ছাতিমতলায় গ্রামের শ্মশান। অপুর সমস্ত শরীর যেন জমিয়া পাথরের মতো আড়ষ্ট ও ভারী হইয়া গেল। তাহার মা সবেমাত্র ভিতরের বাড়িতে ঢুকিয়া মাটির প্রদীপটা রোয়াকের ধার হইতে উঠাইয়া লইতেছে। সে পা টিপিয়া টিপিয়া বাড়ি ঢুকিতেই তাহার মা তাহার দিকে চাহিয়া বলিল–তুমি আবার এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে শুনি? মোটে তো আজ ভাত খেয়েচো?
তাহার মনে নানা প্রশ্ন জাগিতেছিল। দিদি আবার মারা খাইল কেন? সে এতক্ষণ কোথায় ছিল? দুপুর বেলা দিদি কি খাইল? সে কি আবার কোন জিনিস চুরি করিয়া আনিয়াছে? কিন্তু ভয়ে কোনো কথা না বলিয়া সে কলের পুতুলের মতো মায়ের কথামতো কাজ করিয়া ঘরের মধ্যে ঢুকিল। পরে ভয়ে ভয়ে প্ৰদীপ উসকাইয়া দিয়া নিজের ছোট বইয়ের দপ্তরটি বাহির করিয়া পড়িতে বসিল। সে পড়ে মােটে তৃতীয় ভাগ-কিন্তু তাহার দপ্তরে দুখানা মোটা মোটা ভারী ইংরাজি কি বই, কবিরাজি ঔষধের তালিকা, একখানা পাতা-ছেড়া দাশুরায়ের পাঁচালি, একখানা ১৩০৩ সালের পুরাতন পাঁজি প্রভৃতি আছে। সে নানাস্থান হইতে চাহিয়া এগুলি জোগাড় করিয়াছে এবং এগুলি না পড়িতে পারিলেও রোজ একবার করিয়া খুলিয়া দেখে।
খানিকক্ষণ দেওয়ালের দিকে চাহিয়া সে কি ভাবিল। পরে আর একবার প্রদীপ উসকাইয়া দিয়া পাতা-ছেড়া দাশুরায়ের পাঁচালিখানা খুলিয়া অন্যমনস্কভাবে পাতা উলটাইতেছে, এমন সময়ে সর্বজয়া এক বাটি দুধ হাতে করিয়া ঢুকিয়া বলিল–এসো, খেয়ে নাও দিকি!
অপু দ্বিরুক্তি না করিয়া বাটি উঠাইয়া লইয়া দুধ চুমুক দিয়া খাইতে লাগিল। অন্যদিন হইলে এত সহজে দুধ খাইতে তাহাকে রাজি করানো খুব কঠিন হইত। একটুখানি মাত্র খাইয়া সে বাটি মুখ হইতে নামাইল। সর্বজয়া বলিল–ওকি? নাও সবটুকু খেয়ে ফেলো–ওইটুকু দুধ ফেললে তবে বাঁচবে কি খেয়ে–
অপু বিনা প্রতিবাদে দুধের বাটি পুনরায় মুখে উঠাইল। সর্বজয়া দেখিল সে মুখে বাটি ধরিয়া রহিয়াছে কিন্তু চুমুক দিতেছে না।–তাহার বাটিসুদ্ধ হাতটা কাঁপিতেছে. পরে অনেকক্ষণ মুখে ধরিয়া রাখিয়া হঠাৎ বাটি নামাইয়া সে মায়ের দিকে চাহিয়া ভয়ে কাঁদিয়া উঠিল। সর্বজয়া আশ্চর্য হইয়া বলিল–কি হল রে? কি হয়েচে, জিভ কামড়ে ফেলেছিস?
অপু মায়ের কথা শেষ হইবার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের বাঁধ না মানিয়া ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিয়া বলিল–দিদির জন্য বড্ড মন কেমন করছে!..
সর্বজয়া অল্পক্ষণ মাত্ৰ চুপ করিয়া বসিয়া পরে সরিয়া আসিয়া ছেলের গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে শান্তসুরে বলিতে লাগিল–কেন্দো না, অমন করে কেন্দো না,-ওই পটলিদের কি নেড়াদের বাড়ি বসে আছে–কোথায় যাবে অন্ধকারে? কম দুষ্ট মেয়ে নাকি? সেই দুপুর বেলা বেরুল–সমস্ত দিনের মধ্যে আর চুলের টিকি দেখা গেল না–না খাওয়া, না দাওয়া, কোথায় ও-পাড়ার পালিতদের বাগানে বসে ছিল, সেখানে বসে কাঁচা আমি আর জামরুল খেয়েচে, এক্ষুনি ডাকতে পাঠাচ্ছি–কেন্দো না আমন করে–আবার জ্বর আসবে।–ছিঃ!
