–তাতে কি সসীম মানুষ তাঁর কোটি কোটি মায়িক রূপ ধারণা করতে পারবে না। একটিমাত্র সুন্দর রূপের ধ্যানে সিদ্ধিলাভ করুক। তাহোলেই তাঁকে পাবে তো?
–নিশ্চয়। এ তো হোল সহজ পথ। ভক্তির পথ সহজ পথ, নারীর পথ। জ্ঞানের পথ বীরের পথ, পুরুষের পথ–সে কথা তোমাকে তো আগেই বলেচি। ভগবানকে পাবে–ও পথেও, এ পথেও।
পুষ্প বল্লে–সেই সহজ সুন্দর পথের সহজ সুন্দর দেবতা শ্রীকৃষ্ণ যদি আমার মনের গোপন মন্দিরে বিরাজ করেন, তবে আমার জন্মমরণ। ধন্য হবে, দেব। জীবনের এপারে বা ওপারে আর কিছুই চাইনে।
এই সময়ে একটি সুন্দরী নারী সেখানে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখ অপূৰ্ব্ব দিব্যভাব পরিপূর্ণ। অঙ্গাকান্তি তরল জ্যোৎস্নারমত, বড় বড় চোখ দুটিতে অসীম সারল্য ও অন্তমুখিতা। মহাপুরুষ পুষ্পের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বল্লেন–এই সেই কন্যা। এর নাম সুমেধা ভারতবর্ষেরই কন্যা
পুষ্প প্রণাম করে বল্লে–দেবি, ভগবানের সম্বন্ধে কথা হচ্ছিল।
নারী হেসে বল্লেন–আমি সব শুনেচি-তাঁর স্বরূপ কি শুনবে? আমি খুব ভাল করে দেখেচি। তিনি বালকস্বভাব, পথের বাঁকে বসে থাকেন উৎসুক হয়ে, ধরা দেবার জন্যে। কিন্তু তাঁর পেছনে ছুটতে গেলে তিনি বালকের মত হেসে ছুটে দূরে পালিয়ে যান
যতীন অভিভূত ও মুগ্ধভাবে বলে উঠলোবাঃ মা, বাঃ, কি সুন্দর অনুভূতির কথা!
পুষ্পও মুগ্ধদৃষ্টিতে সেই অনিন্দ্যসুন্দরী লাবণ্যময়ী ভাবময়ী নারীর দিকে চেয়ে রইল। রুদ্ধনিশ্বাসে বল্লে–তারপর? তারপর?
–তারপর কি জানো? সেই সময় যদি তুমি হতাশ হয়ে ছুট দেওয়া বন্ধ করো–তবে ভগবান নিরাশ হবেন, দাঁড়িয়ে যাবেন, বালকের মত। তিনি চান জীব তাঁর পেছনে পেছনে খানিক ছোটে, হাঁপায়। ভগবান জীবের সঙ্গে বালকের মত খেলা করেই মহাখুশি। না থেমে তবুও ছুটলে ভগবান শেষে অকারণেই আবার ফিরে আসবেন, হাসতে হাসতে ধরা দেবেন। অতএব ভগবানকে নিরাশ কোরো না, তাঁকে একটু জীবকে নিয়ে খেলা করতে দাও–তিনি বড় একা—
দেবীর চোখ স্নেহে ও প্রেমে ছলছল করে উঠলো।
পুষ্প বল্লে–চমৎকার! আজ অতি সুন্দরভাবে বুঝলাম, সহজভাবে বুঝলাম। আপনার অনুভূতি সহজ বলেই সহজভাবে বুঝেছেন তাঁকে।
যতীনের মন পুষ্পের এ কথায় সায় দিলে।
ওদের সঙ্গী কিন্তু অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন উদাসীনের মত–যেন তিনি এসব ভাবালুতার বহু ঊর্ধ্বে জ্ঞান ও তপস্যার দৃঢ়ভূমির উপর স্বপ্রতিষ্ঠ।
যতীন ও পুষ্প তাঁকেও প্রণাম করে বিদায় প্রার্থনা করলে।
মেয়েটি ওদের হাসিমুখে বল্লে–আবার এসো তোমরা। আমি এখানে শীগগির উৎসব করবো-বনকুসুম-উৎসব। জনলোকের অনেক নারীপুরুষ আসে, সবাই বনফুলের মালা দেন আমার বিগ্রহের গলায়। আমি তোমাদের নিমন্ত্রণ পাঠাবো।
পুষ্প বল্লে–দেবি, কল্প-পৰ্ব্বতের সঙ্গীত শুনতে যান আপনি? আবার তো সেদিন আসছে। আপনার সঙ্গে দেখা হবে?
