তাহার স্ত্রী বলিলেন-ঘর সারাবে কি, খাবার নেই ঘরে, নৈলে কি এরকম আতাস্তরে ফেলে কেউ বিদেশে যায়? আহা, রোগা মেয়েটা কাল সারাৱাত ভিজোচে–একটু জল গরম করতে দাওওই জানালাটা খুলে দাও তো ফণি?
একটু বেলায় নবাবগঞ্জ হইতে শরৎ ডাক্তার আসিলেন-দেখিয়া শুনিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করিলেন। বলিয়া গেলেন যে বিশেষ ভয়ের কোনো কারণ নাই, জ্বর বেশি হইয়াছে, মাথায় জলপটি নিয়মিতভাবে দেওয়ার বন্দোবস্ত করিলেন। হরিহর কোথায় আছে জানা নাই-তবুও তাহার পূর্ব ঠিকানায় তাহাকে একখানি পত্র দেওয়া হইল।
পরদিন ঝড় বৃষ্টি থামিয়া গেল—আকাশের মেঘ কাটিতে শুরু করিল। নীলমণি মুখুজ্যে দু’বেলা নিয়মিত দেখাশোনা করিতে লাগিলেন। ঝড় বৃষ্টি থামিবার পরদিন হইতেই দুর্গার জ্বর আবার বড় বাড়িল। শরৎ ডাক্তার সুবিধা বুঝিলেন না। হরিহরকে আর একখানা পত্র দেওয়া হইল।
অপু তাহার দিদির মাথার কাছে বসিয়া জলপটি দিতেছিল। দিদিকে দু-একবার ডাকিল-ও দিদি শুনছিস, কেমন আছিস, ও দিদি? দুৰ্গার কেমন আচ্ছন্ন ভাব। ঠোঁট নড়িতেছে–কি যেন আপন মনে বলিতেছে, ঘোর ঘোর। অপু কানের কাছে মুখ লইয়া গিয়া দু-একবার চেষ্টা করিয়াও কিছু বুঝিতে পারিল না।
বৈকালের দিকে জ্বর ছাড়িয়া গেল। দুর্গা আবার চোখ মেলিয়া চাহিতে পারিল এতক্ষণ পরে। ভারি দুর্বল হইয়া পড়িয়াচে, চিটি করিয়া কথা বলিতেছে, ভালো করিয়া না শুনিলে বোঝা যায় না কি বলিতেছে।
মা গৃহকার্যে উঠিয়া গেলে অপু দিদির কাছে বসিয়া রহিল। দুর্গা চোখ তুলিয়া তাহার দিকে চাহিয়া বলিল-বেলা কত রে?
অপু বলিল।–বেলা এখনও অনেক আছে–রাদ্দুর উঠেচে আজ দেখিচিসি দিদি? এখনও আমাদের নারকেল গাছের মাথায় রোদ্দুর রয়েচে–
খানিকক্ষণ দুজনেই কোনো কথা বলিল না। অনেকদিন পরে রৌদ্র ওঠাতে অপুর ভরি আহ্রদ হইয়াছে। সে জানালার বাহিরে রৌদ্রালোকিত গাছটার মাথায় চাহিয়া রহিল।
খানিকটা পরে দুর্গা বলিল-শোন অপু-একটা কথা শোন-
-কি রে দিদি? পরে সে দিদির মুখের আরও কাছে মুখ লইয়া গেল।
-আমায় একদিন তুই রেলগাড়ি দেখাবি?
–দেখাবো এখন-তুই সেরে উঠলে বাবাকে বলে আমরা সব একদিন গঙ্গা নাইতে যাবো রেলগাড়ি করে—
সারা দিন রাত্রি কাটিয়া গেল। ঝড় বৃষ্টি কোনও কালে হইয়াছিল মনে হয় না। চারিধারে দারুণ শরতের রৌদ্র।
সকাল দশটার সময় নীলমণি মুখুজ্যে অনেকদিন পরে নদীতে স্নান করিতে যাইবেন বলিয়া তেল মাখিতে বসিয়াছেন, তাহার স্ত্রীর উত্তেজিত সুর তার কানে গোল-ওগো, এসো তো একবার এদিকে শিগগির-অপুদের বাড়ির দিক থেকে যেন একটা কান্নার গলা পাওয়া যাচ্চে
ব্যাপার কি দেখিতে সকলে দুটিয়া গেলেন।
সর্বজয়া মেয়ের মুখের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া বলিতেছে-ও দুগগা চা দিকি-ওমা, ভালো করে চা দিকি-ও দুগগা—
নীলমণি মুখুজ্যে ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন–কি হয়েচে-সরো সব, সরো দিকি-আহা কি সব বাতাসটা বন্ধ করে দাড়াও?
