তারপর? কপিল পায়রাপোড়ার আর্তনাদ শুনে সদানন্দ ছুটে গিয়েছিল কিন্তু তার কথায় তার প্রতিবাদে কেউই কান দিলে না, শুনতে চাইলে না কেউ অপরিণত বালকের কথা, টেনে বের করে নিয়ে এল তাকে ঘর থেকে। কপিল পায়রাপোড়া শুধু মারই খেলে না, তার তিন বিঘের সামান্য জমিটুকুও গেল। জমিদারের নির্দয় ক্রোধ তাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে ছাড়লে। একপাল ছেলেপুলে নিয়ে অসহায় মানুষটা অনন্যোপায় হয়ে শেষমেশ গলায় দড়ি দিয়ে মরল। সে দৃশ্য দু’দিন পরেই সবাই ভুলে গেল। এসব নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা এমনই গা-সওয়া হয়ে গেছে মানুষের যে, এসব ঘটনা কেউই আর মনে রাখলো না।
কিন্তু সদানন্দ বলে, “দেখ প্রকাশ মামা, আজকাল সবাই তার কথা ভুলে গেছে। …….ওই বারোয়ারীতলায় যখন সে আত্মঘাতী হল সবাই তা দেখেছে, দেখে শিউরে উঠেছে, কিন্তু আজকে কারো সে কথা মনে নেই……..”
শুনে প্রকাশ মামা হো হো করে হেসে উঠেছে, বলেছে, “তুই তো দেখছি একটা আস্ত পাগল। অত কথা মনে রাখতে গেলে মানুষের চলে! তুই তো আমায় অবাক করলি সদা।”
সদা বলে, “কিন্তু মামা আমি কেন কিছুই ভুলতে পারি নে? আমার কেন সব মনে পড়ে যায়?”
না–সদানন্দর শুধু মনেই পড়ে না, তার তীব্র বোধের কাছে, তীক্ষ্ণ অবহিতির কাছে চৌধুরীবংশের পাপের ইতিহাস সন্ধ্যার ধূসর ছায়ার মধ্যে পুকুরের জল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। তারা তাকে চৌধুরীবংশের পাপের ইতিহাস শোনায়।
কপিল পায়রাপোড়ার এই প্রাসঙ্গিক কথার মধ্যে আমার উপরিউক্ত তিনটি স্তর পর পর এইভাবে সাজানো–(১) চারটে পয়সাও চুরি করতে ছাড়ে না এমনই হীন এই জমিদার সেরেস্তার মানুষ (২) কত তুচ্ছ জিনিস নিয়ে জমিদারের ক্রোধ চরম হয়ে ওঠে (৩) তার ফলে একটি শিশুর সামনে এই জগৎ ও জীবনের ওপরকার পলেসতারাটা কী ভাবে ভেঙে যায়, কী ভাবে ভেতরের বীভৎস চেহারাটা বেরিয়ে আসে। বিমল মিত্র কোন ঘটনা অকারণে তো বলেননি না অধিকন্তু তিনটে ডায়মেনশন না থাকলে তার অবতারণাও করেন না। তার লক্ষ্য সব সময় সেই ঘটনার দিকে যার মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয় বাঙালী মানসের যন্ত্রণা, তার নৈতিক সংকট। অন্ধকারটা যত তীব্র হয়ে ওঠে আলোর জন্যে আকূতি ততই ঐকান্তিক হয়। অতএব তার উদ্ভাবিত ঘটনার মধ্যে একটা আলোর আভাসও শেষ-মেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সদানন্দর এলেবেলে মনোভাব ও ছন্নছাড়া আচার আচরণকে চিরাচরিত পথে সুস্থ করে। তোলার জন্যে প্রকাশ মামা একদিকে তার বিয়ের জন্যে সদানন্দর বাপ-মাকে সুপারিশ করে আর একদিকে তাকে লায়েক করে তোলার জন্যে যাত্রা, কবিগান, ঢপ শোনাতে নিয়ে যায়, নিয়ে যায় বাজারে-মেয়ে মানুষের বাড়িতে। যার হাতে একদিন আট দশ লাখ টাকার। সম্পত্তি আসবে তাকে সেই টাকার সুখভোগ করতে হবে তো! আর তখন তার হাতেও কোন্ দু’এক লাখ টাকা না আসবে! পৃথিবীর সব দালালরাই এই রকম এক এক জন প্রকাশ। মামা।
সদানন্দর অন্তরদৃষ্টি প্রকাশ মামাকে চিনতে ভুল করে না,–প্রকাশ মামাও একজন মানুষ। সদানন্দ ভাবে, কেউ প্রকাশ মামাকে মানুষ ছাড়া জানোয়ার বলবে না। মানুষের মতন দুটো হাত, পা, চোখ, কান। মানুষেরই মতন মুখের ভাষা। সংসারে ওরকম লোককে সবাই মানুষ বলেই জানে। অথচ প্রকাশ মামা কি সত্যিই মানুষ!
