যতীন বল্লে–আপনি শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়ান কেন, দেব?
–কেন বলো তো?
–আজি আপনাকে যে চোখে দেখলাম–অনুগ্রহ করে কিছু মনে করবেন না স্যার–মানে–মানে–
পুষ্পের ভ্রূকুটি ওকে নির্বাক করে দিলে।
দেবতা নিজেই বোধ হয় ওর মন বুঝে জবাব দিলেন।
–এই ভ্রমণই আমার উপাসনা। কত সৌন্দর্য দেখেচি, কত ভয়ানক রূপ দেখেচি তাঁর–যেমন তোমরা আজ দেখলে। এও কিছু নয়–এর চেয়ে অতি ভীষণ রূপ আছে সৃষ্টির। সে সব সহ্য করতে পারবে না। তোমরা। আমি এর মধ্যেই তাঁকে দেখি।
যতীনের চেয়ে পুষ্পের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা বেশি, সে বল্লে–প্রভু, আপনি তাঁকে দেখেছেন?
ওরা একটা অপরিচিত গ্রহের নিকট দিয়ে যাচ্ছিল, আকাশপথ থেকে তার বিচিত্র ধরনের গাছপালা, পাহাড়-পর্বত সব দেখা যাচ্ছিল। গ্রহে তখন রাত্রি গভীর। লোকালয় বড় কম তাতে, কেবলই ভীষণ। অরণ্যানীসমাচ্ছন্ন শৈলমালা ও উপত্যকা। ওর একটা সাথী উপগ্রহ থেকে নীল জ্যোৎস্না পড়ে সে সব এমন একটা সৌন্দর্য্যে ভূষিত করেচেপৃথিবীতে কেন, এ পর্যন্ত স্বর্গলোকেও সে রকমটা দেখেনি ওরা। অপার্থিব তো বটেই, অদৈবও বটে। বনে বনে নীল জ্যোৎস্না– মুগ্ধ হয়ে গেল ওরা সে গ্রহের গভীর রাত্রির নীলজ্যোৎস্নাস্নাত গভীর। উঙ্গে শৈলারণ্যের রূপে।
দেবতা বল্লেন–কি দেখছো? এ একটা জীবজগৎ। খুব উঁচু স্তরের জীব এতে বাস করে। চলো, এর বনের মধ্যে বসি। তোমাদের পরিচিত স্থল জগৎ থেকে বহু জন্মের পর যখন লোকের মন তাঁর দিকে যায়, তখন তারা এখানে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে। শুধু তোমাদের পৃথিবী থেকে নয়–ওই ধরনের আরও অনেক নিম্নস্তরের স্থূল জগৎ থেকে। আত্মার সেই বিশেষ অবস্থা না হোলে এই সব গ্রহে আসা। চলে না। এখানে কর্মবন্ধন কম। ভগবানে যারা আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের মন বুঝে অন্তর্যামী বিশ্ব-দেবতা এখানে–এবং আরও এর মত বহু গ্রহ আছে, সেই সব লোকে–জন্মগ্রহণ নির্দেশ করেন। দেখচো না এখানে জীবের বসতি কম। ভিড় নেই। জীবনের যুদ্ধ সরল ও সহজ। সব রকম ভ্ৰম, কুসংস্কার অজ্ঞানতার বাঁধন যারা কাটিয়েছে, তারাই এখানে আসে শেষ জন্মের জন্যে। আর স্থূল শরীর গ্রহণ করতে হয় না তাদের এখানকার মৃত্যুর পর।
–তাহোলে পৃথিবীর লোকে পুনর্জন্ম গ্রহণ করে শুধু যে পৃথিবীতেই ফিরে আসবে তা নয়?
–পৃথিবীর সঙ্গে আমার পরিচয় কম–তবুও আমি জানি, কোনো জীবাত্মা পুনর্জন্মের সময় সে যে-স্থলজগৎ থেকে এসেছিল, সেখানেই জন্মাবে–তার কি মানে আছে! অবস্থা অনুসারে জীবের গতাগতি নির্দিষ্ট হয়। যেখানে পাঠালে যে উন্নতি করতে পারবে, তাকে সেখানেই পাঠানো হয়। অনন্ত উন্নতিতে জীবাত্মার অধিকার তিনিই দিয়েছেন, যিনি এই বিশ্ব রচনা করেছেন। কে বুঝবে তাঁর করুণা ও মৈত্রী! খুব উচ্চ অবস্থার আত্মা না হোলে বোঝা যায় না!
