সুতরাং মিছিমিছি কেন যতীনদাকে আশার মরণের কথা জানিয়ে কষ্ট দেওয়া। পৃথিবীতে থাকলেও তারা যেমন কোনো সাহায্য করতে পারেনি, এখানেও ঠিক তেমনি অবস্থা দাঁড়াবে। এ-লোকেও নিম্নস্তরের অধিবাসী আশার কাছে সে ও যতীনদা যেমনি অদৃশ্য ছিল পৃথিবীতে থাকতে, তেমনিই থাকবে।
কিন্তু আশা কোথায় আছে একবার দেখা দরকার।
সেদিন সে রঘুনাথদাসের কাছে গেল, যতীনকে কিছু না জানিয়ে। দেখা পাবে কিনা সন্দেহ ছিল, কারণ এ সব মহাপুরুষ নিজের খেয়ালে থাকেন, আজ আশ্রম আছে, কাল নেই। সর্বপ্রকার মায়াবন্ধনের অতীত এঁরা। ভগবানের দেহে লয় না হয়ে ভক্তিসেবার জন্যে চিন্ময়। আশ্রমে চিন্ময় বিগ্রহ স্থাপন করে সেবামৃত আস্বাদ করছেন মাত্র। আজ আছেন কাল হয়তো নাস্তি। দেখাই যাক।
রঘুনাথদাস আচার্য্যকে তার বড় ভাল লাগে। প্রেমে স্নেহে বালকস্বভাব। বৃদ্ধ সাধু ঠিক যেন তার বাবার মত। আজ তার মনে হোল এ বিপদে এরই আশ্রয় নিতে হবে। অতি উচ্চস্তরে সাধুর আশ্রম, সেখানে পৌঁছানো তার পক্ষে সব সময় সহজও নয়–তবে ভগবানের কৃপা ভরসা।
আশ্রমটি একটি বিশেষ মণ্ডলের মধ্যে অবস্থিত। সাধুর আবাসস্থানের মাহাত্ম্যে দূর থেকেই পুষ্পের মনে এক অদ্ভুত ভাবের উদয় হোল–এ ভাব সে পূৰ্ব্বেও এখানে আসবার সময় গাঢ় ভাবেই অনুভব করেছে। সেই অপূৰ্ব আনন্দরস..বার বার জন্মমৃত্যুর আবৰ্ত্ত থেকে মুক্ত, কোন্ লীলাময়ের অনন্ত লীলারাজ্যে সে নিত্য অভিসারিকা চিরিযৌবনা প্রেমিকা…জগমণ্ডলের সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি হিরণ্যগর্ভের পার্শ্বচারিণী।
সেই শ্বেত স্ফটিকের দুগ্ধধবল গোপাল-মন্দিরটি দূর থেকে দেখেই পুষ্প উদ্দেশে প্রণাম করলে। মন্দিরের চারিপাশের পুষ্পবাটিকাতে কত ধরনের ফুল ফুটে আছে, পূৰ্ব্বপরিচিত এই সুন্দর লতাকুঞ্জটিতে রঘুনাথদাস বসে নামগান করছেন। এবার তিনি একা নন, দুটি বালক ও দুটি উদ্ভিন্নযৌবনা সুন্দরী কুমারী সেখানে বসে তাঁর সঙ্গে হাততালি দিয়ে গানে যোগ দিয়েচে। কেমন চমৎকার সুগন্ধ এখানকার! সেবারও এখানে আসতেই পুষ্প পেয়েছিল–অগুরু, চন্দন, সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়া, কত কি ফুলের সুবাস মিলে এই স্বর্গীয় সুগন্ধটার সৃষ্টি করেছে। আশ্চর্য, কোনো পার্থিব ধরনের বাসনা একেবারে থাকে না এই সুমধুর গন্ধময়, নিস্তব্ধ, চিরশান্তিময় পরিবেশের মধ্যে।
ওকে দেখে রঘুনাথদাস বল্লেন–এসো মা। আমি তোমার কথা ভাবছিলাম, বোসো।
পুষ্প ওঁকে প্রণাম করতেই আচার্য্য বল্লন–অপুনর্ভব হও।
বিস্ময়ে পুষ্প শিউরে উঠে বল্লে–কি বল্লেন আচার্য্যদেব! ওকি কথা?…জানেন–
তিনি হেসে বল্লেন–ঠিক বলেচি মা।
–আপনি তো জানেন, আমার বাসনা কামনা কিছুই এখনো যায়নি, পৃথিবীতে আমার যাতায়াত বন্ধ হোলে কি করে চলবে? বলুন আপনি। জন্ম এখন থেকেই বন্ধ হবে?
