দেবতা হেসে পিতার ন্যায় সস্নেহে পুষ্পের পৃষ্ঠদেশ স্পর্শ করে। বল্লেন–কন্যার মনে আঘাত দিও না–ও ঠিক বলেচে। ওরা থাকলেই হয় না গোলমাল। বাসনা থেকে পাপ, গোলমাল। এখানকার জীব বাসনা ক্ষয় করে এসেচে বহু জন্ম ধরে। এদের নিম্নস্তরের বাসনা জাগে না তীব্রভাবে। উচ্চজ্ঞানের, শিল্পের, সংগীতের সাধনা বা ভগবৎসাধনা নিয়ে এরা থাকে। ভগবানের জ্ঞান বা প্রত্যক্ষদর্শন এদের অনেকের হয়েছে। সুতরাং যে সব জিনিস জীবনে স্বপ্নের মত অস্থায়ী তাদের। অসারত্ব এরা বুঝেছে। অত্যন্ত সাধু, নিস্পৃহ, সরল উচ্চস্তরের জীবন। এখানকার মানে, এই সব গ্রহের।
যতীন বল্লে–বাঃ, চমৎকার জীবন তো এখানকার–ইচ্ছে হয় জন্ম। নিই–
দেবতা ওর দিকে চেয়ে বল্লেন–তোমাকে এখানে একদিন তো জন্ম। নিতেই হবে। কারণ এই স্বর্গলোক, যেখানে তোমরা আছ, এও মায়ার অধীন। হয়তো বহুঁকাল এখানে থাকবে, স্তর থেকে স্তরান্তরে যাবে কিন্তু স্বর্গও দুদিনের। ব্রহ্মচক্রে জন্ম-মৃত্যু আবর্তিত হচ্চে, মানুষ আবার জন্মাবে, আবার মরবে, আবার জন্মাবে–যতদিন বাসনার শেষ না হয়, অসত্য থেকে সত্যে, মৃত্যু থেকে অমৃতে, অন্ধকার থেকে জ্যোতিতে না যায়। ভগবানকে জানলে, জীব নিজেকে জানতে পারবে–তখন ছুটি। স্থূল দেহে জন্ম সাধারণত এই সব গ্রহে হয়–এখানে আত্মদর্শনের ও সাধনার সুযোগ ও সময় অনেক বেশি। দয়া করে বিশ্বের অধিদেবতা জ্ঞানী ও মুমূক্ষু জীবদের পুনর্জন্ম গ্রহণ করান।
–দেব, আপনি ঘুরে ঘুরে বেড়ান কেন? আপনি এত উচ্চ
–ঐ রজনীর তারালোকের ব্যাপ্তির মধ্যে, বনপুষ্পের সুবাস ও এই সব অদ্ভুত গ্রহের বনানীর নির্জনতা ও বনবিহঙ্গের কূজনের মধ্যে, বিশ্বের রহস্যের মধ্যে আমি তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবার প্রার্থনা জানিয়েছিলাম মনে মনে। তিনি অসীম করুণায় সে প্রার্থনা মঞ্জুর। করেচেন। নইলে সাধ্য কি এই অগণ্য লোকালোকে ভ্রমণ করি? এ শক্তি তো সকলের হয় না। আমি দেখচি এভাবে তাঁর লীলা-সৌন্দর্য্য দেখে বেড়ানোর বাসনা করো নেই, এ নেশা আর কারো দেখিনি, কেবল বহুঁকাল আগে আর একটি আত্মার সঙ্গে দেখা হয়েছিল–দুটি নক্ষত্রের বিরাট সংঘর্ষের দৃশ্য দেখেছিলাম দুজনে–তা থেকে তৃতীয় একটি নূতন প্রজ্বলন্ত তারকার সৃষ্টি হোল। ওঃ সে সব দৃশ্য তোমাদের শক্তি নেই সহ্য করো। আমাকে তিনি ভ্রমণের শক্তি দিয়েছেন, সুপর্ণের মত বিরাট পাখা দিয়েছেন লোকে লোকান্তরে উড়তে–এই আমার তাঁকে উপাসনা। জয় হোক তাঁর।