পরে সে আঁচল দিয়া ছেলের চোখের জল মুছইয়া দিয়া বাকি দুধ টুকু খাওয়াইবার জন্য বাটি তাহার মুখে তুলিয়া ধরিল-হাঁ করো দিকি, লক্ষ্মী সোনা, উনি এলেই ডেকে আনবেন এখন—একেবারে পাগল–কোথেকে একটা পাগল এসে জন্মেছে—আর এক চুমুক–হ্যাঁ–
রাত অনেক হইয়াছে। উত্তরের ঘরে তক্তাপোশে অপু ও দুর্গ শুইয়া আছে। অপুর পাশে তাহার মায়ের শুইবার জায়গা খালি আছে। কারণ মা এখন রান্নাঘরের কাজ সারিয়া আসে নাই। তাহার বাবা আহারাদি সারিয়া পাশের ঘরে বসিয়া তামাক খাইতেছেন। বাবা বাড়ি আসিয়া দুৰ্গাকে পাড়া হইতে খুজিয়া আনিয়াছেন।
বাড়ি আসিয়া পর্যন্ত দুৰ্গা কাহারও সঙ্গে কোনো কথা বলে নাই। খাওয়া-দাওয়া সারিয়া আসিয়া চুপ করিয়া শুইয়াছে। অপু দুৰ্গার গায়ে হাত দিয়া জিজ্ঞাসা করিল–দিদি, মা কি দিয়ে মেরেছিল রে সন্ধেবেলা? তোর চুল ছিঁড়ে দিয়েচে?
দুৰ্গার মুখে কোন কথা নাই।
সে পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল-আমার উপর রাগ করেছিস দিদি? আমি তো কিছু করিনি।
দুৰ্গা আস্তে আস্তে বলিল–না বইকি! তবে সন্তু কি করে টের পেলে যে পুতির মালা আমার বাক্সে আছে?
অপু প্রতিবাদের উত্তেজনায় উঠিয়া বসিল।–না–সত্যি আমি তোর গা ছয়ে বলচি দিদি, আমি তো দেখাইনি। আমি জানিনে যে তোর বাক্সে আছে।–কাল সন্তু বিকেল বেলা এসেছিল, ওর সেই বড় রাঙা ভাঁটাটা নিয়ে আমরা খেলছিলাম–তার পর, বুঝলি দিদি, সতু তোর পুতুলের বাক্স খুলে কি দেখছিল–আমি বল্লাম, ভাই, তুমি আমার দিদির বাক্সে হাত দিয়ে না।–দিদি আমাকে বকে–সেই সময়ে দেখেচে–
পরে সে দুর্গার গায়ে হাত বুলাইয়া বলিল–খুব লেগেচে রে দিদি? কোথায় মেরেচে মা?
দুৰ্গা বলিল–আমার কানের পাশে মা একটা বাড়ি যা মেরেছে–রক্ত বেরিয়েছিল, এখনও কন কন কচ্ছে, এইখানে এই দ্যাখা হাত দিয়ে! এই–
–এইখানে? তাই তো রে! কেটে গিয়েছে যে? একটু পিন্দিমের তেল লাগিয়ে দেব দিদি?
–থাকগে-কাল পালিতদের বাগানে বিকেল বেলা যাব বুঝলি? কামরাঙা যা পেকেছে? এই এত বড় বড়, কাউকে যেন বলিসনে! তুই আর আমি চুপি চুপি যাবো।–আমি আজ দুপুরবেলা দুটো পেড়ে খেয়েছি।–মিষ্টি যেন গুড়–
১১. এদিনের ব্যাপারটা এইরূপে ঘটিল
এদিনের ব্যাপারটা এইরূপে ঘটিল।
অপু বাবার আদেশে তালপাতে সাতখানা ক খ হাতের লেখা শেষ করিয়া কি করা যায় ভাবিতে ভাবিতে বাড়ির মধ্যে দিদিকে খুজিতে গেল। দুৰ্গা মায়ের ভয়ে সকালে নাহিয়া আসিয়া ভিতরের উঠানে পেপেতলায় পুণ্যিপুকুরের ব্ৰত করিতেছে। উঠানে ছোট্ট চৌকোণা গর্ত কাটিয়া তাহার চারিধারে ছোলা, মটর ছড়াইয়া দিয়াছিল–ভিজে মাটিতে সেগুলির অন্ধুর বাহির হইয়াছে—চারিদিকে কলার ছোট বোগ পুতিয়া ধারে পিটুলি গোলার আলপনা। দিতেছে-পদ্মলতা, পাখি, ধানের শিষ, নতুন ওঠা সূর্য।
