একজন ডেকে বল্লে–প্রমীলা,-টুসু-খাবার দিয়ে যাও।
দু’তিনবার ডাকের পর একটি সুন্দরী রমণী ঘুমু-ঢলঢল চোখে একটা বড় প্লেটে কতকগুলো কাটলেট নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে বল্লেনাও সব–রাত কম হয়নি, আমার ঘুম পেয়েছে–কাল আবার হাসপাতালের ডিউটি সকাল থেকে শুরু–
একজন বল্লে–সোড়া ফুরিয়েছে–টুসু। লক্ষ্মীটি, একটা সোডা আমাদের যদি দিয়ে যাও
আর একজন বল্লে–অমনি ওই সঙ্গে গোটাকতক পান–
সুন্দরী মেয়েটি রূপে ঘর আলো করেচে। ওর পরনে দামী সিল্কের শাড়ী, কাজ করা ব্লাউজ, অনাবৃত কণ্ঠদেশ, বক্ষঃস্থলে জড়োয়ার কাজ করা নেকলেস্ চিক্ চিক্ করচে। সে যেতে যেতে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কৌতুক-মিশ্রিত সুরে বল্লে–পারবো না এত রাত্রে পান সাজতে বসতে
পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের সেই লোকটি কপট মিনতির সুরে বল্লে–আমার। দু’হাত বন্ধ, মুখের সিগারেটটা ধরিয়ে যদি দিয়ে যেতে টুসু–
যতীন সেখানে আর দাঁড়ালো না। পুষ্পকে এসে বল্লে–তাস খেলচে। তাসের জুয়ো–টাকা জিতচে।
পুষ্প বল্লে–একবার দেখে এসেচি জানালা দিয়ে। ওরা অবস্থাপন্ন ভদ্রলোক দেখে মনে হয় টাকার ভাবনা নেই–অথচ টাকার এমন নেশা?
–তুমি এসব বুঝবে না পুষ্প। টাকার নেশা নয়, জুয়োর নেশা–
–ঐ হোল। ওই মেয়েটি কে?
–মেয়েটি টুসু। ভাল নাম যেন প্রমীলা–
পুষ্প হেসে বল্লে–তা তো বুঝলাম, ওদের কে? কি সম্বন্ধ ও বাড়ীর সংসারে?
যতীন কিছু বল্লে না, সরলা পুষ্প কত কথা জানে না সংসারে। ওর নিষ্পাপ মনে–দরকার কি?
পুষ্প আপন মনেই যেন বল্লে–কিন্তু ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ওর মধ্যে কেন? ওঁকে দেখে কষ্ট হয়। এখনও ভোগের নেশা এত! পরকালের চিন্তা করবার সময় হয়নি আজও?
–তোমার মত সবাই হবে? বাদ দাও না, বাজে কথা বলো কেন?
পুষ্প দুঃখিত কণ্ঠে বল্লে–আমার বাবার মত দেখতে। সত্যিই কষ্ট হোল। ভগবানের দিকে মন দেবার ওঁর সময় যে পার হয়ে গেল!
–তোমার তাতে কি? বড় বাজে কথা তোমার পুষ্প–
–আশাবৌদি ঘুমিয়ে পড়ছে।
–কি হবে ওর পুষ্প? সত্যি কথা বল। তুই আমার চেয়ে অনেক বেশি দেখতে পাস্।
–দেখতে পাই কে বলেছে?
–আমি সব জানি–
পুষ্প গম্ভীর সুরে বল্লে–কেউ কিছু নয়। মানুষের মিথ্যে অভিমান। তিনি যা করবেন, তাই হবে। তাঁর কাছে প্রার্থনা করি এসো দুজনে।
–এখানে?