পুষ্প হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো, দেখাদেখি যতীনও। এই মনোরম জগতের নৈশসৌন্দর্য্যের মধ্যে উচ্চস্তরের এই পথিক দেবতার বাণী স্বয়ং ভগবানের প্রতিনিধির বাণী বলে মনে হোল হঠাৎ ওদের মনে। সুপষ্ট সত্য বাণী–চন্দ্রমা অস্তমিত হোলে, বাদ্য শান্ত হোলে, পৃথিবীর ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যর আশ্রমে যেমন একদিন বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। পুষ্প মাথা নীচু করে বল্লে–আশীৰ্বাদ করুন দেব
ওর অশ্রুপ্লাবিত চোখ দুটির দৃষ্টি নতুন গ্রহের মৃত্তিকার দিকে আবদ্ধ রইল।
দেবতা বলেন–আশীৰ্বাদ করচি কন্যা, তুমি আমার অপেক্ষা অনেক উচ্চস্তরের দেবআত্মার সাক্ষাৎ পাবে। আমি ভবঘুরে মাত্র। সত্যিকার জ্ঞানীর দর্শন পাবে। তবে তোমার ভাগ্যে এখনও অনেক সংগ্রাম আছে। কিন্তু তুমি বিশ্বদেবের করুণা লাভ করবে। আমি যাদের পাদস্পর্শ করার যোগ্য নই, এমন আত্মার দর্শন পেয়ে ধন্য হবে।
এমন সময় রাত্রি প্রভাত হয়ে এল সেখানকার বনে-বনানীতে। আকাশের নক্ষত্ররাজি ম্লান হয়ে এল–সাথী তারার নীল জ্যোৎস্না মিলিয়ে অস্পষ্ট হয়ে এল। পক্ষী-কূজন জেগে উঠলো বনভূমির বুকে।
পুষ্প ভাবছিল, কোনো এক সুদুর জন্মান্তরে এই গ্রহলোকে যদি সে জন্ম নেয়, সাথী তারার নীল জ্যোৎস্নায় এরই শৈলারণ্যে, উপত্যকায়, গিরিসানু দেশে, শান্ত উপত্যকায় সে হাত-ধরাধরি করে বেড়াবে যতীনদার সঙ্গে–দুজনে মিলে ভগবানের উপাসনা করবে সারা জীবন এই তপোবনসম গ্রহলোকের পবিত্র আশ্রয়ে, কোনো গিরিনিঝরিণীর কূলে কুটীর বেঁধে। জগতের বিশাল পথে ঘুরতে ঘুরতে কবে এখানে। এসে হয়তো পড়তে হবে, তা কেউ জানে কি? মহাপুরুষের আশীর্বাদ বৃথা যাবে না।
দেবতা বল্লেন–চলো, এখুনি লোকে জেগে উঠবে। এরা আমাদের হয়তো দেখতে পাবে–এদের ক্ষমতা বেশি। তোমাদের তো নিশ্চয় দেখতে পাবে। সরে পড়ি তার আগে।
ওদের বুড়োশিবতলার ঘাটে পৌঁছে দিয়ে পথিক দেবতা পুষ্পের চোখের জলের মধ্যে অদৃশ্য হোলেন। তার অনুনয় ও অনুরোধের উত্তরে বলে গেলেন, সময়ে আবার দর্শন দেবেন।
১৭. আজ দীপান্বিতা অমাবস্যা
বুড়োশিবতলার ঘাটে আজ দীপান্বিতা অমাবস্যা। ওপারে হালিসহরের শ্যামাসুন্দরীর ঘাটে মন্দিরে মন্দিরে ছাদে ছাদে প্রদীপ দিয়েছে মেয়েরা। এদের প্রাচীন ঘাটের রানায় পুষ্প নিজের হাতে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বেলেচে। গঙ্গাবক্ষ অন্ধকার, দু-একটা নৌকোর ক্ষীণ আলো দেখা যাচ্চে–ছ ছ দাঁড়ের শব্দও পাওয়া যাচ্চে।
পুষ্প বল্লে–এসো যতীনদা, আমরা আমাদের ছেলেবেলার কথা ভাবি বসে বসে। মনে পড়ে কেওটা-সাগঞ্জের দিন? আমি পিদিম দিচ্চি, তুমি এক পয়সার কুচো গজা কিনে আনলে–
কুচো গজা না জিবে গজা–
–না, কুচো গজা। বেশ মনে আছে ময়রা বুড়ীর দোকান থেকে। নিতাইএর ঠাকুরমা, মনে আছে?
