমার মতন ভয় পেতাম। আমিও তোমার মতন কাঁদতাম! শেষে মরিয়া হয়ে উঠলাম। ভাবলাম জীবনটা যখন নষ্টই হয়ে গেছে তখন কাকে আর ভয় করতে যাব! আমাকে চোখে চোখে রাখত, আরক খেতে দিতে চাইত! শেষকালে ভাই একদিন আর পারলাম না, আরক খেলাম।
খেলে?
হ্যাঁ, এখনও খাই, রোজ খাই। রোজ না-খেলে চলে না। না-খেলে ভাই আমার মাথা ঘোরে, গা বমিবমি করে। এখন একেবারে নেশা ধরে গেছে।
কিন্তু তুমিই তো বলেছিলে ওতে সাপের বিষ মেশানো থাকে!
তা থাকুক, সাপের চেয়েও কত বড় বড় জানোয়ারের ছোবল খাচ্ছি, সাপ তো তার কাছে তুচ্ছ। তুমিও ছোবল খাবে। তুমি তো ভাই এখন সবেমাত্তর এসেছ, কিছুদিন থাকো এখেনে, তখন সব টের পাবে
বলেই বললে–না না, তোমার ভয় পাবার কিছু নেই, আমি যখন আছি, তখন তোমার কিচ্ছু ভয় পাবার নেই–আমি তোমাকে ঠিক বাঁচিয়ে দেব। তুমি কিন্তু ভাই কথা দাও আরক খাবে না তুমি, মোটে আরক ছোবে না?
মরালী বললে–তুমি যখন এত বলছ, তখন কেন ও-বিষ খেতে যাব?
হ্যাঁ ভাই, খেয়ো না। ও বিষই বটে! সারাফত আলির ওই বিষেরই ব্যাবসা। আমরা একবার বিষ খেয়ে ফেলেছি, তাই আর উপায় নেই। এখন মরে গেলেও আর ছাড়তে পারব না
মরালী বললে–তা হলে আমি কী করব বলল তো?
গুলসন বললে–আমি তো তোমাকে বলেছি, আমি যখন আছি, তখন তোমার কোনও ভয় নেই। কিন্তু ও-লোকটা কে? কাকে নজর মহম্মদ ভেতরে নিয়ে এসেছিল? কী মতলব ওর?
মরালী খানিকক্ষণ চুপ করে রইল! কী জবাব দেবে সে?
ও বুঝেছি, ওই নজর মহম্মদ ওকে নিয়ে এসেছিল তোমার কাছে, তোমাকে যাচাই করতে, না? এইরকম করেই ওরা যাচাই করে মেয়েদের। একবার যদি ওদের কথায় ভাই ভুলে যাও তো গেলে তুমি!
কী করবে তা হলে?
তখন আর তোমার রক্ষে নেই। তখন ওরা দু’হাতে টাকা লুটবে। একেবারে দু’হাতে টাকা লুটবে। শহর থেকে সব বদমাইস মরদদের এনে তোমার ঘরে ঢুকিয়ে দেবে, তোমার ঘরে তাদের বসাতে হবে, তাদের খাতির করতে হবে–তুমি তখন ইচ্ছে না করলেও কোনও উপায় থাকবে না।
তা এতগুলো বেগম নিয়ে নবাবের কী লাভ?
গুলসন বললে–লাভ নয়? আজ এটা, কাল সেটা, এমনি করেই সকলকে চেখে-চেখে বেড়াবে
কিন্তু নবাবের সময় কখন? নবাব কি এই চেহেল-সুতুনের ভেতরে আসে?
গুলসন বললে–নবাবের মাথায় হাজারটা ঝামেলা, নবাবের সময় না-থাকলেই বা, তার ইয়াররা তো আছে। তার ইয়ারদের জ্বালাতেই তো আমরা অস্থির! কাজির চেয়ে যে প্যায়দার হুমকি বেশি এখেনে!
মরালী বললে–আমি সেই সব ভেবে ভেবে একেবারে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে আছি। আমি তো বাইরে থেকে এসব টের পাইনি। আমি জানতুম এখানে বুঝি তোমরা খুব আরামে থাকো!
আরাম না ছাই! কত বেগম এখানে গলায় দড়ি দিয়েছে তা জানো?
ওমা, তাই নাকি?
তা দেবে না? আমারই তো মাঝে মাঝে গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে। আগেকার একনবাবের পনেরোশো বেগম ছিল, তা জানো? পনেরোশো বেগম আর একজন মাত্তর নবাব। ভাবো তো ভাই। অবস্থাটা কী!
তা নবাব কী করে সামলাত অতগুলো বেগমকে?
সামলাবার কী আছে? ওই যেমন তোমার কাছে বাইরে থেকে লোক নিয়ে এসেছিল নজর মহম্মদ, তেমনি তাদের কাছেও বাইরে থেকে তোক আসত। ঘেন্নার কথা বলব কী ভাই, এখেনে এসে পর্যন্ত যে কত কাণ্ড দেখেছি কী বলব। এখেনে বোজ আঁতুড় হচ্ছে আর রোজ আঁতুড় উঠছে। এখানকার মেথররা তাই নিয়ে গিয়ে বাইরে ফেলে দিচ্ছে
বাইরে কোথায় ফেলে?
ফেলবার কি আর জায়গার অভাব আছে এদের। কাছেই গঙ্গা রয়েছে, দেয় তাতে ভাসিয়ে। মা-গঙ্গাকে যে কত সহ্য করতে হয়, তা তুমি যদি হিন্দু হতে তো বুঝতে পারতে! আর কাগ-চিল-শকুনের কি অভাব আছে শহরে?
মরালীর মুখ দিয়ে ছি ছি শব্দ বেরিয়ে এল।
বললে–তা হলে আমি কী করব বলো তো ভাই? আবার যদি ওই লোকটাকে নিয়ে আসে নজর মহম্মদ? আবার যদি আরক খাওয়াতে আসে?
গুলসন একটু চুপ করে রইল। তারপর বললে–তোমার মরতে ভয় করে?
মরালী বললে–মরতে ভয় করবে না? কী বলছ তুমি? মরতে কার না ভয় করে?
না, আমি তা বলছিনে! বলছি যদি তোমার সাহস থাকে তোনানিবেগমকে গিয়ে সব বলে দিতে পারো।
নানিবেগমের কাছে যাব কী করে?
সে আমি সব ব্যবস্থা করে দের। নজর মহম্মদ, বরকত আলি, পিরালি খাঁ ওরা কেউ জানতে পারবে, আমি তোমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে নিয়ে যাব।
কিন্তু গিয়ে তাকে কী বলব?
তুমি বলবে যে খোজারা তোমাকে কেবল আরক খাওয়াতে চেষ্টা করছে, বাইরের লোকদের এনে তোমার ঘরে ঢোকাচ্ছে, এইসব বলবে!
কিন্তু খোজারা যদি জানতে পারে? তারা আমার ওপর রেগে যাবে না?
সেই জন্যেই তো বলছিলুম তোমার মরতে ভয় করে?
কেন? জানতে পারলে আমাকে মেরে ফেলবে নাকি?
ওমা, তা মারবে না? তুমি তাদের নামে নালিশ করবে আর তারা মুখ বুজে সব সইবে? কত মেয়েকে ওরা ওইরকম মেরে ফেলেছে যে।
তা কেউ কিছু বলে না ওদের? ওদের ধরে কেউ গারদে পোরে না?
