যতীন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। আজ এখানে আসা তার সার্থক হয়েছে বটে। সে বল্লে–তবে কি তাদের উদ্ধার নেই, দেব?
–একটা কথা মনে রেখো। জোর করে মানুষের ওপর কোনো সত্য, কোনো বাণী চাপানো যায় না। মানুষে তৈরী না হওয়া পর্যন্ত ভগবানের বাণী অন্তরালে ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করে। বুদ্ধিহীন বা স্থূলবুদ্ধি ভোগাসক্ত মন হঠাৎ ভগবানকে গ্রহণ করতে পারে না। পারলেই যে মুক্তি–যে ভগবানকে ভালবাসে, সে ভগবানের সমান হয়ে যায়। এত সহজে তা হবে কোথা থেকে? কাজেই মহাযুগ মন্বন্তর চলে যায় স্বাভাবিক নিয়মে মানুষের মুক্তি পেতে। স্বারোচিষ মন্বন্তরে যারা মানুষ হয়ে জন্মেছিল পৃথিবীতে সর্বপ্রথম–এইবার তারা মানব আবৰ্ত্ত কাটিয়ে দেবযান-পথে মহর্লোকে যেতে শুরু করচে! ওদের এতদিন পরে পৃথিবীতে গতাগতি শেষ হোল।
–এর চেয়ে আগেও হয়?
–তুমি বুঝলে না–এ তো হোল স্বাভাবিক নিয়মে, লক্ষ্য বৎসর পরে। এক জন্মেই মুক্তি হয়–যদি সত্যের জন্যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগে, ভাগবৎপ্রেমে বহ্নিশিখা জলে ওঠে মনে। এদের জন্যে ভগবান কত সাহায্যের ব্যবস্থা করেছেন, তা যদি জানতে! যে সত্যকে জানতে চায়, ভগবান তাকে জানবার সব রকম সুযোগ দেন। চলো তোমাদের একটা জিনিস দেখিয়ে আনি।
–ক’দিন থেকে আমি দেখছি তোমাদের পৃথিবীতে–
যতীন ও পুষ্পকে নিয়ে সেই উচ্চলোকের পুরুষটি চক্ষের নিমিষে পৃথিবীতে নেমে এলেন। সুন্দর জ্যোৎস্নারাত্রি পৃথিবীতে, ভারতবর্ষে। যে নদীতীরে এসে ওঁরা দাঁড়ালো, সে নদীটি খরস্রোতা, তীরে শস্যক্ষেতের মধ্যে একজায়গায় বড় একটা গাছ। পুষ্প ও যতীন নদীটি চিনতে পারলে না। বৃক্ষের তলে একটি তরুণ যুবক ধ্যানমগ্ন। যুবকের রং টকটকে গৌর মুখের চেহারা লালিত্যপূর্ণ বেশ বড় বড় চোখ–কিন্তু এই অল্প বয়সেই সে দাড়ি রেখেচে রেশমের মত নরম, চকচকে দাড়ি। যতীনের মনে হোল যীশুখ্রীষ্টের ছবির মত মুখোনা ওর দেখতে।
পুষ্প জিজ্ঞেস করলে–এ কি নদী দেব?
–এ রাভি নদী। এটি ভারতবর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশ। ছেলেটির বাড়ী ওই জনপদে, সবাই ঘুমলে গভীর রাত্রে নদীতীরে বৃক্ষতলে ও রোজ একা এসে ভগবানের চিন্তা করে, গান করে আপন মনে। ওই দেখো ওর মা খাবার দিয়ে যায় এ সময়–আসছে–
একটি মেয়ে মেয়েটি প্রৌঢ়া বটে, কিন্তু সুন্দরী–দূরের গ্রাম থেকে একটা পাত্রে খাবার নিয়ে এসে ছেলেটির সামনে রাখলে। জিজ্ঞেস করলে–বাড়ী যাবি?