রঘুনাথদাস পুষ্পের গায়ে সস্নেহে হাত বুলিয়ে অনেকটা যেন আপনমনে সুর করে বল্লেন–
কিয়ে মানুষ জনমিয়ে পশুপাখী, অথবা কীটপতঙ্গে
করমবিপাকে গতাগতি পুনপুন মতি রহু তুরা পরসঙ্গে।
এমন দিব্য মধুর সুরের সে গান, বিদ্যাপতির বাণী যেন মূর্ত হয়ে উঠলো সুগায়ক রঘুনাথদাসের কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে।
তারপরে পুষ্পকে বল্লেন–যাও, গোপালকে দেখা দিয়ে এসো। বড় অভিমানী–সামলে রাখতে হয়।
পুষ্প হেসে বল্লে–ওসব আপনার সঙ্গে, কই আমাদের সঙ্গে তো কোনোদিন একটা কথাও–
–হবে। দেখতে পাচ্চি মা, দেখতে পাচ্ছি। গোপালের চিহ্নিতা সেবিকা তুমি। সাধে কি বলেচি অপুনর্ভব হও। আমার মুখ দিয়ে মিথ্যা বার হয়নি।
–আপনি বুড়ো দাদু হয়ে বসে আছেন, দিন দিন ছেলেমানুষ হচ্চেন কেন? ও রকম বল্লে মায়ের অপরাধ হয় না?
বৃদ্ধ প্রসন্নমুখে বলেন–ঠিক মা ঠিক। যাও দেখে এসো–
একটু পরে পুষ্প আবার এসে তাঁর কাছে বসলো। এখানে সে কিজন্যে এসেছিল, তা যেন ভুলে গিয়েছে। এ পবিত্র আশ্রমে বসে কি করে ঐ সব কথা বলবে! হয়তো শেষ পর্যন্ত বলতে পারতো না, কিন্তু রঘুনাথদাসই বল্লেন–তোমাকে অন্যমনস্ক বলে মনে হচ্চে কেন?
–আপনি অন্তর্যামী, সব জানেন। লজ্জা করে আপনাকে মুখে বলতে–
রঘুনাথ কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসে রইলেন চোখ বুজে। তারপর গম্ভীরভাবে বল্লেন–কি চাও মা?
–সেই হতভাগীর সঙ্গে দেখা করতে বড় ইচ্ছে হয়। কি ভাবে আছে, যদি কোনো উপকার করতে পারি।
–সেই মেয়েটি প্রেতলোকে রয়েছে। তার চোখ খোলেনি, মনও অপরিণত। তার ওপর আত্মহত্যা-রূপ মহাপাপের ফলে প্রকৃতি একটা প্রতিশোধ নেবে।
–-একবার দেখা হয় না?
–সে কোথায় আছে জানি না? ভুবর্লোকের নিম্নস্তর, যাকে সাধারণত নরক বলে থাকে পৃথিবীর ভাষায়–সে অনেক বড় জায়গা। তারও আবার অনেক স্তর আছে–চলো দেখি–
–প্রভু আমার সঙ্গে তার একভাবে খানিকটা যোগ আছে, সুতরাং আমি গেলে তাকে বার করা সহজ হবে।
–ওসব না। সে মেয়েটি পৃথিবীর যে গ্রাম থেকে এসেছে–তারই নিকটবর্তী কোনো নিম্নলোকে ভ্রাম্যমাণা। স্থূল ধরনের বাসনা কামনা নিয়ে পৃথিবীর আকর্ষণ ছেড়ে ঊর্ধ্বলোকে ওঠা অসম্ভব।
একটু পরে পুষ্প রঘুনাথদাসকে নিয়ে প্রথমে এল কুড়লে বিনোদপুর, সেখানে কোন সন্ধান না পেয়ে গেল আশার বাপের গ্রাম রসুলপুরে। কয়েকটি নিম্ন শ্রেণীর ধূসরবর্ণের আত্মা গ্রামের বাঁশবনে, তেঁতুলগাছের ডালে, মাঠের মধ্যে বাবলা গাছে পা ঝুলিয়ে বসে হাওয়া। খাচ্চে। একটি দুষ্ট আত্মা গ্রামস্থ ব্রাহ্মণপাড়ার পুকুরপাড়ের এক নোনা গাছে বসে স্নানরতা স্ত্রীলোকদের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। প্রায় তুরীয় অবস্থায়। পুষ্প মনে মনে হেসে বল্লে–দ্যাখো পোড়ারমুখোর কাণ্ড! ইচ্ছে হয় গালে এক চড় বসিয়ে দিয়ে আসি-হাঁ করে যেন কি গিলচে–হি-হি–
