বৈকালে নন্দবাবুই একজন ডাক্তার সঙ্গে করিয়া আনিল। ডাক্তার দেখিয়া শুনিয়া বলিল— ঠাণ্ডা লেগে হয়েচে, ব্রাঙ্কো-নিমোনিয়া-ভালো নার্সিং চাই,–নিচের ঘরে কি এমনি করে। থাকে!… খোকা, তুমি একটা শিশি নিয়ে এসো আমায় ডাক্তারখানায়, ওষুধ দেবো–
অপু কয়দিন গিয়া দশাশ্বমেধ ঘাটের উপর ডাক্তারের ডিসপেন্সারি হইতে ঔষধ আনিল।
বিশেষ কোনো ফল দেখা গেল না। দিন দিন হরিহর দুর্বল হইয়া পড়িতে লাগিল। এদিকে টাকা যে কয়টি ছিল-ভিজিটে ও পথ্যে খরচ হইয়া গেল। ডাক্তার বলিল, অন্তত এক সেরা করিয়া দুধ ও অন্যান্য ফল না খাইতে দিলে রোগী দুর্বল হইয়া পড়িবে। সাড়ে তিন টাকা দামের একটা বিলাতী পথ্যের ব্যবস্থাও দিয়া গেল। বিদেশী-বিভূই জায়গা। একবার দেখিয়া সাহস দেয় এমন লোক নাই, সর্বজয়া চারিদিক অন্ধকার দেখিল।
এই বিপদের মধ্যে সর্বজয়া আবার এক নূতন বিপদে পড়ল। উপরের ছাদে দাঁড়াইয়া ঝুঁকিয়া দেখিলে রাঁধিবার ঘর দেখা যায়। ইতিপূর্বেও সে মাঝে মাঝে নন্দবাবুকে ছাদ হইতে তার রান্নাঘরের দিকে উঁকিঝুঁকি মারিতে দেখিয়াছে, সম্প্রতি হরিহরের অসুখ হইবার পর হইতে নন্দবাবু বড় বাড়াইয়া তুলিল। নানা অছিলায় সে দিনে দশবার ঘরের মধ্যে আসে-আগে আগে অপুকে আড়াল করিয়া জিজ্ঞাসা করিত-আজকাল সরাসরিই তাহাকে সম্বোধন করিয়া কথাবার্তা বলে। প্রথমটা সর্বজয়া কিছু মনে করে নাই-বরং বিপদের সময়ে এই অনাত্মীয় লোকটি যথেষ্ট সাহায্য ও দেখাশুনা করিতেছে ভাবিয়া মনে মনে কৃতজ্ঞই ছিল, কিন্তু ক্ৰমেই যেন তাহার মনে হইতে লাগিল যে, এই যে বাড়াবাড়ি-ইহা কোথায যেন বেখাপ ঠেকিতেছে। নন্দবাবু নিজে পান কিনিয়া আনিয়া সম্মুখে রাখিয়া বলে–চাকরদের হাতে পান সাজা–জীবনটা গেল বৌঠাকুরন—সাজুন দিকি একবার–তাহাতেও সর্বজয়া দোষ ধরে নাই, বরং এই প্রবাসী আত্মীয়স্নেহবঞ্চিত লোকটির উপর মনে মনে একটু করুণাই হইত-কিন্তু ঘনিষ্ঠতা ক্ৰমে শোভনতার সীমা ডিঙাইতে চলিল। আজকাল পান আনিয়া বলে-রাখো দিকি বৌঠাকরুন। হাত হইতে সর্বজয়া লইবে-এইরূপই যেন চায়। অপু তো পাগল-অধিকাংশ সময়ই বাটীতে তাহাকে খুঁজিয়া মেলে না-ওঘরে হরিহর অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়া থাকে-আর ঠিক সেই সময়টিতেই নন্দবাবু ঘরে আসিবে রোগী দেখিতে!..ছলছুতায় একথাওকথায় আধঘণ্টা না কাটাইয়া সে ঘর হইতে যায় না। বলে—কোনো ভয় নেই বৌঠাকরুন-আমি আছি ওপরে-অপূর্ব থাকে না থাকে-ওই সিঁড়িটার ওপর গিয়ে ডেকো না! বিপদের সময় অত বাছতে গেলে…একটু চুন দাও তো! বোঁটা নেই? আহা আঙুলের মাথাতে করেই একটু দাও না অমনি–
হরিহরের জ্ঞান হইলেই ছেলের জন্য অস্থির হইযা উঠে। এদিকে ওদিকে চাহিয়া ক্ষীণসুরে বলে–খোকা কই! খোকা কই!…সৰ্বজয়া বলে-আসচে, তাই কি হতচ্ছাড়া ছেলে একটু কাছে বসবে…বেরিযেচে বুঝি সেই ঘাটে। ছেলে বাড়ি এলে বলে-বসতে পারিসনে একটু কাছে। খোকা খোকা করে পাগল-খোকার তো ভেবে ঘুম নেই—যা বসগে, যা, গায়ে মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে নেই বুঝি? ছেলে হয়ে স্বগগে ঘণ্টা দেবেন কি না?
