মোল্লাহাটির মধুসূদন কর্মকারের দোকান এমনি একটা জায়গা। দোকানের লাগোয়া একটা বড় ঘর আছে। সেখানে মধুসূদন রাস্তার লোকদের থাকবার বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। লোকে একদিনদুদিন থাকে, রান্নাবান্না করে খায়, আর তারপর যে-যার কাজে চলে যায়। তার বদলে কিছু কড়ি দিতে হয় মধুসূদনকে। সেইটেই মধুসূদনের আয়।
বশির মিঞা সব বলে কয়ে ঠিক করে দিয়েছিল।
বশির বলেছিল–তোর কিছু ডর নেই, মধুসূদনের ওখানে গিয়ে তুই উঠবি–দোকান থেকে চাল ডাল ফুটিয়ে খাবি, যদি তোকে জিজ্ঞেস করে কোথায় যাবি তুই, তা হলে বলবি নিজামতের নোকরির চেষ্টা করতে মুর্শিদাবাদ যাচ্ছিস–ব্যস, চুকে গেল ল্যাঠা!
বশির মিঞা যেমন যেমন বলেছিল ঠিক তেমন তেমন করেছিল কান্ত। কোনও অসুবিধে হয়নি৷ মধুসূদন কর্মকার লোকটা ভাল। মধুসূদন বলেছিল–আমার দোকানে সব্বাই ওঠে আজ্ঞে, এখেনে তো থাকবার ব্যবস্থা নেই আর, আপনার যতদিন ইচ্ছে থাকুন
কান্ত মোল্লাহাটিতে এসে ওঠবার পর থেকেই চারদিকে নজর রাখছিল। বশির মিঞা বলে দিয়েছিল লোকটা বুড়ো মানুষ। কাঁচা-পাকা চুল মাথায়। ছাড়া ছাড়া দাড়ি আছে মুখে। হাতে একটা থলি আছে। সেই থলিটার ভেতরেই তার গামছা, খড়ম, চকমকি, সবকিছু থাকে। তারই ভেতরে একটা চিঠি আছে। সে-চিঠিটা হাতিয়াগড়ের রাজা লিখছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে। লোকটা এসে ওই মোল্লাহাটির মধুসূদনের দোকানে উঠবে। বিকেল নাগাদ আসবে আর ভোরবেলা উঠেই আবার হাঁটা দেবে। রাত্তিরের মধ্যেই সেই চিঠিটা হাতসাফাই করে এনে দিতে হবে।
সে-চিঠিতে কী লেখা আছে?
সে জেনে তোর কী ফায়দা? খতটা আনলেই তোর কাম হাসিল হয়ে যাবে—
এর পরে আর কিছু বলবার ছিল না। রানিবিবির সঙ্গে দেখা করার পরদিনই মুর্শিদাবাদ থেকে বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল। সারাফত আলি ভোরবেলাই ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল–কী রে কান্তবাবু, মুলাকাত হল রানিবিবির সঙ্গে?
কান্ত বলেছিল–হয়েছে মিঞাসাহেব
কাম হল?
হ্যাঁ মিঞাসাহেব।
তা হলে যা বলেছি তা করতে পারবি তো? নবাব সুজাউদ্দিন,নবাব সরফরাজ খাঁ’র হাড় গুড়ো করে দিতে পারবি তো? নবাব আলিবর্দির চেহেল্-সুতুন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে সেকবি তো? রানিবিবিকে রাজি করাতে পারবি তো?
কান্ত বললে–না মিঞাসাহেব, রানিবিবি পালাতে চাইছে না–
পালাতে তো চাইবেই না। নবাবি আরাম পেলে কেউ পালাতে চায়? পালালে চলবে না। তুই রোজ যাবি। রোজ রোজ গিয়ে হালচাল দেখবি। যত মোহর লাগবে খুদ আমি দেব। কাউকে পরোয়া করবি না। নজর মহম্মদরা মোহরের বান্দা, মোহর পেলেই ওরা জব্দ। আমি তোর হাতে আরক দেব, সেই। আরক খাইয়ে দিবি সকলকে
আরক? কান্ত বুঝতে পারেনি কথাটা।
সারাফত আলি বলেছিল–হা রে কান্তবাবু, আরক। আমার এ খুশবু তেল তো বাহারকা ভড়ং, আসলি চিজ তো আমার আরক।
এ আরক খেলে কী হয়?
