খাওয়ার পরে অপু মায়ের ভয়ে ঘরের মধ্যে বসিয়া পড়িতে লাগিল। কিন্তু তাহার মন থাকিয়া থাকিয়া কেবলই বাহিরে ছুটিয়া যাইতেছিল। বেলা একটু পড়িলে সে টুনুদের বাড়ি, পাটলিদের বাড়ি, নেড়াদের বাড়ি–একে একে সকল বাড়ি খুজিল–দিদি কোথাও নাই। রাজকৃষ্ট পালিতের স্ত্রী ঘাট হইতে জল লইয়া আসিতেছিলেন—তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল–জেঠিমা, আমার দিদিকে দেখেচো? সে আজ ভাত খায়নি, কিছু খায়নি।–মা তাকে আজ বড্ড মেরেচে-—মার খেয়ে কোথায় পালিয়েচে–দেখেচো জেঠিমা?
বাড়ির পাশের পথ দিয়া যাইতে যাইতে ভাবিল-বাঁশ-বাগানে সে যদি বসিয়া থাকে? সেদিকে গিয়া সমস্ত খুজিয়া দেখিল। সে খিড়কি-দরজা দিয়া বাড়ি ঢুকিয়া দেখিল, বাড়িতে কেহ নাই। তাহার মা বোধ হয় ঘাটে কি অন্য কোথাও গিয়াছে। বাড়িতে বৈকালের ছায়া পড়িয়া আসিয়াছে। সম্মুখের দরজার কাছে যে বাঁশঝাড় ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে, তাহার একগাছা ঝুলিয়া-পড়া শুকনো কঞ্চিতে তাহার পরিচিত সেই লেজঝোলা হলদে পাখিটা আসিয়া বসিয়াছে। রোজই সন্ধ্যার কিছু পূর্বে সে কোথা হইতে আসিয়া এই বাঁশঝাড়ের ওই কিঞ্চিখানার উপর বসে–রোজ-—রোজ-—রোজ। আরও কত কি পাখি চারিদিকের বনে কিচ-কিচ করিতেছে। নীলমণি রায়েদের পোড়ো ভিটা গাছপালার ঘন ছায়ায় ভরিয়া গিয়াছে। অপু রোয়াকে দাঁড়াইয়া দূরের সেই অশ্বখ গাছটার মাথার দিকটায় চাহিয় দেখিল–একটু একটু রাঙা রোদ গাছের মাথায় এখনও মাখানো, মগডালে একটা কি সাদা মতো দুলিতেছে, হয় বক, নয় কাহারও ঘুড়ি ছিড়িয়া আটকাইয়া বুলিতেছে–সমস্ত আকাশ জুড়িয়া যেন ছায়া আর অন্ধকার নামিয়া আসিতেছে। চারিদিকে নির্জন.কেহ কোনোদিকেই নাই..নীলমণি রায়ের পোড়ো ভিটায় কচুঝাড়ের কালো ঘন সবুজ নতুন পাতা চক চক করিতেছে। তাহার মন হঠাৎ হু-হু করিয়া উঠিল। কতক্ষণ হইল, সেই গিয়াছে, বাড়ি আসে নাই, খায় নাই–কোথায় গেল দিদি?
ভুবন মুখুজ্যের বাড়ির ছেলেমেয়েরা মিলিয়া উঠানে ছুটাছুটি করিয়া লুকোচুরি খেলিতেছে। রানু তাহাকে দেখিয়া ছুটিয়া আসিল–ভাই, আপু এসেচে.ও আমাদের দিকে হবে, আয় রে অপু।
অপু তাহার হাত ছাড়াইয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিল-আমি খেলবো না রানুদি,–দিদিকে দেখেচোঁ?
রানু জিজ্ঞাসা করিল–দুগগা? না, তাকে তো দেখিনি! বকুলতলায় নেই তো?
বকুলতলার কথা তাহার মনেই হয় নাই। সেখানে দুৰ্গা প্রায়ই থাকে বটে। ভুবন মুখুজ্যের বাড়ি হইতে সে বকুলতলায় গেল। সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে–বকুলগাছটা অনেক দূর পর্যন্ত জুড়িয়া ডালপালা ছড়াইয়া ঝুপসি হইয়া দাঁড়াইয়া আছে–তলাটা অন্ধকার। কেহ কোথাও নাই…যদি কোনো দিকে গাছপালার আড়ালে থাকে! সে ডাক দিল–দিদি, ও দিদি! দিদি!
