সে তো ঘরের অন্য কোনো জিনিসে হাত দেয় না, তবে তাহাকে বকিবার কারণ কি? সেই হইতে সে ভয়ে ভয়ে রই লইয়া থাকে।
নন্দবাবু সন্ধ্যার সময় টেরি কাটিয়া ভালো জামা কাপড় পরিয়া শিশি হইতে কি গন্ধ মাখিয়া রোজ বেড়াইতে যায়। অপুর গায়ে একদিন একটু শিশি হইতে ছড়াইয়া দিয়াছিল, বেশ ভুরিভুরে গন্ধটা।
সন্ধ্যার পরও সে আগে আগে নন্দবাবুর ঘরে পড়িতে যাইত। কিন্তু সন্ধ্যার পরে নন্দবাবু আলমারি হইতে একটা বোতল লইয়া লাল-মতো একটা ঔষধ খায়। সে সময়ে সে একদিন ঘরে গিয়া পড়িলে তাহাকে ভারী বকিয়াছিল। নন্দবাবুদের ঘরে উঠিবার সিঁড়ি অন্যদিকে-আর একদিন রাত্রে হঠাৎ ওপরের ঘরে গিয়া সে দেখিয়াছিল একটি কে স্ত্রীলোক ঘরের মধ্যে বসিয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া নন্দবাবু বলিয়াছিল–এখন যাও অপূর্ব, ইনি আমার শালী-দেখতে এসেচেন, এখুনি চলে যাবেন। ফিরিয়া আসিতে আসিতে সে শুনিয়াছিল নন্দবাবু বলিতেছে-ও আমাদের নিচের ভাড়াটের ছেলে–কিছু বোঝে-সোঝে না।
নন্দবাবু তাহকে প্রায়ই তাহার মার কথা জিজ্ঞাসা করে। বলে-তোমার মাকে বলে পান নিয়ে এসো দিকি? আমার চাকরিটা পান সাজতে জানে না–
অপু মায়ের কাছে আবদার করিয়া ওপরে প্রায়ই পান আনে। নন্দবাবু মাঝে মাঝে বলে– তোমার মা আমার কথা কিছু বলেন-টলেন নাকি-না?–
অপু বাড়ি আসিয়া মাকে বলে–নন্দবাবু বেশ লোক মা–তোমার কথা রোজ জিজ্ঞেস করে–
–আমার কথা? আমার কথা কি জিজ্ঞেস করে—
–বলছিল তোমার মাকে বোলো, আমি তার কথা জিজ্ঞেস করি-টরি–বেশ লোক—
–করুক গে—তুই পাঁজি ছেলে অত ওপরের ঘরে যাস-টাস কেন? বিকেলে ওপরে বসে বুসে কি কবিস?
হরিহরের জ্বরটা একটু কমিল। অপু স্কুল হইতে আসিয়া বই নামাইয়া রাখিতেছে। পায়ের শব্দ পাইয়া হরিহর বলিল-খোকা এসো, একটু বসো বাবা–
অপু বসিয়া বসিয়া স্কুলের গল্প করিতে লাগিল। হাসিমুখে নিচু সুরে বলিল-এই দুমাস তো স্কুলে গিাঁইচি, এরই মধ্যে বাবা, স্কুলের সবাই খুব ভালোবাসে, রোজ রোজ ফাস্ট বসি-স্কুলে আমাদের ক্লাসে একখানা কাগজ ছাপিয়ে বাব করবে এক মাস অন্তর। আমাকে সেই দলে নিয়ে চে–তোমায় দেখাবো বাবা বেবুলে–
হরিহরের বুকের ভিতরটা মমতায় বেদনায় কেমন করে। অপু একখানা কাগজ বাহির করিয়া বলে–একটা লেখা লিখেচি-কাগজখানা ছাপাবে বলেচে, আমার নামে-কিন্তু যারা দুটাকা করে চাঁদা দেবে শুধু তাদেরই লেখা ছাপবে বলেচে-দুটাকা দেবে বাবা?
হরিহর অধীর আগ্রহে ছেলের হাত হইতে কাগজখানা লইয়া পড়িতে শুরু করে। ছেলে যে লেখে, সে খবর সে জানিত না। রাজপুত্রের মৃগয়ার গল্প সুন্দর বানানো, হরিহর খুশি হইয়া বালিশে ভরা দিয়া উঠিয়া বসে, বলে-তুই লিখিচিস খোকা?
