সে হঠাৎ একটা প্রশ্ন করলে–আচ্ছা, একটা কথা বলুন। মেয়েরা কি খারাপ? পৃথিবীতে কেন একথা সাধু-মহাজন বলে এসেচেন?
–মেয়েরা সাধনপথের বিঘ্ন, তাই।
-কেন?
–বিভ্রান্ত করে দেয় পুরুষের মন। প্রকৃতির কাজ করবার জন্যে মায়ার সৃষ্টি করে। পুরুষেরা মজে অতি সহজেই। সখি, তোমার এই মুখোনি নিয়ে এই মহর্লোকেই একবার পরীক্ষা করে দ্যাখো না?
–সত্যি আমরা কি এতই হেয়?
–হেয় বা খারাপ এমনি হয়তো কিছু না, বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া। যে। ভগবানকে পেতে চায়, যে জ্ঞানের সাধনা করতে চায়, ভক্তির সাধনা। করতে চায়–সে নারী থেকে দূরে থাকবে এই বিধান। অন্য লোক যত খুশি মিশুক–কে বারণ করচে? সাধনার পথের পথিক যারা নয়। তাদের কি বাধা আছে নারীসঙ্গের? নারী প্রেমের সাধিকা হয় অতি সহজে, পুরুষে তা পারে না। নারী পাপের পথেও নিয়ে যায়, কল্যাণের পথেও নিয়ে যায়। কারণ চিত্তনদী উভয়তেমুখী, বহতি পাপায়, বহতি কল্যাণায়। খুব সাবধানে না চললে সৰ্ব্বনাশ আসে ওদের থেকে। সাপ খেলাতে সবাই জানে না। আনাড়ি সাপুড়ে সাপের হাতে মরে।
–স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ কি চিরকালের?
–যেখানে প্রেম থাকে। নয়তো কিসের সম্বন্ধ? যেখানে প্রেম আছে, প্রেমের দেবী মিলিয়ে দেন। স্বামী-স্ত্রী না হোলেই বা কি। প্রেম নিয়ে বিষয়–কিন্তু এ ধরনের প্রেম সাধনালব্ধ বস্তু। দেহের বা রূপের মোহ এ প্রেমের জন্ম দিতে পাড়ে না। রূপজ প্রেম দিয়ে প্রকৃতি তার কাজ করিয়ে নেয় মাত্র।
–আপনি কি করে এসব জানলেন?
মেয়েটি হেসে হেসে বল্লে–কত যে ঠকেচি ভাই কত শত জন্ম ধরে। কত নেমে গিয়েছিলাম, কত ভুগেছিলাম–জন্মজন্মান্তরের সে সব স্মৃতি ও সংস্কার আমাকে জ্ঞানী করেছে। একজন্মে দুজন্মে সাধু হওয়া যায় না ভাই–মহর্লোকেও আসা যায় না–
–আবার আপনি জন্মাবেন?
–পৃথিবীতে আমার শেষ জন্ম হয় বহুঁকাল আগে–পৃথিবীর সে। হিসেব ভুলে গিয়েচি। আর সেখানে যাবো না। ভগবান আমায় দয়া করেছেন।
–যদি আপনার মত মেয়ের দরকার হয় পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার?
–সে অবস্থায় ভগবানের নির্দেশ পাবো। জীবের সেবা করবার ভার–সৌভাগ্যের কথা সে। তিনি যদি আমায় না ছাড়েন ভাই, নরকে যেতেই বা কি? উনি হাত ধরে নিয়ে গেলে নরক আর বলি কোথায়! কিসের স্বর্গ কিসের নরক? থাকুন তো উনি আমার সঙ্গে।
মেয়েটির চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়লো দর-দর ধারে।
পুষ্প অবাক হোল ওঁর অনুভূতির তীব্রতায়। শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে ভ’রে উঠলো তার মন।
মেয়েটি আবার বল্লেভগবান এই আলোর কমল বিশ্বজগৎ হয়ে ফুটে আছেন। তাঁর করুণার আলো। কাউকে তিনি ভোলেন না, অবহেলা করেন না ভাই–তাঁর মত প্রেমিক কে? যে ডাকে, যে তাঁর শরণ নেয়, তিনি তারই দোরে ছুটে যান, পাপী-পতিত মানেন না। কিন্তু ভাই, কেউ কি তাঁকে চায়?
