বাগানগুলি পার হইয়া চড়কতলার মাঠ। ঘাসে-ভরা মাঠে ছায়া পড়িয়া গিয়াছে। দুর্গা ঝোপের মধ্যে মধ্যে সেয়াকুল খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল-সেঁয়াকুল এখন আর বড় থাকে না, শীতের শেষে ঝরিয়া যায়। ওই উঁচু ঢিবিতে ঝোপের মধ্যের একটা গাছে অনেক সেয়াকুল সেদিনও তো সে খাইয়া গিয়াছে, কিন্তু এখন আর নাই, সব ঝরিয়া গিয়াছে, গোলমরিচের মতো শুকনা সেয়াকুল ঘন ঝোপের তলা বিছাইয়া পড়িয়া আছে। এক ঝাক শালিক পাখি ঝোপের মধ্যে কিছু কিচু করিতেছিল, দুৰ্গা নিকটে যাইতে উড়িয়া গেল।
তাহার মনে খুশির আবার একটা প্রবল ঢেউ আসিল। উৎসবের নৈকট্য, রানুর দিদিব বাসরে রাত জাগা ও গান শুনিবার আশা
খুশিতে তাহার ইচ্ছা হইল সে মাঠের এধাব হইতে ওধার পর্যন্ত ছুটিয়া বেড়ায়।
একবার সে হাত দুটা ছড়াইয়া ডানার মতো লম্বা করিয়া দিয়া খানিকটা ঘুরপাক খাইযা খানিকটা ছুটিয়া গেল। সে উড়িতে চায়!..শরীর তো হালকা জিনিস-হাত ছড়াইয়া ডানার মতো বাতাস কাটিতে কাটিতে যদি যাওয়া হইত!
শুধু শব্দ করিবার আনন্দে সে শূকনো ঝবাপাতার রাশির উপর ইচ্ছা করিয়া জোরে জোরে পা ফেলিয়া মাচু মচু শব্দ করিতে করিতে চলিল। পাতা ভাঙিয়া গিয়া শুকনা শুকনা ধূলা মিশানো, খানিকটা সোদা সোদা খানিকটা তিক্ত গন্ধে জায়গাটা ভরিয়া গেল।
সামনে একটু দূরে সোনাডাঙার মাঠের দিকে যাইবার কাঁচা সড়ক। একখানা গরুর গাড়ি ক্যাঁচু ক্যাঁচু শব্দে মাঠের পথের দিকে যাইতেছে। টাটকা কাটা কঞ্চির ঘেরা বাঁধিযা তাহার উপর কাঁথা ও ছেড়া লাল নকশাপাড় কাপড় ঘিরিয়া ছাই তৈয়ারি করিয়াছে। ছাঁই-এর মধ্যে কাহাদের একটা ছোট মেয়ে একঘেয়ে, একটানা ছেলেমানুষ ধরনে কাঁদিতে কাঁদিতে যাইতেছে-কোন গায়ের চাষাদের মেয়ে বোধ হয় বাপের বাড়ি হইতে শ্বশুরবাড়ি চলিয়াছে।
দুর্গা অবাক হইয়া একদৃষ্টি গাড়িখানার দিকে চাহিয়া রহিল।
বিয়ের পর মা, বাবা, অপু-সব ছাড়িয়া এই রকম কোথায় কতদূরে চলিয়া যাইতে হইবে হয়তো-যখন তখন সেখান হইতে তাহারা আসিতে দিবে কি? সে এতক্ষণ একথা ভাবিয়া দেখে নাই—এই বাগান, বাসকফুলের ঝাড়, রান্তী গাইটা, উঠানের কাঁঠালতলাটা যাহা সে এত ভালোবাসে, এই শূকনো পাতার গন্ধ, ঘাটের পথ এইসব ছাড়িয়া যাইতে হইবে চিরকালের জন্য! ছই-এর মধ্যের ছোট্ট মেয়েটা বোধ হয় সেই দুঃখেই কাঁদিতেছে।
কাঁচা সড়কটা ছাড়াইয়া আর একটা ছোট্ট পোড়ো মাঠ পার হইলেই নদী।
ওপারের জেলেরা কি মাছ ধরিতেছে? খয়রা? এপারে আসিলে দু’পয়সার মাছ কিনিয়া বাড়ি লইয়া যাইত। অপু খয়রা মাছ খাইতে বড় ভালোবাসে।
বাড়ি ফিরিয়া সন্ধ্যার পর সে অনেকক্ষণ ধরিয়া পুতুলের বাক্স গোছাইল। ঘরের মেঝেতে তাহার মা তেল পুরিতে গিয়া অনেকটা কেরোসিন তেল ফেলিয়া দিয়াছে, তাহার গন্ধ বাহির হইতেছে, হাওয়াটা যেন একটু গরম। পুতুল-গুছানো প্রায় শেষ হইয়াছে, অপু আসিয়া বলিল-তুই, বুঝি আমার বাক্স থেকে ছোট্ট আরশিখানা বের করে নিয়েচিস দিদি?