সর্বজয়া ভাসুর-সম্পর্কের প্রবীণ প্রতিবেশীর ঘরের মধ্যে উপস্থিতি ভুলিয়া গিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল-ওগো, কি হল, মেয়ে আমন করচে কেন?
দুৰ্গা আর চাহিল না।
আকাশের নীল আস্তরণ ভেদ করিয়া মাঝে মাঝে অনন্তের হাতছানি আসে-পৃথিবীর বুক থেকে ছেলেমেয়েরা চঞ্চল হইয়া ছুটিয়া গিয়া অনস্ত নীলিমার মধ্যে ড়ুবিয়া নিজেদের হারাইয়া ফেলে–পরিচিত ও গতানুগতিক পথের বহুদূরপারে কোন পথহীন পথে-দুৰ্গার অশান্ত, চঞ্চল প্রাণের বেলায় জীবনের সেই সৰ্বাপেক্ষা বড় অজানার ডাক আসিয়া পৌঁছিয়াছে!
তখন আবার শরৎ ডাক্তারকে ডাকা হইল-বলিলেন—ম্যালেরিয়ার শেষ স্টেজটা আর কি-খুব জুরের পর যেন বিরাম হয়েচে আর আমনি হার্টফেল করে–ঠিক এরকম একটা case হয়ে গেল সেদিন দশঘরায়–
আধঘণ্টার মধ্যে পাড়ার লোকে উঠান ভাঙিয়া পড়িল।
২৬. হরিহর বাড়ির চিঠি পায় নাই
হরিহর বাড়ির চিঠি পায় নাই।
এবার বাড়ি হইতে বাহির হইয়া হরিহর রায় প্রথমে গোয়াড়ী কৃষ্ণনগর যায়। কাহারও সঙ্গে তথায় পরিচয় ছিল না। শহর-বাজার জায়গা, একটা না একটা কিছু উপায় হইবে এই কুহকে পড়িয়াই সে সেখানে গিয়াছিল। গোয়াড়ীতে কিছুদিন থাকিবার পর সে সন্ধান পাইল যে, শহরে উকিল কি জমিদারের বাড়িতে দৈনিক বা মাসিক চুক্তি হিসারে চণ্ডীপাঠ করার কার্য প্রায়ই জুটিয়া যায়। আশায় আশায় দিন পনেরো কাটাইয়া বাড়ি হইতে পথখরচ বলিয়া যৎসামান্য যাহা কিছু আনিয়াছিল ফুরাইয়া ফেলিল, অথচ কোথাও কিছু সুবিধা হয় না।
সে পড়িল মহাবিপদে-অপরিচিত স্থান, কেহ একটি পয়সা দিয়া সাহায্য করে এমন নাইখোড়ে বাজারের যে হোটেলটিতে ছিল পয়সা ফুরাইয়া গেলে সেখান হইতে বাহির হইতে হইল। একজনের নিকট শুনিল স্থানীয় হরিসভায় নবাগত অভাবগ্ৰস্ত ব্ৰাহ্মণ পথিককে বিনামূল্যে থাকিতে ও খাইতে দেওয়া হয়। অভাব জানাইয়া হরিসভার একটা কুঠুরির একপাশে থাকিবার স্থান পাইল বটে, কিন্তু সেখানে বড় অসুবিধা, অনেকগুলি নিষ্কৰ্মা গাঁজাখোর লোক রাত্ৰিতে সেখানে আড়া করে, প্রায় সমস্ত রাত্ৰি হৈ হৈ করিয়া কাটায়, এমন কি গভীর রাত্রিতে এক-একদিন এমন ধরনের স্ত্রীলোকের যাতায়াত দেখা যাইতে লাগিল যাহ্যাঁদের ঠিক হরিমন্দির দর্শন-প্ৰাধিনী ভদ্রমহিলা বলিয়া মনে হয় না। অতিকষ্টে দিন কটাইয়া সে শহরের বড় বড় উকিল ও ধনী গৃহস্থের বাড়িতে ঘুরিতে লাগিল। সারাদিন ঘুরিয়া অনেক রাত্ৰিতে ফিরিয়া এক-একদিন দেখিত তাহার স্থানটিতে তাহারই বিছানাটি টানিয়া লইয়া কে—একজন অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তি নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে। হরিহর কয়েকদিন বাহিরের বারান্দায় শুইয়া কটাইল। প্রায়ই এরূপ হওয়াতে ইহা লইয়া গাঁজাখের সম্প্রদায়ের সহিত তাহার একটু বাচসা হইল। পরদিন প্রাতে তাহারা হরিসভার সেক্রেটারির কাছে গিয়া কি লাগাইল তাহারাই জানে—সেক্রেটারি-বাবু নিজ বাড়িতে হরিহরকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন ও বলিলেন, তাহদের হরিসভায় তিনদিনের বেশি থাকিবার নিয়ম নাই, সে যেন অন্যত্র বাসস্থান দেখিয়া লয়।
