যতীন বল্লে–এটা কোন্ লোক?
–মহর্লোকের প্রথম স্তর। ভুবর্লোকের অধিবাসীদের পক্ষে এখানকার বাড়ীঘর, মানুষ, বন, পৰ্বত সব অদৃশ্য। আমার অবস্থার আত্মা না হোলে আমার এ গৃহে আমাকে পাবেই না। মহর্লোক কোনো একটা স্থানও বটে, বিশেষ একটা অবস্থাও বটে। স্থান ও অবস্থার একত্র যোগ না ঘটলে এ লোকে চৈতন্য জাগরিতই হবে না যে। তা নয়, তোমাদের মধ্যে একজন কেউ উচ্চ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েচ, নইলে এখানে। আসতে পারতে না।
–সে এই মেয়েটি। আমি নই–
পুরুষটি হেসে বল্লেন–আমিও তা অনুমান করেচি।
পুষ্প সলজ্জ প্রতিবাদের সুরে বল্লে–আমি কি-ই বা-ওঁর জন্যেই—
যতীন বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলে–আপনি পৃথিবী চেনেন তো স্যার?
–আমি আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীর অধিবাসী ছিলাম। সেই আমার শেষ জন্ম। সেবার ছিলাম গ্রীসে, তাঁর পূর্বে দুই জন্ম ভারতবর্ষে ও একজন সুপ্রাচীন মিশরে কাটাই।
–তার পূৰ্ব্বে?
–তার পূৰ্ব্বে পৃথিবীতে ছিলাম না। অন্য গ্রহে সৌর-জগতে বহু জন্ম নিয়েচি। কত অদ্ভুত গ্রহ আছে, অদ্ভুত জীবকুল আছে। বিচিত্র লীলা ভগবানের।
হঠাৎ পুষ্প বল্লে–আপনি ভগবানকে দেখেছেন, দেব?
–না?
–আপনি বিশ্বাস করেন তিনি দেখা দেন?
–না।
–আশ্চর্য্য! ভগবানে বিশ্বাস করেন না?
–তাঁর কোন রূপে আমার বিশ্বাস নেই, এই কথা বলছি। ভগবানকে তোমরা যে চোখে দ্যাখো, আমরা সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখি। তিনি অচিন্ত্যনীয় মহাশক্তি, বিশ্বব্রহ্মান্ডের সর্বত্র বিরাজমান। দেহধারী হয়ে দেখাও দেন, আমার এই গ্রামের একটি মেয়ে প্রায়ই তাঁর দেখা পায়।
পুষ্প আশ্চর্য হয়ে বল্লে–তবুও আপনি বিশ্বাস করেন না?
–যে যেভাবে কল্পনা করে, তাকে সেইভাবেই তিনি দেখা দেন। এতে আমি বুঝি, এই তোমরাই আমার ভগবান হতে পার। নিত্যমূর্তি কি আছে তাঁর? সবই তাঁর মূর্তি–এই গাছপালা, এই বনভূমি, এই তুমি মেয়েটি–ঐ অনন্ত আকাশ, ব্রহ্মাণ্ডকুল–
কথা বলতে বলতে ভক্তি, জ্ঞান ও পবিত্রতার জ্যোতিতে তাঁর মুখের শ্রী হোল অপূৰ্ব্ব, তীক্ষ্ণ নীল আলোক বড় বড় চোখ দিয়ে কখনো ঠিকরে বেরুতে লাগলো–কখনো শান্ত হয়ে আসতে লাগলো। ভগবানের কথায় তাঁর কণ্ঠস্বর ভক্তিতে আপ্লুত হয়ে এল।
পুষ্প তার ভাল বুঝে বল্লে–আমায় ক্ষমা করুন দেব, আমি বুঝতে পারিনি আপনাকে আপনি তাঁকে ভক্তি করেন।
যতীন বল্লে–পৃথিবীতে বহুদিন যান নি?
–পৃথিবীর বসন্তকালে পাহাড়ে পাহাড়ে বনে বনে ফুল ফোটে, সেই সময় পৃথিবীর মহাঅরণ্যে পৰ্বত-সানুতে নদীতীরে বেড়িয়ে দেখে আসি। কখনো কোনো অসহায়া নারীর দুঃখ দেখি কোনো জনপদে, তার দুঃখ মোচন করবার চেষ্টা করি। নীলনদীর জ্যোৎস্নারাত্রে নির্জনতটে বসে ভগবানের ধ্যান করি। শুধু পৃথিবী নয়, বহু গ্রহে এমনি আমাদের যাতায়াত।
–আপনি যা করছেন, শুধু আপনাদের মত উচ্চলোকের অধিবাসীরাই তা করতে পারেন। আচ্ছা, পৃথিবীর মানুষের কর্তব্য কি?