ছেলেটি বল্লে–তুমি যাও মা, আমি এক ঘণ্টা পরে যাবো।
–ঠাণ্ডা লাগানে বেশি, বাচ্চা।
ওর মা সস্নেহে ছেলের দিকে দু’তিন বার চেয়ে যে-পথে এসেছিল সেই পথে চলে গেল এবং অতি অল্পক্ষণ পরে এক অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়লো যতীন ও পুষ্পর। আকাশপথ আলো হয়ে উঠলো ক্ষণকালের জন্যে এবং সেই আলোর রেখা ধরে এক দিব্য জ্যোতির্ময় পুরুষ নেমে এসে ওই ধ্যানরত যুবকের পাশে দাঁড়লেন। আগন্তুক দেবতার রূপে ও দেহজ্যোতিতে স্থানটি যেন আলো হয়ে উঠলো, যদিও যুবকটি তার কিছুই বুঝতে পারলে না।
পুষ্প ও যতীন সবিস্ময়ে বল্লে–উনি কে?
–উনি সত্যলোকের প্রাণী। পৃথিবীতে ওঁরা তো দূরের কথা, আমাদেরই আসতে কষ্ট হয়, অথচ দ্যাখো ওই সত্যপ্রিয় ভগবদ্ভুক্ত যুবকটিকে প্রেরণা দিতে নিজে এসেছেন। যেখানে ভগবানের নামগান হয় সেখানে ভগবান স্বয়ং আসেন–এ তোমরা অবিশ্বাস করো না।
তারপরে ওরা তিনজনেই দূর থেকে সত্যলোকের সেই মহাপুরুষকে প্রণাম করলে। তিনি ওদের দিকে চেয়ে সদয় হাস্য করলেন ও দুটি আঙুল ওপর দিকে তোলার ভঙ্গিতে আশীৰ্বাদ করলেন। পুষ্পর চোখে জল এল। কি সুন্দর রূপ দেবতার।
পরক্ষণেই তিনি অন্তর্হিত হয়ে গেলেন।
পুষ্পদের সঙ্গী পুরুষটি বল্লেন–দেখলে? নীলনদের তীরে বহু হাজার বৎসর পূৰ্ব্বে যাপিত আমার একটি গোপন রাত্রির কথা আজও আমার মনে হয়। একা ছিলাম সে রাত্রে। বসন্তকাল ছিল, পুষ্পিত হয়ে ছিল নদীতলের ওষধি ও বনতরুরাজি–ক্ষুদ্র একটি পৰ্ব্বতের চূড়ায় নদীর অপর পারে আমি জ্যোতির্ময় আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করি। আমার সারাজীবন পরবর্তিত হয়ে যায়–দশ জন্মের প্রগতি একজন্মে সাধিত হয়। ভগবানের কৃপা নইলে হয় কি? কিন্তু তার জন্য ক্ষেত্র তৈরী হওয়া দরকার। পরকে ভালবাসো, জীবকে সেবা করো। আসক্তি ত্যাগ করো। ভগবানে মন দাও। মনের কুয়াশা না কাটলে সত্যের আলোকপাত কি হয়?
–আপনারা দয়া করুন পৃথিবীর জীবকে–তাহোলেই হবে।
–আমার ইচ্ছা আছে, আর একবার পৃথিবীতে দেহধারণ করবো। যা পারি প্রচার করে করে আসি।
–পৃথিবীতে গিয়ে ভুলে যাবেন না?
–দেহ ধরলেই বিস্মৃতি আসে। তবে তার ব্যবস্থা আছে। অন্য দিব্য পুরুষেরা গিয়ে আমায় বাল্যে ও যৌবনে নানাভাবে মনে করিয়ে। দেবেন। ওঁরা দেখা দিতে পারেন আমায় স্বপ্নে কি বা রাত্রিকালে, নয়তো ঘটনার এমন যোগাযোগ ঘটাবেন যে আমার আত্মা ক্রমশ জেগে উঠে বুঝতে পারবে পৃথিবীতে সে কেন এসেচে; ভোজ খেতে, নারী ও সুরা নিয়ে আমোদ করতে আসেনি। ভগবানের বিশ্বে এসবের। ব্যবস্থা আছে–যে ভাল কাজ করতে চায়, তাকে সাহায্য দেওয়া হয়। তিনি যে বিরাট মহাশক্তি, সেই শক্তিকে তুষ্ট করতে পারলে জীব পলকে প্রলয় করতে পারে, অসাধ্য সাধন করতে পারে, মহাশক্তির সদয় সাহায্য সে পায়। এ রহস্য কে বোঝে? পৃথিবীতে সবাই অর্থ নিয়ে ব্যস্ত, সৰ্ব্বত্র অনুপ্রবিষ্ট এই করুণাময়ী মহাশক্তির রহস্যভেদ করতে ব্যস্ত ক’জন?
