–কিন্তু আপনার শিষ্যা যে অচেতন হয়ে পড়েচে! ও মেয়েমানুষ, ওকে ও রূপ আর নাই বা দেখালেন প্রভু?
সেই বিরাট কালাগ্নিবেষ্টিত মহাদেশ তখন ওদের অদূরে। যতীনের দেখে মনে হোল একটা প্রজ্বলন্ত বিশ্বপৃথিবী তাঁর সামনে। অল্প পরেই দেবতার অদ্ভুত শক্তিবলে ওরা দুজনেই সেই বিরাট অগ্নিমণ্ডলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো। ওদের চারিধারে শুধু শুভ্র জ্বলন্ত হিলিয়াম ও ক্যালসিয়াম বাষ্পরাশি মহাবেগে ঘূর্ণমান, কোথাও রাঙা শিখা নেই–শুধুই শ্বেতশুভ্র-আবার বহুদূর অগ্নিময় দিগন্তে ললকে রাঙা হাইড্রোজেন শিখা অজগরের মত ফুঁসে গর্জে তেড়ে উঠেচে চক্ষের পলকে লক্ষ লক্ষ মাইল। ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনির মত ভৈরব হুঙ্কার সে কালাগ্নিমণ্ডলের চারিদিক থেকে একসঙ্গে অনবরত শোনা যাচ্চে। একটা গোটা ব্রহ্মাণ্ড যেন দাউ দাউ করে জ্বলচে! অতি ভীষণ, রৌদ্ররূপে প্রকৃতির।
ভয়ে, বিস্ময়ে যতীন আড়ষ্ট হয়ে চারিদিকে চেয়ে চেয়ে দেখলে। রৌরব নরকের বর্ণনা সে কিসে যেন পড়েছিল তার পৃথিবীর বাল্যজীবনে। এই কি সেই রৌরব নরক? কোন্ দেবতার তাণ্ডবনৃত্যের পদচিহ্ন এর প্রতি অগ্নিশিখাঁটির গায়ে আঁকা, উদ্ধত ও ভয়াবহ মৃত্যুদহন এর কালাগ্নিপরিবেশের প্রতি অণু প্রতি পরমাণুর মর্মস্থলে?
দেবতা বল্লেন–ভয় পেয়ো না। এই থেকেই সৃষ্টি দাঁড়িয়ে দেখ।
শুধু অন্ধবেগে ধাবমান অণুপরমাণুপুঞ্জের সংঘর্ষে উৎপন্ন এই বিশাল অগ্নিময় মহাদেশ চারিদিক থেকে ওদের ঘিরেচে–এর শেষ কোথায়? অতি নীলাভ শুভ্র অগ্নিগর্ভ বাষ্পপুঞ্জ, বহ্নিমান ব্রহ্মাণ্ড ধরার মানুষ সহ্য করতে পারে না। যতীন অনুভব করলে সেও উম্মাদ হয়ে যাবে এ দৃশ্য বেশিক্ষণ দেখলে। মনে পড়লো গ্রহদেবের সেদিনকার কথা, সেই অদ্ভুত সত্য কথা–অস্য ব্রহ্মাণ্ড সমন্ততঃ স্থিতান্যেতাদৃশান্যনন্ত কোটিব্রহ্মাণ্ডানি সাবরণানি জ্বলন্তি–পৃথিবীর প্রাচীন দিনের জ্ঞানীরা যে বাণী উচ্চারণ করে গিয়েছিলেন তপস্যা দ্বারা সত্যকে অনুভব করে।
হঠাৎ পথিক দেবতা যেন ভাগাবেগে সমাধিস্থ হয়ে নিস্পন্দ হয়ে গেলেন ক্ষণকালের জন্যে। সুন্দর চক্ষুদুটি মুদ্রিত করে সেই অগ্নিশিখার মধ্যে তিনি স্থির প্রশান্ত বদনে দাঁড়িয়ে আপন অস্ফুট স্বরে বলতে লাগলেন–হে অনল, হে সৰ্বেশ্বর, হে পরাবরস্বরূপ, কারণে তুমি বর্তমান কার্যেও তুমি বর্তমান, তুমিই ধন্য ধ্বংসের মধ্যে তোমার সৃষ্টি সার্থক হোক। জয় হোক তোমার!
