ঝড়ের গোঁ গো শব্দ, অনেক রাত্রে ঝড় বাড়িল। বাহিরে কি ঝটিকা আসিল! উপায়! একবার বড় একটা দমকায় ভয় পাইয়া সে ঝড়ের গতিক বুঝিবার জন্য সন্তৰ্পণে দালানের দুয়ার খুলিয়া বাইরের রোয়াকে মুখ বাড়াইল.বৃষ্টির ছাটে কাপড় চুল সব ভিজিয়া গেল-জু দুএকটানা হওয়ার শব্দে বৃষ্টিপতনের ঝড়ের শব্দ ঢাকিয়া গিয়াছে-বাহিরে কিছু দেখা যায় না-অন্ধকারের মেঘে। আকাশে বাতাসে গাছপালায় সব একাকার! ঝড়-বৃষ্টির শব্দে আর কিছু শোনা যায় না।
এই হিংস্ৰ অন্ধকার ও ক্রুর ঝটিকাময়ী রজনীর আত্মা যেন প্ৰলয়দেবের দূতরূপে ভীম। ভৈরব বেগে সৃষ্টি গ্রাস করিতে ছুটিয়া আসিতেছে-অন্ধকারে, রাত্রে, গাছপালায়, আকাশে, মাটিতে তাহার গতিবেগ বাধিয়া শব্দ উঠিতেছে-সুইশ সু-উ-উ-উইশ.সু উ উ উ ই শ…এই শব্দের প্রথমাংশের দিকে বিশ্বগ্রাসী দূতটা যেন পিছু হটিয়া বল সঞ্চয় করিতেছে-সু উ উ—এবং শেষের অংশটায় পৃথিবীর উচ্চ নীচ তাবৎ বায়ুস্তর আলোড়ন, মন্থন করিয়া বায়ুস্তরে বিশাল তুফান তুলিয়া তাহার সমস্ত আসুরিকতার বলে সর্বজয়াদের জীর্ণ কোঠাটার পিছনে ধাক্কা দিতেছে-ইই শ..! কোঠা দুলিয়া দুলিয়া উঠিতেছে…আর থাকে না! ইহার মধ্যে যেন কোনো অধীরতা, বিশৃঙ্খলতা, ভ্রম-ভ্রান্তি নাইযেন দৃঢ়, অভ্যস্থ, প্রণালীবদ্ধ ভাবের কর্তব্যকাৰ্য.বিশ্বটাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুৰ্ণ করিয়া উড়াইয়া দেওয়ার ভার যে লইয়াছে, যুগে যুগে এরকম কত হাস্যমুখী সৃষ্টিকে বিধ্বস্ত করিয়া অনন্ত আকাশের অন্ধকারে তারাবাজির মতো ছড়াইয়া দিয়া আসিয়াছে যে মহাশক্তিমান ধ্বংসদূত-এ তার অভ্যস্ত কাৰ্য…এতে তার অধীরতা উন্মত্ততা সাজে না…
আতঙ্কে সর্বজয়া দোর বন্ধ করিয়া দিল.আচ্ছা যদি এখন একটা কিছু ঘরে ঢোকে? মানুষ কি অন্য কোন জানোয়ার? চারিদিকে ঘন বাঁশবন, জঙ্গল, লোকজনের বসতি নাই-মাগো! জলের ছাটে ঘর ভাসিয়া যাইতেছে…হাত দিয়া দেখিল ঘুমস্ত অপুর গা জলে ভিজিয়া ন্যাত হইয়া যাইতেছে..সে কি করে? আর কত রাত আছে? সে বিছানা হাতড়াইয়া দেশলাই খুঁজিয়া কেরোসিনের ডিবাটা জ্বলে। ডাকে-ও অপু ওঠ তো? জল পড়চে—। অপু ঘুমচোখে জড়িত গলায় কি বলে বোঝা যায় না। আবার ডাকে-অপু? শূনচিস ও অপু? ওঠু দিকি! দুৰ্গাকে বলে-পোশ ফিরে শো তো দুগগা। বড় জল পড়চে-একটু সরে, পাশ ফের দিকি-
অপু উঠিয়া বসিয়া ঘুমচোখে চারিদিকে চায়—পরে আবার শুইয়া পড়ে। কুড়মা করিয়া বিষম কি শব্দ হয়, সর্বজয়া তাড়াতাড়ি আবার দুয়ার খুলিয়া বাহিরের দিকে উঁকি মারিয়া দেখিল— বাঁশবাগানের দিকটা ফাঁকা ফাঁকা দেখাইতেছে–রান্নাঘরের দেওয়াল পড়িয়া গিয়াছে?…তাহার বুক কঁপিয়া ওঠে-এইবার বুঝি পুরানো কোঠোটা–? কে আছে, কাহাকে সে এখন ডাকে? মনে মনে বলে-হে ঠাকুর, আজকার রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে দাও, হে ঠাকুর, ওদের মুখের দিকে তাকাও—
তখনও ভালো করিয়া ভোর হয় নাই, ঝড় থামিয়া গিয়াছে কিন্তু বৃষ্টি তখনও অল্প অল্প পড়িতেছে। পাড়ার নীলমণি মুখুজ্যের স্ত্রী গোহালে গরুর অবস্থা দেখিতে আসিতেছেন, এমন সময় খিড়কিদোরে বার বার ধাক্কা শুনিয়া দোর খুলিয়া বিস্ময়ের সুরে বলিলেন-নতুন বৌ!..সৰ্বজয়া ব্যস্তভাবে বলিল-নাদি, একবার বটুটাকুরকে ডাকো দিকি?…একবার শিগগির আমাদের বাড়িতে আসতে বলো-দুগগা কেমন করচে!
