কাজটার কথা শুনে মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেল কান্তর। হাতসাফাই মানেই তো চুরি! শেষকালে চুরি করতে হবে চাকরির জন্যে। একবার একটা মেয়েমানুষ এনে দিয়েছে হারেমে, এবার আর একটা চিঠি চুরি করতে হবে!
কান্ত বললে–ওকাজ আমি পারব না ভাই, ওকাজ আমার দ্বারা হবে না–আমি পরের চিঠি চুরি করতে পারব না
বশির মিঞা যেন কথাটা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। বললে–চুরি? চুরি বলছিস কেন? দেশের কাম করবি তাকে তুই চুরি বলছিস? দেশকা সওয়াল ঠিক রাখতে হবে না? দেশের দুশমনদের শায়েস্তা রাখতে চুরি-রাহাজানি বাটপাড়ি করা কি খারাব কাম? তুই তো নবাবের কাম করছিস! নিজামতের পরওয়ানা আছে তোর কাছে, তোর কীসের ডর?
বশির মিঞা তাকে অনেকক্ষণ ধরে বোঝালে। দেশের স্বার্থের জন্যে কোনও পাপই পাপ নয়। তুই যে রানিবিবিকে এনেছিস সেও পাপ কাজ নয়। নবাবের সেবা কি পাপ? নবাব হল খোদা। আসলে খোদাতালার চেয়েও বড় হল নবাব। নবাবের সেবার জন্যে খুন করাকেও পাপ বলে না। দরকার হলে খুনও করতে হতে পারে। নবাব আলিবর্দি খাঁ যে সরফরাজ খাঁকে খুন করে মুর্শিদাবাদের নবাব হয়েছে, সেটা কি পাপ? বাদশা ঔরঙ্গজেব নিজের ভাইয়াকে খুন করেছে, সে কি পাপ? আসলে রাজার কামে পাপ নেই। তবে হ্যাঁ, আমাদের নিজের কামে পাপ আছে। আমার নিজের মামলার ফয়সালা করতে যদি আমি বিবিকে খুন করি, সেটা গুণাহ, লেকিন নবাবকে খুশি করবার জন্যে যদি আমার বিবিকে নবাবের হারেমে ভেজিয়ে দিই তো তাতে পাপ নেই। যত আদমি নবাবকে আওরাত জুগিয়েছে, সবাই বেহেস্তে যাবে। আমাদের দুনিয়ায় নবাব বাদশাই তো খোদাতালা রে ইয়ার। নবাব খুশ হলেই তো খোদাতালা খুশ হয়।
এসব কথা কান্ত অনেকবার শুনেছে বশিরের মুখ থেকে। শুনেছে, কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি। ছোটবেলা থেকে দিদিমার কাছে অন্য কথা শুনে এসেছে কান্ত। দিদিমা কান্তকে সৎ হতে শিখিয়েছিল, ধার্মিক হতে শিখিয়েছিল। দেবদ্বিজে ভক্তি করতে শিখিয়েছিল। দিদিমা শিখিয়েছিল–ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে সূর্যের দিকে মুখ করে তিনবার প্রণাম করতে। পরের জিনিসের ওপর লোভ করতে বারণ করেছিল। ব্রাহ্মণ দেখলেই প্রণাম করতে শিখিয়েছিল। নিচু জাতের লোকদেরও ঘেন্না করতে বারণ করেছিল। কিন্তু কোথায় গেল সেই দিদিমার শিক্ষা! কলকাতায় বেভারিজ সাহেবের গদিতে চাকরি করতে আসার পর থেকেই যেন সব জিনিস উলটেপালটে গেল। মুর্শিদাবাদে আসার পর থেকে তার আর কিছুই রইল না। এখানে সবই যেন উলটো। চুরি করলেও দোষ নেই যদি তা নবাবের জন্যে করা হয়। মিথ্যে কথা বললেও দোষ নেই যদি তা নবাবের জন্যে বলা হয়।
কান্ত জিজ্ঞেস করেছিল–তা হলে তোরা কার দলে? নবাবের দলে না মিরজাফর সাহেবের দলে?