সমুদ্রতীরের বিশাল বৃক্ষতলে নীল ঊর্মিমালার দিকে চেয়ে ওরা দুজন দাঁড়িয়ে। মেয়েটি সুন্দর ভঙ্গিতে হাত তুলে দূরে দেখিয়ে বল্লে– ওই মহাসমুদ্রের মত অন্তহীন তাঁর করুণা! কেউ বুঝতে পারে না, বলে তাঁকে নিষ্ঠুর। তিনি দু’তিন জন্মের মঙ্গল করেন একজন্মের কৰ্ম্মক্ষয় করে। পৃথিবীর লোকে সদ্য সদ্য ফল চায়। বোঝে না তিনি। কি করতে চাইছেন। ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে অনেক সময় আসে তাঁর করুণা। কাজেই অবুঝের গালাগালি তাঁকে সহ্য করতে হয়।
পুষ্প বল্লে–আপনি দেবী, কি আনন্দ হোল আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে। আমার সঙ্গী মহর্লোকে বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না, জ্ঞান হারিয়ে ফেলবেন। আজ আমি যাই
–আবার এসো ভাই, আসবে ঠিক? আমার পায়ে হাত দেওয়া কি ভাই? তুমিও তো কম নও। আমি তোমাকে চাই। এসো–আনন্দে থাকো ভাই।
মেয়েটির অব্যর্থ আশীৰ্বাদ। সত্যিই এক অপূৰ্ব্ব আনন্দের প্রসন্ন। হিল্লোল বয়ে গেল পুষ্পের মনে। এ জগতে ভয় নেই, অমঙ্গল নেই–মেয়েটি বলেছে, ভগবানের আশীৰ্বাদ রয়েছে বিশ্বের ওপরে।
ফিরে এসে বুড়োশিবতলার ঘাটে বসে সেদিন সন্ধ্যায় পুষ্প যতীনকে ওই অদ্ভুত মেয়েটির গল্প শোনালে।
সেদিন ফিরে আসবার পর আরও কিছুকাল কাটলো। বুড়োশিবতলার ঘাটে যে সংসার পেতেছিল পুষ্প, তাতে যেন ভাঙন ধরেচে। আজ সাত বছর আগে প্রথম যেদিন যতীন এখানে আসে, সেদিনটি থেকে পুষ্পের কত সাধ, কত আনন্দ, ছেলেবেলার সেই প্রিয় সাথীকে নিয়ে এখানে সংসার পাতবে। তাই অনেক আশা করে সাজিয়েছিল বুড়োশিবতলার ঘাটের সংসার।
ওপরের শ্যামাসুন্দরীর মন্দিরে আরতি-ঘণ্টাধ্বনি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্প আগে নিজেদের ঘরে প্রদীপ দেখায়, গৃহদেবতার সামনে সুগন্ধি ধূপ জ্বালিয়ে ফলফুলের অর্ঘ্য নিবেদন করে, মনে মনে দেবদেবীকে স্মরণ করে। রঘুনাথদাস ওকে একটি সুন্দর স্ফটিক-বিগ্রহ এনে দিয়েচেন, তিনি বলেন একজন শিল্পী মননশক্তি দ্বারা ভুবর্লোকের পদার্থে ইচ্ছামত রূপান্তর ঘটিয়ে এই সব দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করেন–এই লোকেরই চতুর্থ স্তরে কোথায় তিনি থাকেন। পুষ্প বলেছিল একদিন সেখানে গিয়ে দেখে আসবে।
কিন্তু কি জানি পুষ্পের ভাগ্যে কোথায় যেন কি গোলমাল আছে। সব মিথ্যে হয়ে যায় কেন? হঠাৎ আশা বৌদিদি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেচে।
সেই মুহূর্তেই পুষ্প টের পেয়ে গেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যতীন। তার কিছুই জানে না। যতীনের মুখের দিকে চেয়ে ওর কষ্ট হোল। আশা প্রারব্ধ কৰ্ম্মের ফলে ভুবর্লোকের কোন নিম্নস্তরে হয়তো ঘুরচে যতীনদার সঙ্গে দেখা হওয়া সম্ভব নয় এ অবস্থায়, পুষ্প এ সত্য বুঝেচে।