–আমি প্রতিবারই যাই। আমাদের গ্রামের সকলেই যায়। ভগবানের প্রতি অনুরাগ জন্মায় ওই সঙ্গীত শুনলে–ওত্যন্ত সূক্ষ্ম অনুভূতির দরজা খুলে যায় বলে অনেক উচ্চস্তরের নরনারী আসেন সেদিন। যেও সেখানে–আমিও যাবো।
গ্রামের প্রান্তে বনবীথির অন্তরালে একটি শুভ্র স্ফটিকের মন্দিরে মেয়েটি ওদের দুজনকেই নিয়ে গেল। সেখানে পা দিয়েই পুষ্প বুঝতে পারলে এ অতি পবিত্র স্থান–দেবতার আবির্ভাব দ্বারা এর অণু-পরমাণু ধন্য ও কৃতার্থ হয়ে গিয়েছে, এখানে এসেই তার মনে হোল এখানে। নির্জনে বসে ভগবানের চিন্তা ও ধ্যান করি। রঘুনাথ দাসের আশ্রমের মত এর পুণ্যময় প্রভাব।
মেয়েটি হঠাৎ বল্লে–সমুদ্র দেখবে ভাই?
পুষ্প অবাক হয়ে বল্লে–কোথায়?
–ওই দ্যাখো–
পুষ্প সত্যই দেখলে, সেই বনবীথির ওপারে বিশাল সুনীল মহাসাগর ঢেউ এর ওপর ঢেউ তুলে বহুদূরে দিগন্তে মিশে গিয়েছে– কোনো কূল নেই, কিনারা নেই। তার অনন্ত জলরাশির ওপর নীল মহাব্যোমের প্রতিচ্ছায়া–সে এক অদ্ভুত দৃশ্য, সমুদ্রতীরে এক শিলাখণ্ডে বিশালবৃক্ষতলে মেয়েটি ওর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে বসালে। পুষ্পের মনে হোল ওর সমস্ত সত্তা এই আনন্দ মহাসমুদ্রের কূলরেখা ধরে বহুদূর অনন্তে বিলীন হয়ে যাচ্চে, জগৎস্বপ্ন যেন লয় হয়ে যাচ্চে স্বসংবেদ্য আত্মানুভূতির শান্ত গভীরতার। মেয়েটি খিল খিল করে। হেসে উঠলো মুখে আঁচল দিয়ে। কি মধুর হাসি তার সুন্দর মুখের। বল্লে–কেমন ঠকিয়েচি ভাই?
পুষ্প বল্লে–সমুদ্র কোথা থেকে এল এখানে? আমিও তাই ভাবছি।
–সমুদ্রতীরে এই গাছতলায় বসলে তাঁর কথা বড় মনে হয়–তাই তৈরি করে রেখেচি।
–সব সময় থাকে?
–সব সময়। তবে অন্য কেউ আমার মনের ভূমিতে না পৌঁছুলে দেখতে পায় না। আমার কাছে সৰ্ব্বদাই সত্যি–অন্যের কাছে অবাস্তব।
–এ গ্রামের অন্য লোকের কাছেও?
–আমি ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না। তুমি ভাই ভালবাসবে বলে তোমাকে আমার ভূমিতে নিয়ে এসে দেখালাম। বলো ভালো?
–আপনাকে আমি কি বলে ধন্যবাদ দেবো জানিনে দেবী। কত ভালো যে লাগচে এই বন, এই পাথরের বেদী, এই নীল সমুদ্র এখানে ভগবানের আসাযাওয়ার পায়ের চিহ্ন আছে।
–আছেই তো। উনি যে আসেন লুকিয়ে আমার কাছে। জানো না ভাই?
মেয়েটির গলার সুরে পুস্পের মমতা জাগলো। শ্রদ্ধাও। এই শিলাস্তৃত সমুদ্রবেলায় দেবতার শুভঙ্কর আবির্ভাবের কথা লেখা রয়েছে। পুতুলখেলা হয়তো। হোক পতুলখেলা। সে নারী, এই তার ভাল লাগে।