সত্যিকারের মানুষ তার দাদু নরনারায়ণ চৌধুরীও না। এবং তার বাপও না। নরনারায়ণ চৌধুরী পনেরো টাকা মাইনের নায়েব ছিলেন কালীগঞ্জের জমিদার হর্ষনাথ চক্রবর্তীর। হর্ষনাথ চক্রবর্তীর শেষ জীবনে চৈতন্যোদয় হয়েছিল, তিনি সজ্ঞানে গঙ্গাজলে দেহত্যাগ। করলেন এবং নরনারায়ণের সৌভাগ্য কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর ওয়ারিশানদেরও মৃত্যু ঘটল। রইল শুধু হর্ষনাথের বিধবা, কালীগঞ্জের বউ। সেই বিধবার সর্বস্ব তিলে তিলে গ্রাস করে নায়েব নরনারায়ণ চৌধুরী হলেন কালীগঞ্জ আর নবাবগঞ্জ–এই দুই বিশাল ভূমির একচ্ছত্র জমিদার। শেষ বয়েসে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন নরনারায়ণ চৌধুরী, তবু টাকার সিন্দুকটা–চুনী পান্না হীরে জহরতে বোঝাই সিন্দুকটা আগলে বসেছিলেন তিনি। এবার তিনি একমাত্র বংশধর নাতি শ্রীমান সদানন্দকে বিয়ে দিয়ে তার ঘাড়ে এই বিশাল জমিদারী আর এই মস্ত সিন্দুকটা সঁপে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত; কিন্তু এদিকে যে পাপের বীজটি বিশাল এক মহীরূহ হয়ে উঠেছে তিনি তা গ্রাহ্যই করতে চান নি। কিন্তু সদানন্দ ছাড়লে না। সে যখন জানলে দশ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে কালীগঞ্জের বউ দাদুর বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিয়েছে, সে দাদুকে চেপে ধরলে,তোমার সিন্দুক বোঝাই টাকা, কেন তুমি তবে বিধবা বুড়ো মানুষটাকে ঘোরাচ্ছ, টাকাটা দিয়ে দাও।
দাদুর যুক্তি–দাও বললেই দেওয়া যায়? আমি কি দেব না বলেছি, দেব, ঠিক দিয়ে দেব। তুই বিয়ে করে আয়…
যার কাছে হিসেবই ধর্ম হিসেবই মোক্ষ, যার কাছে স্বর্গ বলতেও টাকা সে কখনো সহজে টাকা ছাড়ে! অথচ সেই টাকাই মুঠো মুঠো খাওয়াতে হল পুলিসের দারোগাকে। একটা খুন চাপা দিতে আরও পাঁচটা খুন করতে হল। কেননা অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক স্বার্থ ক্রমাগত মানুষকে এক নিদারুণ ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে নিজের ওপর কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলছে মানুষ। যত সে অসহায় বোধ করছে ততই সে পাপীর গোষ্ঠী বাড়াচ্ছে, সেই দলের পুষ্টিবিধান করছে। একদিকে এভাবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বলবান হচ্ছে আর একদিকে অসহায় মানুষ তারই শিকার হয়ে হয় আত্মবিসর্জন দিচ্ছে নয় তো তাদের দালাল হয়ে দল ভারী করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে positive good man ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, সরে যচ্ছে negation-এর দিকে, বৈরাগ্যের দিকে। শুভ রাত্রির মধুর ক্ষণটিতেই তাই একটি নিষ্পাপ নববধূর জীবনে নেমে এল অন্ধকার।
