তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কায়দা করে কান্ত প্রশ্ন করলে মশাইয়ের কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
ভদ্রলোক বললে–আমি আসছি হাতিয়াগড় থেকে
হাতিয়াগড় নামটা শুনেই আরও সতর্ক হয়ে উঠল কান্ত। আশ্চর্য, যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে এখানে তারই সঙ্গে এমনভাবে রাস্তায় এত সহজে দেখা হয়ে যাবে ভাবা যায়নি। লোকটা কিন্তু বেশ নিশ্চিন্ত হল একটা সঙ্গী পেয়ে। বললে–যা দিনকাল পড়েছে মশাই, পথে একা একা চলাই বিপদ, এই সেদিন একটা লোককে খুন করে ফেলে রেখে গেছে পুঁটিয়ার রাস্তায় দেখলাম
আপনাকে বুঝি সব জায়গায়ই ঘুরতে হয়?
ভদ্রলোক বললে–জমিদারি-সেরেস্তার কাজ হল ঝকমারির কাজ। ঘুরতে ঘুরতেই প্রাণ বেরিয়ে যায়। এই তো হাতিয়াগড় থেকে আসছি মোল্লাহাটিতে, এখান থেকে সোজা যাব কেষ্টনগরে। আবার কেষ্টনগরে একদিন থাকি কি না-থাকি, যেখানে মহারাজের হুকুম হবে যেতে হবে। আমি না হলে তো কাজ চলে না মহারাজার
কান্ত পুঁটলিটার দিকে চেয়ে দেখলে। বেশ পেট-ফোলা পোঁটলা। ওরই ভেতর বোধহয় চিঠিটা আছে। কী বিচ্ছিরি চাকরি। এমন বিশ্বাসী লোককে ঠকাতে হবে! অথচ লোকটা তো কোনও দোষ করেনি।
দেখতে দেখতে মধুসূদনের দোকানটা এসে গেল। ভদ্রলোককে দেখেই দোকানদার দু’হাত জোড় করে অভ্যর্থনা করলে আসুন সরখেলমশাই, আসুন–কাজটা হল?
বেশ বর্ধিষ্ণু লোক মধুসূদন কর্মকার। দোকানটা বেশ সাজানো। গোবর দিয়ে পরিপাটি করে নিকোনো দাওয়া। চালের বাতা থেকে শিকের ওপর কয়েকটা চালকুমড়ো ঝুলছে।
সঙ্গে উনি কে?
উনি আমার পথের সঙ্গী। কান্তবাবু। কান্ত সরকার মশাই। চাকলা বর্ধমানের বড়চাতরা গ্রামে বাড়ি, উনিও এখেনে একরাত্তির থেকে মুর্শিদাবাদে যাবেন নিজামতের কাছারির কাজে। আজকাল রাস্তায় সৎসঙ্গী পাওয়াই সৌভাগ্যের কথা কর্মকারমশাই। এবার হাতিয়াগড়েও বেশ কাটল একটা রাত
মধুসূদন জিজ্ঞেস করলে-কী রকম?
আমাদের সেই উদ্ধব দাসমশাই নতুন গান বেঁধেছে, শোনালে আমাকে।
তা তাকে নিয়ে এলেন না কেন সঙ্গে করে?
সরখেলমশাই বললে–দাসমশাই কি আর সেইরকম লোক? আমাকে বললে–মুগের ডাল খেতে আসবে কেষ্টনগরে, তারপরে আবার কী মতি হল, বললে–না, অনেকদিন লস্করপুরে যাইনি, সেখানে রথের মেলায় ভাল আনারস পাওয়া যায়, তাই খেতে যাব। আর এল না।
সরখেলমশাইয়ের সঙ্গে কর্মকার মশাইয়ের বেশ ভাব বোঝা গেল। পোঁটলাটা দাওয়ার ওপর নামিয়ে গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছতে মুছতে সরখেলমশাই বললে–দাসমশাই একটা কাণ্ড করে ফেলেছে, শুনেছেন?
কী কাণ্ড?
সে এক আজব কাণ্ড। রাজবাড়ির গোকুলের কাছে শুনলুম। হঠাৎ নাকি শোভারাম বিশ্বাসের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলেছিল। তা মজার কাণ্ড, বিয়ের রাত্তিরেই বউ বাসরঘর থেকে পালিয়ে গেছে। দাসমশাই আবার হাসতে হাসতে সবিস্তারে বললে–সেই ঘটনা।
মধুসূদন কর্মকার বললে–সে তো আমি শুনেছি, আমাকে বলেছে
আর সেই গানটা শোনেননি?
কোন গান?