ছায়াশীতল শিলাতট ঘন বনশ্রেণীতে ঘেরা। ওরা এসে সেখানে বসেচে। যতীন আর পুষ্প চেয়ে চেয়ে দেখলে এসব গাছপালা তাদের চেনা নেই, পৃথিবীতে এত বড়, এত অদ্ভুত চমকার তরুশ্রেণীর সমাবেশ কোথায়? উগ্র লোভ এখানকার বন নষ্ট করেনি, ব্যবসাতে টাকা উপার্জনের জন্যে। বনকুসুমের সুগন্ধ, ঝর্ণার কলধ্বনি, পক্ষী-কূজন, অব্যাহত শান্তি ও পবিত্রতা–সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন তপোবনের মত মনে হচ্চে। উনি যা বলচেন সে হিসেবে দেখলে সমগ্র গ্রহটাই তাহোলে একটা সুবিশাল পোবন। পুষ্প সময় বুঝে আগের প্রশ্নটি এখানে আবার করলে। বল্লে–আপনি তাঁকে দেখেচেন প্রভু?
পথিক দেবতার মুখ সহসা সম্ভমে ও ভক্তিতে কোমল হয়ে এল। তিনি বালকের মত সরল স্বরে বল্লেন–না!
–আপনিও দেখেন নি তাঁকে!
পুষ্পের স্বরে বিস্ময় ফুটে উঠেছে।
–আমি তাঁর রূপ দেখেচি তাঁর বিশ্ব-সৃষ্টির মধ্যে। তাঁকে চোখে দেখা যায় আমি জানি। কিন্তু আমি তপস্যা করিনি তাঁকে সে ভাবে পেতে। আমি ভবঘুরে, তাঁকে দেখে বেড়াতে চাই তাঁরই সৃষ্ট লোক লোকান্তরে। ভ্রাম্যমাণ আত্মা হয়েই আমার আনন্দ। তাই অনেকে আমাকে নাস্তিক বলে।
যতীনের হঠাৎ মনে পড়লো করুণাদেবীর কথা। তিনিও তাই বলেছিলেন।
পুষ্প বলে–প্রভু, এই গ্রহে স্ত্রীলোক আছে?
–কেন থাকবে না? নারী বিশ্বে শক্তির অংশ। এসো–দেখবে। গ্রহে এ অংশটা রাত্রি। অন্য অংশে দিনমান–এদের ঘর সংসার দেখাবো খুব শান্ত জীবন-যাত্রা এদের। বহু প্রবৃত্তি ও বাসনার সঙ্গে, বিরুদ্ধ শক্তির সঙ্গে সংগ্রাম করে জয়ী হয়ে অভিজ্ঞ হয়ে এ জন্মে পূৰ্ব্বজন্মের জ্ঞান ও সংযমের প্রভাবে এরা সমাহিত ও আত্মস্থ হয়েছে।
–এদের সমাজ কেমন? ইচ্ছে করে প্রভু–জানি–
–এই গ্রহের কথা আমি ঠিক জানি না–তবে বিশ্বের এই অঞ্চলে এ রকম বহু গ্রহ আছে। সব উচ্চস্তরের জীবজগৎ। জীবে জীবে যুদ্ধ। রক্তপাত নেই এই সব গ্রহে। অত্যন্ত পরার্থপর এখানকার মানুষ। পরের জন্যে প্রাণ দেবে। অনেক জাতি নেই, ভেদবুদ্ধি অত্যন্ত কম। সহজে খাদ্য মেলে স্থল-দেহ ধারণের উপযুক্ত। আয়ু দীর্ঘ নয় কিন্তু, অল্প সময়ের মধ্যে বেশি কাজ করতে হয়–কাজেই আলস্যের স্থান। নেই। আসার বস্তুতে লোভ নেই–যেমন অত্যন্ত খাদ্য সঞ্চয়, বড় আবাসবাটী, উজ্জ্বল পরিচ্ছদ–মান, যশ-অহঙ্কার, অভিমান।
যতীন বল্লে–কিন্তু নারী রয়েছে যে প্রভু, ওরা থাকলেই
পুষ্প ভ্রূকুটি করে বল্লে–কি রকম যতীনদা?
