-ধাড়ি মেয়ের কোনো কাজ নেই, কেবল খাওয়া আর পাড়ায় পাড়ায় টো টো করে বেড়ানো-আর কেবল পুতুলের বাক্স আর পুতুলের বাক্স! ও সব টেনে এক্ষুনি বাঁশবাগানে ফেলে দিয়ে আসচি। দিচ্চি তোমার খেলা ঘুচিয়ে একেবারে–
দুৰ্গার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না। পুতুলের বাক্স তাহার প্রাণ, দিনের মধ্যে দশবার সে পুতুলের বাক্স গোছায়া-পুতুল, রাংতা, ছোপানো কাপড়, আলতা, কত কষ্টের সংগ্ৰহ করা নাটফল, টিনমোড়া আরশিখানা, পাখির বাসা-সব অন্ধকার উঠানের মধ্যে কোথায় কি ছড়াইয়া পড়িল। মা যে তাহার পুতুলের বাক্স এরূপ নির্মমভাবে ফেলিয়া দিতে পারে, একথা কখনও সে ভাবিতে পারিত না! কত কষ্টে কত জায়গা হইতে জোগাড় করা কত জিনিস উহার মধ্যে!
কোনো কথা বলিতে সাহস না করিয়া সে কেমন অবাক হইয়া রহিল।
অপুর কাছেও বোধ হয় শাস্তিটা কিন্তু বেশি কঠোর বলিয়াই ঠেকিল। সে আর কোনো কথা না বলিয়া চুপচাপ গিয়া শুইয়া পড়িল।
রাত্রি অনেক হইয়াছে, মেজেতে কেরোসিন তেলের গন্ধ বাহির হইতেছে, ঘরের মধ্যে বাঁশবাগানের মশা বিন বিনা করিতেছে। খানিকক্ষণ বসিয়া বসিয়া দুর্গা গিয়া চুপ করিয়া শুইয়া পড়িল।
ভাঙা জানোলা দিয়া ফাগুন জ্যোৎস্নার আলো বিছানায় পড়িয়াছে, পোড়ো ভিটার দিক হইতে ভুর ভুর করিয়া লেবু ফুলের গন্ধ আসিতেছে।
একবার তাহার মনে হইল উঠিয়া গিয়া পুতুলের বাক্সট ও ছড়ানো জিনিসগুলা তুলিয়া আনে-কাল সকালে কি আর পাওয়া যাইবে? কত কষ্টের জিনিসগুলা! কিন্তু সাহস পাইল না। আনিতে গেলে মা যদি আবার মারে?
অনেকক্ষণ কাটিয়া গেল। হঠাৎ সে গায়ের উপর কাহার হাত অনুভব করিল। অপু ভয়ে ভায়ে ডাকিল-দিদি? দুৰ্গা কোনো জবাব দিবার পূর্বেই অপু বালিশে মুখ গুজিয়া হাউ হাউ কবিয়া কঁদিয়া উঠিল-আমি আর করবো না-আমার ওপর রাগ করিসনে দিদি-তোর পায়ে পড়ি। কান্নাব আবেগে তাহার গলা আটকাইয়া যাইতে লাগিল।
দুৰ্গা প্রথমটা বিস্মিত হইল-পরে সে উঠিয়া বসিয়া ভাইয়ের কান্না থামাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল-কাঁদিসনে, চুপ চুপ, মা শুনতে পেলে আবার আমায় বকবে, চুপ, কঁদতে নেই-আচ্ছা! আমি রাগ করবো না, কেঁদে না ছিঃ-চুপ–
তাহার ভয় হইতেছিল অপুর কান্না শুনিলে মা আবাব হয়তো তাহাকেই মারিাবে।
অনেক করিয়া সে ভাইয়ের কান্না থামাইল। পরে শুইয়া শুইয়া তাহাকে নানান গল্প, বিশেষত রানুর দিদির বিয়ের গল্প বলিতে লাগিল। একথা-ওকথাব পর অপু দিদিব গায়ে হাত দিয়া চুপি চুপি বলিল-একটা কথা বলবো দিদি?–তোর সঙ্গে মাস্টার মশায়ের বিয়ে হবে। —
দুৰ্গার লজ্জা হইল, সঙ্গে সঙ্গে তাহার অত্যন্ত কৌতূহলও হইল; কিন্তু ছোট ভাই-এর কাছে এ সম্বন্ধে কোনো কথাবার্তা বলিতে তাহার সংকোচ হওয়াতে সে চুপ করিয়া রহিল।
অপু আবার বলিল—খুড়িমা বলছিল রানুর মায়ের কাছে আজ বিকালে। মাস্টার মশায়ের নাকি অমত নেই–
কৌতুহলের আবেগে চুপ করিয়া থাকা অসম্ভব হইয়া উঠিল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলিল— হ্যাঁ বলছিল-যাঃ-তোর সব যেমন কথা–
অপু প্রায় বিছানায় উঠিয়া বসিল,—সত্যি বলচি দিদি, তোর গা ছুঁয়ে বলচি। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে, আমাকে দেখেই তো কথা উঠল। বাবাকে দিয়ে পত্তর লেখাবে সেই মাস্টার মশায়ের বাবা যেখানে থাকেন সেখানে–
–মা জানে?