অপু অপ্রতিভ মুখে বাবার শিয়রের পাশে বসে। কিন্তু খানিক বসিয়াই মনে ভাবে—ওঃ। কতক্ষণ বসে থাকবো।–বেশ তো? আমার বুঝি একটু বেড়াতে কি খেলা করতে নেই। কনকনে ঠাণ্ডায় পা অবশ হইয়া আসে। তাহার মন ছটফট করে-একদৌড়ে একেবারে সেই দশাশ্বমেধ ঘাট। জলের রানা, নির্মল মুক্ত হাওয়া, সুরেশ নবনারীর ভিড়। পটু, সুবীর…গুলু-পটল-পল্টুর দাদা। রামনগরের রাজার সেই ময়ুরপঙ্খীটায় আজ আবার বাচ, বেলা চারটার সময়! উসখুসি করিতে করিতে চক্ষুলজ্জায় সন্ধ্যা করিয়া ফেলে, মায়ের ভয়ে যাইতে সাহস পায় না।
সকালে সর্বজয়া একদিন ছেলেকে বলিল-হ্যারে, ওই সাদা বাড়িটার পাশে কোন ছত্তর জানিস?
–উঁহু–
–তুই ছত্তরে খাসনি একদিনও এখানে এসে? কাশীতে এসে ছত্তরে খেতে হয় কিন্তু, জানিসনে বুঝি! খেয়ে আসিস না আজ?…দেখেই আসিস না?
–কাশীতে এসে ছত্তরে খেতে হয় কেন?
—খেলে পুণ্য হয়—আজ দশাশ্বমেধ ঘাটে নেয়ে অমনি ছত্তর থেকে খেয়ে আসিস বুঝলি। বেলা বারোটার সময় সত্ৰ হইতে খাইয়া অপু বাড়ি ফিরিল। তাহার মা বান্নাঘবেব বাবান্দায বসিয়া বাটিতে কি লইয়া খাইতেছিল–তাহাকে দেখিয়া প্রথমটা লুকাইবার চেষ্টা করিলা বটে কিন্তু অপু অত্যন্ত কাছে আসিয়া পড়িয়াছে-লুকাইতে গেলে সন্দেহ জাগানো হয়। ভাবিয়া সহজ সুরে বলিবার চেষ্টা করিল-খেয়ে এলি? কেন খাওয়ালে রে?
মা অড়হরের ডাল-ভিজা খাইতেছে।
—ভালো না-কুমড়োর একটা ছাই ঘণ্ট-বসে বসে হয়রান—বড্ড ময়লা কাপড়-পরা লোক সব খেতে যায়-আমি আর যাচ্ছি নে, পুণ্যতে আমার দরকার নেই-ওকি খাচ্ছ মা? তোমার বের্তো নাকি? রান্না হয় নি?
–আজি তো আমার কুলুইচণ্ডী—এই দুটো অড়লের ডাল ভিজে-বেশ খেতে লাগে-আমি বড় ভালোবাসি… খাবি দুটো ওবেলা?
রাত্ৰিতেও রান্না হইল না। তাহার মা বলিল-আড়ালের ডাল ভিজে খেয়ে দ্যাখা দিকি? বেশ লাগবে এখন-এবেলা রাঁধলাম না, ভারি তো খাস, এত কটা ভাতে বসিস বই তো নয়- ওই খেয়ে কি আর খেতে পারবি?
পরদিন দুপুরে নন্দবাবু একতাড়া পান অপুর হাতে দিয়া বলিল-তোমার মার কাছ থেকে সেজে নিয়ে এসো তো? রোগীর ঘরের পাশের ঘরে সর্বজয়া বসিয়া পান সাজিতেছে। নন্দবাবু জুতার শব্দ করিতে করিতে উপর হইতে নামিয়া রোগীর ঘরে ঢুকিল এবং অতি অল্পক্ষণ পরেই সেখান হইতে বাহির হইয়া সর্বজয়া যে-ঘরে পান সাজিতেছে সেখানে ঢুকিল। সারারাত্রি জাগিয়া কাটাইয়া সর্বজয়ার ঝিামানি ধরিয়াছিল, জুতার শব্দে চমক ভাঙিলে একেবারে সম্মুখে নন্দবাবুকে দেখিয়া সে জড়সড় হইয়া ঘোমটা টানিয়া দিল। নন্দবাবু বলিল-পান সাজা হয়েচে বৌঠাকরুন? সর্বজয়া নীরবে সাজা পানের খিলিগুলি রেকরিতে করিয়া সামনে দিকে ঠেলিয়া দিতে নন্দবাবু এক খিলি তুলিয়া মুখের মধ্যে পুরিয়া বলিল-চুন বড় কম হয় বৌঠাকরুন তোমার পানে, সরো দেখি আমি নিচ্চি–