বউয়ের শোকে যে-গানটা লিখেছে দাসমশাই আমার তো মুখস্থ হয়ে গিয়েছে–
শোনো হে শিব শ্রবণে।
আমি রব না ভব-ভবনে ॥
যে-নারী করে নাথ।
পতিবক্ষে পদাঘাত
তুমি তারই বশীভূততা।
আমি তা সব কেমনে ॥
আহা বেড়ে গান লিখেছে, কর্মকারমশাই।
মধুসূদন বললে–দাসমশাই আমাকে বলে গেছে তার বউকে নিয়ে একটা কাব্য লিখবে। আপনাদের রায় গুণাকর যেমন অন্নদামঙ্গল’ লিখেছেন, অমনি ওর চেয়েও ভাল কাব্য লিখবে।
সরখেলমশাই হেসে উঠল–পাগলছাগল মানুষ তো,বউ পালিয়ে গেছে তাতে বিকার নেই মনে
মধুসূদন বললে–মহাপুরুষ মাত্রই তো পাগল
তা যা বলেছেন। অমন মন পেলে আমরা বেঁচে যেতুম। এদিকে আর একটা কাণ্ড শুনে এলাম–দ্বাসমশাইয়ের শ্বশুর সেই শোভারাম বিশ্বাস মশাই কিন্তু মেয়ের শোকে পাগল হয়ে গেছে!
কান্ত চমকে উঠল। এতক্ষণ কান্ত কোনও কথা বলেনি। মন দিয়ে দু’জনের কথা শুনছিল। আর সরখেলমশাইয়ের পুঁটলিটার দিকে চেয়ে দেখছিল। যে এতখানি বিশ্বাস করেছে তাকে, তার কাছ থেকে চিঠি চুরি করতে হবে? এমন কী জরুরি চিঠি যা চুরি না করলে বশির মিঞার চলছে না। যে-চিঠি না স্লেখতে পেলে নবাব-নিজামত লাটে উঠবে! কিন্তু হঠাৎ শোভারামের পাগল হওয়ার কথা কানে যেতেই আর চেপে রাখতে পারলে না। জিজ্ঞেস করলে–শোভারাম বিশ্বাসমশাই পাগল হয়ে গেছেন?
দু’জনেই চাইলে কান্তর দিকে।
মশাই কি শোভারামকে চেনেন নাকি?
কান্ত বললো, হ্যাঁ চিনতাম তাঁকে!
তাকে কী করে চিনলেন? মশাইয়ের কি হাতিয়াগড়ে যাওয়া-আসা আছে?
হ্যাঁ, বার দু-এক গিয়েছিলাম।
কী সূত্রে?
কর্মসূত্রে!
এরপর আর কথা এগোল না। মধুসূদন কর্মকারের চাকর হাত-মুখ ধোবার জল নিয়ে এল। হাত-মুখ ধুতেই ব্যস্ত হয়ে উঠল সরখেলমশাই। কিন্তু পুঁটলিটা দাওয়ায় রেখে গেল না। সেটা ছাড়তে যেন ভয় হল সরখেলমশাইয়ের। সেটাও সঙ্গে নিয়ে সয়ত্নে পাশে রেখে মুখ-হাত-পা ধুয়ে গামছা দিয়ে মুছে আবার দাওয়ায় এসে বসল। কান্ত বুঝল বশির মিঞা যা বলেছে তার একবর্ণও মিথ্যে নয়। নিশ্চয় কোনও গোপনীয় চিঠি আছে ওর মধ্যে। কান্ত কিন্তু নিজের পুঁটলিটা দাওয়ায় রেখে মুখ-হাত ধুতে গেল।
*
গুলসন মেয়েটা সেদিন এসেই বললে–চলল ভাই, চলো–
মুরালীর প্রথমটায় একটু সংকোচ হয়েছিল। যদি নজর মহম্মদরা কিছু বলে! যদি নজর মহম্মদ, কি বরকত আলিদের সর্দার পিরালি খাঁ জানতে পারে! কিন্তু সেই যেদিন কান্ত এসেছিল সেইদিন থেকেই নজর মহম্মদ যেন একটু অন্যরকম ব্যবহার শুরু করেছে। হয়তো এক মোহর ঘুষ পেয়েছে বলে। একটু অন্তরঙ্গ হবার চেষ্টা করেছে। চোখে যে তীক্ষ্ণতা ছিল সেটা যেন একটু কমে এসেছে। আর সেরকম নজরবন্দি করে রাখবার চেষ্টা নেই। কিংবা হয়তো নজর রাখে আড়াল থেকে। আড়াল থেকে হয়তো দেখে মরালী কী করছে, কী খাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে। আর বাঁদিটাও অদ্ভুত। যেন মাটির পুতুল। কথা শুনতে পাচ্ছে কি না তাও বোঝা যায় না। তার সঙ্গে যে বসে বসে একটু আজেবাজে দুটো কথা বলে সময় কাটাবে তারও উপায় নেই। তার কী নাম তাও কেউ বলে না। ঘাগরা পরা, মাথায় বেণী ঝোলে, চুপি চুপি আসে, দাঁড়িয়ে থাকে, খাওয়ার সময় অপেক্ষা করে। তারপর এঁটো বাসনগুলো নিয়ে চলে যায়। আর বিরক্ত করে না। বাঁদিটা সামনে না-এলেই মরালীর ভাল লাগে।