–এখানেই। তাঁর নামে সব পবিত্র হয়ে যাবে। তিনি এখানেই কি নেই? কে বলেচেন নেই? তিনি তাঁর অসীম কৃপা ও করুণায় এই হতভাগিনী আশাবৌদির মঙ্গল করুন।
করুণাদেবীর বিনা সাহায্যেও আজকাল পুষ্প মহর্লোকের সর্বত্র যাতায়াত করতে পারে, এমন কি আরও উৰ্দ্ধতর লোক পর্যন্ত। যতীনকে অত উচ্চস্তরে কোনো শক্তিমান আত্মার বিনা সাহায্যে নিয়ে। যাওয়া সম্ভব নয় বলে পুষ্প অনিচ্ছাসত্ত্বেও একাই মাঝে মাঝে যায়। সে বলে এতে অনেক কিছু সে দেখে, শোনে ও শেখে। অনেক ভাল ভাল আত্মার সংস্পর্শে এসে মানসিক ও আত্মিক শক্তির প্রসার হয়।
সেদিন যতীন ছাড়লে না, বল্লে–আমি যদি উচ্চস্তরে অজ্ঞান হয়ে পড়ি তুমি সেখানে আমাকে ফেলে যেও। যতদূর জ্ঞান থাকে ততদূর নিয়ে যাও না? আমিও বেড়িয়ে দেখতে, জানতে ভালবাসি না কি ভাবছো? রেলভাড়ার টিকিট তো লাগছে না।
–দ্যাখো যতু-দা, এখনও পৃথিবীর ওই উপমা ও চিন্তার ধরনটা ছেড়ে দাও। তোমায় এই জন্যেই বারণ করি বার বার পৃথিবীতে যেতে। ওখানে নানা আসক্তি, ইচ্ছা, ভোগপ্রবৃত্তি সৰ্ব্বত্র ছড়ানো রয়েছে পৃথিবীর আকাশে বাতাসে। স্থূল দেহ ভিন্ন ওই সব ইচ্ছা পূরণ করা যায় না। স্থূল জগতের স্থূল প্রবত্তি সূক্ষ্ম দেহে কি করে চরিতার্থ করবে? কাজেই ওই সব আসক্তি যেমন তোমার মনে আসন গেড়ে বসবে, তখনই তোমাকে ভুল দেহ ধারণ করতে বাধ্য করবে। সুতরাং আবার পুনর্জন্ম।
–তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই তোমার মত।
–সে আমি জানি। সেজন্যেই তো তোমার জন্যে ভয় হয়–চলো তোমাকে মহর্লোকে নিয়ে যাই
ওরা ব্যোমপথে অনেক ঊর্ধ্বে উঠে এমন এক স্থানে এল, যেখানে উচ্চলোকের জ্যোতির্ময় অধিবাসীদের যাতায়াতের পথ। তার পরেই এক অদ্ভুত সুন্দর দেশ; অতি চমৎকার বনপৰ্ব্বতের মেলা, বনকুসুমের অজস্রতা। অথচ এখানে কোনো অধিবাসী নেই, অনেকদূর গিয়ে একটা নীল হ্রদ, চারিদিকে পাহাড়ে ঘেরা। পুষ্প বল্লে–চলো যতুদা, ওই হ্রদের ধারে বনের মধ্যে একটি গ্রাম আছে, অনেক জ্ঞানী মেয়ে পুরুষ একসঙ্গে বাস করেন–তোমায় দেখিয়ে আনি।
বনবীথির অন্তরালে শুভ্র স্ফটিকসদৃশ কোনো উপাদানে তৈরী একটি বাড়ী, দেখতে অনেকটা গ্রীক মন্দিরের মত। হ্রদের নীলজলের এক প্রান্তে কুসুমিত লতাবেষ্টিত এই সুন্দর গৃহটি যতীনের এত ভাল লাগলো! এমন সুন্দর পরিবেশ আর্টিস্টের কল্পনায় ছাড়া যতীন অন্তত পৃথিবীতে কোথাও দেখেনি। আপন মনেই সে বলে উঠলো–কি সুন্দর!
একজন সৌম্যমূৰ্ত্তি পুরুষ ঘরের মধ্যে বসে। কিন্তু ঘরের আসবাবপত্র সবই অপরিচিত ধরনের। পৃথিবীতে ব্যবহৃত কোনো আসবাব সে ঘরে যতীন দেখলে না। লোকটিকে দেখেই মনে হোল অনেক উচ্চ অবস্থার আত্মা ইনি। ওদের অভ্যর্থনা করে বসিয়ে তিনি বল্লেন– তোমরা কোথা থেকে আসছো?
যতীন বল্লে–ভুবর্লোকের সপ্তম স্তর থেকে।
তিনি বিস্মত হয়ে বল্লেন–না, তা কেমন করে হবে? তা হোলে তো আমাদের এই জনপদ, এই ঘরবাড়ী বা আমাকে কিছুই দেখতে পেতে না? নিশ্চয় তোমরা উচ্চতর স্তরের অধিবাসী।