–হুঁ-আরশি তো আমার-আমিই তো আগে দেখতে পেয়েছিলাম, তক্তপোশের নিচে পড়েছিল। যাও, আমি আরশি আমার বাক্সে রাখবো। বেটা ছেলে আবার আরশি নিয়ে কি হবে?
—বা রে, তোমার আরশি বই কি? ও-পাড়ার খুড়িমাদের বাড়ি থেকে মা তো কি বের্তেীতে আরশি এনেছিল, আমি তো আগেই মা’র কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম। না দিদি, দাও
কথা শেষ করিয়াই সে দিদির পুতুলের বাক্সের কাছে বসিয়া পড়িয়া তাহার মধ্যে আরশি খুঁজিতে লাগিল।
দুৰ্গা ভাইয়ের গালে এক চড় লাগাইয়া দিয়া বলিল-দুন্টু কোথাকার-আমি পুতুল গুছিয়ে রাখচি আর উনি হাণ্ডুল-পাণ্ডুল করছেন- যা আমার বাক্সে হাত দিতে হবে না তোমায়-দোবো না আমি আরশি।
কিন্তু কথা শেষ না হইতেই অপু ঝাপাইয়া তাহার ঘাড়ের উপর পড়িয়া তাহার বৃক্ষ চুলের গোছা ধরিয়া টানিয়া আঁচড়াইয়া কামড়াইয়া তাহাকে অস্থির করিয়া তুলিল। কান্না আটকানো গলায় বলিতে লাগিল-কেন তুমি আমাকে মারবে? আমার লাগে না বুঝি?–দাও আমায়া-মাকে বোলে দেবো-লক্ষ্মীর চুপড়ি থেকে আলতা চুরি কোরেচ–
আলতা চুরির কথায় দুর্গা ক্ষেপিয়া গেল। ভাই-এর কান ধরিয়া তাহাকে কঁকুনি দিয়া উপরি উপরি পটাপট কয়েকটা চড় দিতে দিতে বলিল-আলতা নিইচি?-আমি আলতা নিইচি, লক্ষ্মীছাড়া দুষ্ট বাঁদর! আর তুমি যে লক্ষ্মীর চুপড়ির থেকে কড়িগুলো খুলে লুকিয়ে রেখেচ, মাকে বলে দেবো না?
চিৎকার, কান্না ও মারামারির শব্দ শুনিয়া সর্বজয়া ছুটিয়া আসিল।
ততক্ষণে দুর্গা অপুর কান ধরিয়া তাহাকে মাটিতে প্রায় শোয়াইয়া ফেলিয়াছে।–অপুও প্রাণপণে দুর্গার চুলের গোছা মুঠি পাকাইয়া টানিয়া এরূপ ধরিয়া আছে, যে দুর্গার মাথা তুলিবার ক্ষমতা নাই।
অপুর লাগিয়াছিল বেশি। সে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিল-দ্যাখো না মা, আমার আরশিখানা বাক্স থেকে বের করে নিজের বাক্সে রেখে দিয়েচে-দিচ্ছে না-এমন চড় মেরেচে। গালে–
দুৰ্গা প্রতিবাদ করিয়া বলিল-না মা, দ্যাখো না আমার পুতুলের বাক্স গোছাচ্ছি, ও এসে সেগুলো সব–
সর্বজয়া আসিয়া মেয়ের পিঠের উপর দুম দুম করিয়া সজোরে কয়েকটি কিল বসাইয়া দিয়া বলিল-ধাড়ি মেয়ে-কেন তুই ওর গায়ে হাত দিবি যখন তখন?-ওতে আর তোতে অনেক তফাৎ জনিস?—আরশি-আরশি তোমার কোন পিণ্ডিতে লাগবে শুনি? কথায় কথায় উনি যান ওকে তেড়ে মারতে। মরণ আর কি! পুতুলের বাক্স-রোসো–
কথা শেষ না করিয়াই সে মেয়ের গুছানো পুতুলের বাক্স উঠাইয়া একটান মারিয়া বাহির উঠানে ছুঁড়িয়া ফেলিয়া দিল।