এতে সাপকা জহর আছে, বিষ। এ জহর খেলে সব জিন্দগি বরবাদ হয়ে যায়। চেহেল-সুতুনে যিনি বেগম আছে সব কোইকো হাম আরক পিয়া। সব বেগমকো জিন্দগি বরবাদ কর দেঙ্গে। চেহেল সুতুন মিষ্টি মে গিরায়েঙ্গে। কাল ভি যাও চেহেল-সুতুন মেকাল ভি নজর মহম্মদকে মোহর দেঙ্গে
কান্ত অবাক হয়ে গিয়েছিল। শুধু কাল কেন, বরাবর যদি যেতে বলে মিঞাসাহেব তো বরাবরই যাবে।
পরের দিন সকালবেলা থেকেই আবার তৈরি হয়ে ছিল। নজর মহম্মদ পরের দিনও আসবে। সমস্ত রাতটা সমস্ত দিনটা সেই কথাটা ভেবে ভেবে কাটাবে ভেবেছিল। আবার সন্ধেবেলা হলেইনজর মহম্মদ তাকে ভেতরে নিয়ে যাবে। ভেবেছিল এবার গিয়ে অন্য কথা জিজ্ঞেস করবে। জিজ্ঞেস করবে–আপনি বলুন আপনি কে? আমার সন্দেহ হচ্ছে আপনি রানিবিবি নন, আপনি উদ্ধব দাসের স্ত্রী মরালী
সমস্ত দিনটা কান্তর কেমন কল্পনা করতে ভাল লাগল যে, রানিবিবি ঠিক আসল রানিবিবি নয়। রানিবিবি আসলে মরালী। অথচ মরালী হলেই বা তার লাভটা কী তাও ভেবে পেলে না। বারবার গিয়ে সারাফত আলিকে জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা মিঞাসাহেব, নজর মহম্মদ এসেছিল আজ?
প্রত্যেকবারই সারাফত আলি বলেছিল–নেহি আয়া
কান্তর মনে কেমন যেন ভয় হয়েছিল। যদি নজর মহম্মদ না আসে আজ?
চকবাজারের সামনের রাস্তায় গিয়েও দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। রাস্তায় ভিড়, সেই ভিড়ের মধ্যেই উট চলেছে, নবাবের হাতি চলেছে, কোতোয়াল, সেপাই, তাঞ্জাম চলেছে। কাছারি থেকে দলে দলে লোক চলেছে। কিন্তু কোথাও নজর মহম্মদের দেখা নেই। হঠাৎ দেখলে বশির মিঞা আসছে।
বশির মিঞাকে দেখেই কান্ত ভয় পেয়ে গিয়েছে। আবার যদি কোনও কাজে পাঠায়? সত্যিই যা ভয় করেছিল তাই-ই সত্যি হল। বশির মিঞা বললে–তোকেই খুঁজতে এসেছিলুম তোকে এক জায়গায় যেতে হবে
কোথায়? কখন?
এখনই গেলে ভাল হয়। মোল্লাহাটিতে।
কান্ত বললে–মোল্লাহাটি কোথায়?
সে তোকে আমি সব সমঝিয়ে দেব। মোল্লাহাটিতে মধুসূদন কর্মকারের দুকান আছে। সেখানে গিয়ে তোকে উঠতে হবে। সেখানে একটা বুড়ো এসে উঠবে, সে যাবে কিষ্টোনগরে। মহারাজ কিষ্টেচন্দরের কাছারির সেরেস্তার লোক সে। তার সঙ্গে ভাব জমিয়ে একঠো কাম হাসিল করতে হবে!
কী কাজ?
সব বলব তোকে। কোনও ডর নেই। তার কাছে একটা খত আছে। হাতিয়াগড়ের রাজার লেখা খত, সেই খতটা হাতসাফাই করে নিয়ে আসতে হবে!
সে চিঠিতে কী লেখা আছে?
তাই তো দেখতে হবে। মনসুর আলি সাহেব জরুরি হুকুম দিয়েছে সেই খতটা এনে দিতে হবে মেহেদি নেসার সাহেব কলকাতা থেকে ফিরে এলেই পেশ করতে হবে তার বরাবর।