—আমি এসে মাকে জিজ্ঞেস করবো ভাবলাম-ভুলে গিইচ। জিজ্ঞেস করবো দিদি মা বোধ হয় শোনে নি; কাল খুড়িমা মাকে ডেকে নিয়ে বলবে বলছিল–
পরে সে বলিল-তুই কত রেলগাড়ি চড়বি দেখিস, মাস্টার মশাইরা থাকেন। এখান থেকে অনেক দূরে-রেলে যেতে হয়–
দুৰ্গা চুপ করিয়া রহিল।
সে রেলগাড়ির ছবি দেখিয়াছে।–অপুর একখানা বইয়ের মধ্যে আছে। খুব লম্বা, অনেকগুলো চাকা, সামনের দিকে কল, সেখানে আগুন দেওয়া আছে, ধোঁয়া ওড়ে। রেলগাড়িখানা আগাগোড়া লোহার, চাকাও তাই-গরুর গাড়ির মতো কাঠের চাকা নয়। রেল লাইনের ধারে কোনো খড়ের বাড়ি নাই, থাকিতে পারে না, পুড়িয়া যায়। রেলগাড়ি যখন চলে তখন তাহার নল হইতে আগুন বাহির হয়। কিনা! সে ভাই-এর গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল-তোকেও সঙ্গে করে নিয়ে যাবো। তাহার পর দুজনেই চুপ করিয়া ঘুমাইবার জোগাড় করিল। ঘুমাইতে গিয়া একটা কথা বার বার দুর্গার মনে হইতেছিল–ঠাকুর সুদৰ্শন তাহার কথা শুনিয়াছেন! আজই তো সুদর্শনের কাছে সে-ঠাকুরের বড় দয়া-মা তো ঠিক কথা বলে!
অপু বলিল-লীলাদির জন্যে কেমন চমৎকার শাড়ি কেনা হযোচে, আজ লীলাদির কাকা বিয়ের জন্যে কিনে এনেচে রানাঘাট থেকে, সেজ জেঠিমা বললে-বালুচরের শাড়ি–
দুৰ্গা হাসিমুখে বলিল–একটা ছড়া জানিস?…পিসি বলতো,
বালুচরের বালুর চরে একটা কথা কই–
মোষের পেটে ময়ুরছানা দেখে এলাম সই।
১৯. অপু কাউকে একথা এখনও বলে নাই
অপু কাউকে একথা এখনও বলে নাই।–তাহার দিদিকেও না।
সেদিন চুপি চুপি দুপুরে সে যখন তাহার বাবার ওই বই-বোঝাই কাঠের সিন্দুকটা লুকাইয়া খুলিয়াছিল, সিন্দুকটার মধ্যে একখানা বই-এর মধ্যেই এই অদ্ভুত কথাটার সন্ধান পাইয়াছে!
উঠানের উপর বাঁশঝাড়ের ছায়া তখন পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ হয় নাই, ঠিক-দুপুরে সোনাডাঙার তেপান্তর মাঠের সেই প্রাচীন অশ্বখ গাছের ছায়ার মতো এক জায়গায় একরাশ ছায়া জমাট বাধিয়া ছিল।
একদিন সে দুপুরবেলা বাপের অনুপস্থিতিতে ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া চুপি চুপি বই-এর বাক্সটা লুকাইয়া খুলিল। অধীর আগ্রহের সহিত সে এ-বই ও-বই খুলিয়া খানিকটা করিয়া ছবি দেখিতে এবং খানিকটা করিয়া বই-এর মধ্যে ভালো গল্প লেখা আছে কি না দেখিতে লাগিল। একখানা বই-এর মলাট খুলিয়া দেখিল নাম লেখা আছে সর্ব-দৰ্শন-সংগ্ৰহ। ইহার অর্থ কি, বইখানা কোন বিষয়ের তাহা সে বিন্দুবিসর্গও বুঝিল না। বইখানা খুলিতেই একদল কাগজ-কাটা পোকা নিঃশব্দে বিবৰ্ণ মার্বেল কাগজের নিচে হইতে বাহির হইয়া উধৰ্বশ্বাসে যেদিকে দুই চোখ যায় দৌড় দিল। অপু বইখানা নাকের কাছে লইয়া গিয়া ঘ্ৰাণ হইল, কেমন পুরানো গন্ধ! মেটে রঙের পুরু পুরু পাতাগুলোর এই গন্ধটা তাহার বড় ভালো লাগে-গন্ধটায় কেবলই বাবার কথা মনে করাইয়া দেয়। যখনই এ গন্ধ সে পায় তখনই কি জানি কেন তাহার বাবার কথা মনে পড়ে।