অন্ধকার গাছটায় কেবল কতকগুলা বক পাখী ঝটপট করিতেছে মাত্র। অপু ভয়ে ভয়ে উপরের দিকে চাহিয়া দেখিল। বকুলতলা হইতে একটু দূরে একটা ডোবার ধারে খেজুর গাছ আছে, এখন ডাশা খেজুরের সময়, সেখানেও তাহার দিদি মাঝে মাঝে থাকে বটে। কিন্তু অন্ধকার হইয়া গিয়াছে, ডোবাটার দুই ধারে বাঁশবন, সেখানে যাইয়া দেখিতে তাহার সাহসী হইল না। বকুলগাছের গুড়ির কাছে সরিয়া গিয়া সে দুই-একবার চিৎকার করিয়া ডাকিল-ভাটিশেওড়া বনে কি জন্তু তাহার গলার সাড়া পাইয়া খসি খসি শব্দ করিয়া ডোবার দিকে ছুটিয়া পলাইল।
বাড়ির পথে ফিরিতে ফিরিতে হঠাৎ সে থমকিয়া দাঁড়াইল। সামনে সেই গাব গাছটা! এক সন্ধ্যার পর এ গাবগাছের তলার পথ দিয়া যাওয়া! সর্বনাশ! গায়ে কাঁটা দিয়া ওঠে। কেন যে তাহার এই গাছটার নিচে দিয়া যাইতে ভয় করে, তাহা সে জানে না। কোন কারণ নাই, এমনিই ভয় করে এবং কারণ কিছু নাই বলিয়া ভয় অত্যন্ত বেশি করে। এত দেরি পর্যন্ত সে কোনো দিন বাড়ির বাহিরে থাকে নাই–আজ তাহার সে খেয়াল হইল না। মন ব্যস্ত ও অন্যমনস্ক না থাকিলে সে কখনই এপথে আসিত না।
অপু খানিকক্ষণ অন্ধকার গাবতলাটার দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া থাকিয়া ফিরিল। তাহাদের বাড়ি যাইবার আর একটা পথ আছে–একটুখানি ঘুরিয়া পটলিদের বাড়ির উঠান দিয়া গেলে গাবতলার এ অজানা বিভীষিকার হাত হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।
পাটলির ঠাকুরমা সন্ধ্যার সময় বাড়ির রোয়াকে ছেলেপিলেদের লইয়া হাওয়ায় বসিয়া গল্প করিতেছেন। পাটলির মা রান্নাঘরে রাঁধিতেছেন। উঠানের মাচাতলায় বিধু জেলেনি দাঁড়াইয়া মাছ বিক্রয়ের পয়সা তাগাদা করিতেছে।
অপু বলিল–দিদিকে খুঁজতে গিয়েছিলাম ঠাকুমা—বকুলতলা থেকে আসতে আসতে–
ঠাকুরমা বলিলেন–দুগগা এই তো বাড়ি গেল। এই কতক্ষণ যাচ্ছে–ছুটে যা দিকি– বোধ হয় এখনও বাড়ি গিয়ে পৌঁছয়নি–
সে এক দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটিল। পিছন হইতে পাটলির বোন রাজী চেচাইয়া বলিল–কাল সকালে আসিস অপু–আমরা গঙ্গা-যমুনা খেলার নতুন ঘর কেটেছি! টেকশালের পেছনে নিমতলায়–দুগগাকে বলিস–
তাহাদের বাড়ির কাছে আসিয়া পৌঁছিয়া হঠাৎ সে থমকিয়া দাঁড়াইয়া গেল–দুৰ্গা আর্তস্বরে চিৎকার করিতে করিতে বাড়ির দরজা দিয়া দৌড়াইয়া বাহির হইতেছে–পিছনে পিছনে তাহার মা কি একটা হাতে মারিতে মারিতে তাড়া করিয়া ছুটিয়া আসিয়াছে। দুৰ্গা গাবতলার পথ দিয়া ছুটিয়া পলাইল, মা দরজা হইতে ধাবমানা মেয়ের পিছনে চেচাইয়া বলিল–যাও বেরোও–একেবারে জন্মের মতো যাও–আর কক্ষনো বাড়ি যেন ঢুকতে না হয়—বালাই, আপদ চুকে যাক-একেবারে ছাতিমতলায় দিয়ে আসি।