বশির মিঞা বলেছিল যে যখন নবাব হবে আমরা তার দলে!
যদি এখনকার নবাবকে সরিয়ে মিরজাফর আলি সাহেব নবাব হয়, তখন?
বশির মিঞা মুচকে হেসে চুপি চুপি বলেছিল-আরে মিরজাফর আলি সাহেবই তো আখেরে নবাব হবে।
তার মানে?
বশির মিঞা এক মুহূর্তেই আবার গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। তারপর বলেছিল–তুই কাউকে বাতলাসনি। যদি খোদাতালার মর্জি হয় তো দেখবি মসনদ পালটে যাবে, মুর্শিদাবাদের সকল ভি পালটে যাবে। একবার যদি মিরজাফর সাহেব নবাব হয় তো তখন দেখবি আমিই তখন হব হুজুরনবিশ। আর তুই যদি ইমানদারিসে কাম করিস তো তোকেও আমি আমার সেরেস্তায় ভাল কাম দেব। আর তুই যদি চাস তোকে মিরতোজক করে দেব
মিরতোজক?
হ্যাঁ হ্যাঁ, মির তোজক। দরবার দেখাশোনা করবি, জৌলুস দেখাশোনা করবি। নবাবের কাছাকাছি থাকতে পারবি। মোটা ঘুষ আছে ও নোকরিতে
সত্যিই অনেক লোভ দেখিয়েছিল বশির মিঞা। তবু কান্তর মন টলেনি। সারাফত আলির দোকানে বসে বসে মনটা পড়ে থাকত চেহেল্-সুতুনের ভেতরে। কিছুই জিজ্ঞেস করা হয়নি। কী রকম করে দিন কাটছে, কী খেতে দিচ্ছে।
মোল্লাহাটির রাস্তাতেও কেবল সেই কথাই ভেবেছে সে। আবার কবে দেখা হবে কে জানে। সারাফত আলি আসবার দিন জিজ্ঞেস করেছিল–কী রে, কোথায় চলেছিস আবার? কোন বিবিকে আনতে?
কান্ত বলেছিল–বিবি নয় মিঞাসায়েব, এবার অন্য কাম—
দুত্তোর কাম! কাম তুই ছেড়ে দে!
কাম ছাড়লে আমি খাব কী?
কাম আমি দেব তোকে। তুই খালি চেহেল্-সুতুনে গিয়ে সব বরবাদ করে দে, আমি তোকে খিলাব। তোকে টাকা দিতে হবে না। মুফোত খিলাব। তোর অন্য কিছু কাম করতে হবে না
অদ্ভুত মানুষটা ওই সারাফত আলি! কত বছর ধরে ওই দোকান খুলে বসে আছে নিজের চোখে চেহে-সূতুনের ধ্বংস দেখবে বলে। রাত্রে নেশার ঘোরেও বোধহয় সারাফত আলি চেহেল্-সুতুনের ধ্বংসের স্বপ্ন দেখে।
রাস্তার একটা লোককে দেখে কান্ত জিজ্ঞেস করলো মশাই, মোল্লাহাটির রাস্তাটা কোনদিকে বলতে পারেন?
মোল্লাহাটি? আমিও তো মোল্লাহাটিতেই যাচ্ছি—
আজ্ঞে, আমি যাব মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকারের দোকানে।
তা আমি তো ওখানেই যাব। আজ রাতটা ওখানেই থাকব! মশাইয়ের নিবাস?
কান্ত বললে–চাকলা বর্ধমান, গ্রাম বড়চাতরা
মশাই কী কর্ম করেন?
কান্ত একটু চমকে উঠল, তার চাকরি তো বলবার মতন নয়। ভাল করে লোকটার দিকে চেয়ে দেখলে। বশির মিঞার যেমন যেমন বর্ণনা তার সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল, মুখে কাঁচা-পাকা গোঁফ-দাড়ি। বয়স ষাট-সত্তর। হাতে একটা পোঁটলা।