–প্রেম–এক ওর মধ্যেই সব।
–আপনি একথা পৃথিবীতে প্রচার করেন না কেন?
-কতবার প্রচার করা হয়েছে। আমার চেয়ে উচ্চতর ও শক্তিধর দেবতারা মানুষের দুঃখে পৃথিবীর শত কষ্টের মধ্যেও দেহ ধরে একথা বলতে গিয়েছিলেন। স্বয়ং ভগবান অবতার গ্রহণ করে নেমে গিয়েছেন বলতে। প্রেম–একটি কথা। কেউ শোনেনি।
–তাহোলে কি আপনারা হাল ছেড়ে দেবেন?
–অদ্ভুত চরিত্র ভগবানের। বার বার সুযোগ দেন। বিরক্ত হন। না। অপূৰ্ব্ব তাঁর ধৈৰ্য্য, অপূৰ্ব্ব তাঁর ক্ষমা। অন্য কেউ হোলে আর সুযোগ দিত না–কিন্তু নাছোড়বান্দা তিনি। আবার লোক পাঠান অদ্ভুত ধৈর্য্যের সঙ্গে। তোমাদের পৃথিবীতে ভগবানের তুল্য অবহেলিত প্রাণী আর কে? কেউ তাঁর কথা ভাবে না।
এই পর্যন্ত বলেই অপূৰ্ব্ব ঈশ্বরীয় প্রেমে মহাপুরুষের চোখ দুটি নক্ষত্রের মত জ্বল জ্বল করতে লাগলো। পুষ্প শ্রদ্ধায় উৎসাহে উদ্দীপ্ত হয়ে বল্লে–আপনি ঠিক বলেচেন দেব, পৃথিবীতে কেউ ভাবে না ভগবানের কথা। যে ভাবে সেও টাকা চায়, যশ চায়, সাংসারিক সুখ চায়। প্রেমভক্তি দুর্লভ হয়ে পড়েছে।
মহাপুরুষ বল্লেন–প্রেমভক্তি ছেড়ে দাও। ও অনেক উঁচু কথা। অতি সাধারণ ভাবে ক’জন ভগবানের চিন্তা করচে। আমি পৃথিবীতে যাই, জনপদে বা তোমাদের বড় বড় নগরে যাই না। দুর্নিবার লোভ, অর্থাসক্তি, ঐশ্বৰ্য-কামনা, নারী, সুরা, কাম, হিংসা-দ্বেষ বাতাসে ছড়ানো ঘন ধোঁয়ার মত। ভাই ভাইএর বুকে ছুরি বসাচ্চে। সত্য বিদায় নিয়েছে। পৃথিবীর এখনকার দর্শন হচ্চে খাওয়া-পরার দর্শন। কিসে ভাল খাব, ভাল পরবো। আমি আপন মনে মরুভূমিতে বেড়াই জ্যোৎস্নারাত্রে, হিমালয় কি অন্য কোন পর্বতচূড়ায় বসে থাকি, নীল নদ বড় ভালবাসি তার-তীরে একা বসে থাকি। অথচ এক কথা– প্রেম, এই যদি ওরা শিখতো,–জীবে প্রেম, ভগবানের প্রেম!
তিনি এই পর্যন্ত বলে চুপ করতে পুষ্প বল্লে–বলুন দেব, অমৃতের মত বাণী আপনার।
–আমার? আমার কিসের কন্যা? এ বাণী স্বয়ং ভগবানের। তিনি অনেক উঁচু তাই মানুষের দেহ ধরে পৃথিবীতে গিয়ে একথা বলে। এসেছিলেন। কেন না মানুষের দেহ ধরে না গেলে মানুষের সাধ্য কি যে অসীমকে গ্রহণ করে? একবার নয়, বার বার গিয়েছিলেন। ক্লান্তিহীন তাঁর আশীৰ্বাদ। কিন্তু কে শুনচে? ধনজনের মোহে, বিলাসের মোহে–স্কুল ভোগের মোহে সবাই উন্মত্ত। একবারও যদি নির্জনে। উচ্চতর সত্যের ধ্যান করতো মানুষে।