-আমি তো আরও কত লিখিচি বাবা, ভূতের গল্প, রাজকন্যের-বাড়ি থাকতে রানুদির খাতায় লিখে লিখে দিতাম তো–
সর্বজয়া টাকার নাম শুনিয়া দিতে চাহে না। স্বামী অসুখে পড়িয়া এ অবস্থায় যাহা আছে তাহা সংসারের খরচেই কুলাইবে না, দরকার নাই ছাপানো কাগজে। হরিহর বুঝাইয়া বলিয়া টাকা দেওয়ায়, বলে–দাও গিয়ে, আহা খোকার লেখাটা ছাপিয়ে আসুক, সেরে উঠে পথ্যি করলেই ঠাকুর-বাড়ির ভাগবত পাঠটা তো ঠিকই রয়েচে-ওতেও তো গোটা দশেক টাকা পাবো–
দিন দুই পরে অপু নিরাশ মুখে রাঙা ঠোঁট ফুলাইয়া বাবার কাছে চুপি চুপি আসিয়া বলে–হলো না বাবা। ছাপাখানাওয়ালার লোকেরা বেশি দাম চেয়েচে, তাই আজ স্কুলে বলে দিয়েচে, চার টাকা করে চাঁদা চাই–
ছেলের মুখের নিরাশার ভাব হরিহরের বুকে খচ্ করিয়া বিঁধে। খানিকক্ষণ অন্য কথার পর সে বলে-দ্যাখ দিকি খোকা তোর মা কোথায় গেল।…বালিশের তলা হইতে চাবির থোলো বাহির করিয়া দিয়া বলে-চুপি চুপি ওই কাঠের ছাপ বাক্স, যেটাতে আমার কঞ্চির কলমের বান্ডিল আছে, ওইটে খোল তো?…কোণে দাখা তো কটাকা আছে? তাহার পর হরিহর সন্তৰ্পণে বাক্সখোলা-নিরত পুত্রের দিকে মমতার চোখে চাহিয়া থাকে। অবোধ, অবোধ, নিতান্ত অবোধ!.ওর সুন্দর, শূদ্র চাঁদের মতো ললাটটি ওর মায়ের ললাট, চোখ দুটি ওর মায়ের চোখ। যখন হরিহর প্রথম যৌবনে বিবাহ করিয়া স্ত্রীকে ঘরে আনে, নববধূ সর্বজয়ার অবিকল সেই মুখের হাসি এগারো বছরের অপুর অনাবিল, নবীন মুখে।
অকারণে হরিহরের বুকের মধ্যে স্নেহসমুদ্র উদ্বেল উত্তাল হইয়া উঠিয়া চোখে জল ভরিয়া আনে।
অপু যেন প্রথম বসন্তের নবকিশলয়, তাহার মুখের আনন্দ যেন প্ৰভাতের নব-অরুণ আভা, তার ডাগর ডাগর নীলাভ চোখ দুটির চাহনির মধ্যে নিজের অতীত যৌবনদিনের সে অসীম স্বপ্ন, সুনীল পাহাড়ের নবীন শালতারুশ্রেণীর উল্লাস-মর্মর.কুলহারা সমুদ্রের দূরাগত সংগীতধ্বনি।
অপু চুপি চুপি বাবাকে দেখাইয়া বলে—চারটে টাকা আছে বাবা!—হরিহরি সময় অসময়ের জন্য টাকা কয়টি রাখিয়া দিয়াছে নিজের বাক্সে লুকাইয়া, স্ত্রী জানে না, কাজেই সে নিশ্চিন্তমনে বলিতে পারিল–নিয়ে যা খোকা, চাঁদা দিয়ে দিস, কিন্তু তোর মাকে যেন বলিসনে।
অপু খুশির সুরে বলে-ছাপা বেবুলে তোমায় দেখাবো বাবা, আমার নামে ছাপিয়ে দেবে বলেচে—এই সোমবারের পরের সোমবারে বেরুবে—
পরদিন সকাল হইতে হরিহরের অসুখ আবার বাড়িল।
সর্বজয়া ভয় পাইয়া ছেলেকে বলিল-নন্দবাবুকে বলগে যা তো—একবার এসে দেখে যান–
নন্দবাবু দেখিয়া বলিল-একজন ডাক্তার ডাকতে হবে অপূর্ব, তোমার মাকে বলো।