নীলমণি মুখুজ্যের স্ত্রী আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—দুগ্ৰগা? কেন কি হয়েছে দুগগার?…
সর্বজয়া বলিল-কদিন থেকে তো জ্বর হচ্ছিল-হচ্ছে। আবার যাচ্ছে-ম্যালেরিয়ার জ্বর, কাল সন্দে থেকে জ্বর বড্ড বেশি।–তার ওপর কাল রাত্রে কি রকম কাণ্ড তো জানেই-একবার শিগগির বটুঠাকুরকে–
তাহার বিস্রস্ত কেশ ও রাত-জাগা রাঙা রাঙা চোখের কেমন দিশাহারা চাহনি দেখিয়া নীলমণি মুখুজ্যের স্ত্রী বলিলেন-ভয় কি বৌ-দাঁড়াও আমি এখুনি ডেকে দিচ্চি-চল আমিও যাচ্ছি।–কাল আবার রাত্তিরে গোয়ালের চালাখানা পড়ে গেল-বাবা, কাল রাত্তিরের মতো কাণ্ড আমি তো কখনও দেখিনি-শেযরাত্রে সব উঠে গাবু টাবু সরিয়ে রেখে আবার শুয়োচে কিনা?…দাঁড়াও আমি ডাকি–
একটু পরে নীলমণি মুখুজ্যে, তাহার বড় ছেলে ফণি, স্ত্রী ও দুই মেয়ে সকলে অপুদের বাড়িতে আসিলেন। রাত্রের অন্ধকারে সেই দৈত্যটা যেন সারা গ্রামখানা দলিত, পিষ্ট, মথিত করিয়া দিয়া আকাশ-পথে অন্তহিত হইয়াছে-ভাঙা গাছের ডাল, পাতা, চালের খড়, কাঁচা বাঁশপাতা, বাঁশের কঞ্চিতে পথ ঢাকিয়া দিয়াছে-ঝড়ের বাঁশ নুইয়া পথ আটকাইয়া রহিয়াছে। ফণি বলিল-দেখেচোন বাবা কাণ্ডখানা? সেই নবাবগঞ্জের পাকা রাস্তা থেকে বিলিতি তট্কা গাছটার পাতা উড়িয়ে এনেচে!…নীলমণি মুখুজ্যের ছোট ছেলে একটা মরা চড়ুই পাখি বাঁশপাতার ভিতর হইতে টানিয়া বাহির করিল।
দুৰ্গার বিছানার পাশে অপু বসিয়া আছে-নীলমণি মুখুজ্যে ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন-কি হয়েছে বাবা অপু?
অপুর মুকে উদ্বেগের চিহ্ন। বলিল, দিদি কি সব বকছিল জেঠামশায়।
নীলমণি বিছানার পাশে বসিয়া বলিলেন-দেখি হাতখানা?…জুরটা একটু বেশি, আচ্ছা! কোনো ভয় নেই।–ফণি, তুমি একবার চট করে নবাবগঞ্জে চলে যাও দিকি শরৎ ডাক্তারের কাছেএকেবারে ডেকে নিয়ে আসবে। পরে তিনি ডাকিলেন-দুৰ্গা, ও দুৰ্গা? দুৰ্গার অঘোর আচ্ছন্ন ভাব, সাড়া শব্দ নাই। নীলমণি বলিলেন, এঃ, ঘরদোরের অবস্থা তো বড্ড খারাপ? জল পড়ে কাল রাত্রে ভেসে গিয়েছে…তা বৌমার লজ্জার কারণই বা কি-আমাদের ওখানে না হয় উঠলেই হ’ত? হরিটারও কাণ্ডজ্ঞান আর হল না। এ জীবনে–এই অবস্থায় এইরকম ঘরদের সারানোর একটা ব্যবস্থা না করে কি যে কারচে, তাও জানিনে-চিরকালটা ওর সমান গেল–