ওদের দিকে ফিরে বল্লেন–চলো। কন্যা এখনও অচেতন? এই নক্ষত্রের অগ্নিমণ্ডল ছাড়িয়ে গেলেই জ্ঞান ফিরে পাবে।
যতীন সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে ছিল দেবতার সেই ধ্যানপ্রশান্ত গভীর রূপের দিকে। অদ্ভুত এ মূর্তি। সাক্ষাৎ সবিতৃমণ্ডল-মধ্যবর্তী জ্যোতির্ময় নারায়ণ যেন তাঁর সম্মুখে। সে মুখে অনায়াস করুণা ও গভীর মৈত্রীর চিহ্ন ব্রহ্মান্ডের জরামরণচক্রে বদ্ধ জীবকূলকে যেন অভয় দান করচে। কে বলেছিল এঁকে নাস্তিক?
দেবতা বল্লেন–জানো, প্রত্যেক গ্রহ বা নক্ষত্র, প্রত্যেক জড় বা বাষ্পপিণ্ড যা আকাশে ছড়ানো আছে–তোমাদের সূর্য নামক সেই ক্ষুদ্র নক্ষত্রও এর মধ্যে প্রত্যেকটি এক এক চুম্বক। এরা। পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করচে। সমস্ত ব্যোম ব্যেপে এই বিরাট চৌম্বক ক্ষেত্রে কোনো জড়দেহধারী জীবের সাধ্য নেই এই বিশাল চৌম্বকক্ষেত্রের আকর্ষণশক্তিকে জয় করে স্বেচ্ছায় অগ্রসর হয়।
যতীন বল্লে–দেব, আমাদের সূৰ্য্যও বড় চুম্বক?
–তোমাদের পৃথিবীও। সূৰ্য্যে তো বটেই। প্রত্যেক নক্ষত্রও।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওরা বহুদূর চলে এল নক্ষরটা থেকে–ওদের মাথার ওপরে বহুদূরে সেটি একটি বিশাল বহ্নিগোলকের মত জ্বলচে তখনও।
হঠাৎ যতীনের মনে পড়লো সেই পূৰ্ব্বের কথাটি।
সে বল্লে–দেব, আপনি তখন বলেছিলেন ওই সব মেঘের মত দেখা যাচ্চে যা, ওগুলো আপনার কাছেও অদৃশ্য জীবলোক?
দেবতা বল্লেন–জীবলোক বলিনি–স্থূলদেহধারী জীব নেই ওতে। আত্মিকলোক বলেছি।
পুষ্পের এবার জ্ঞান হয়েছে। সে বিস্ময়ের সঙ্গে ওদের দিকে চেয়ে। চোখ খুলে বল্লে–এ কোথায় চলেছি?
যতীন হেসে বল্লে–তার চেয়ে কোথা থেকে আসচি বল্লে প্রশ্নটা সুষ্ঠু হোতো। আমরা আসছি বহুদূরের নক্ষত্রলোক দেখে।
–আমি কোথায় ছিলাম?
–অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে।
পুষ্পের এবার জ্ঞান সম্পূর্ণ ফিরে এল। সে বল্লে–মনে পড়েছে এবার। দূর থেকে যা দেখেছি, তাই যথেষ্ট! উনি দেবতা–তা বলে। আমরা সামান্য মানুষ–ও সহ্য করতে পারা কি–
যতীন প্রতিবাদ করে বল্লে–আমরা এখনও সামান্য মানুষ? এতকাল স্থূলদেহ ছেড়ে এসে এখনও সামান্য মানুষ?
পথিক দেবতা হেসে বল্লেন–তোমার পূৰ্ব্ব প্রশ্নের উত্তর আর এ প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গেই দিচ্চি শোনো। ওই যে সব মেঘের মত দেখা যাচ্চে বহুদূরে, ওগুলো বহু উচ্চস্তরের আত্মিক লোক। ওতে যাঁরা বাস করেন তাঁরা এবং তাঁদের বাসভূমি দুই-ই আমার কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য। অথচ আমি কতকাল ধরে শুধু ভ্রমণ করেই বেড়াচ্চি–কত যুগ যুগ এসেচি আত্মিক লোকে–আর তোমরা দুদিন এসেই
যতীন বিস্ময়ে কেমন হয়ে গেল–এই মহান্ দেবতা–ইনিও ছোট? তাহোলে তারা কোথায় আছে? কীটস্য কীট-তাই বুঝি অত অহংকার? কিন্তু কি বিশাল, অনন্ত এ ব্ৰহ্মাণ্ড–কত অসংখ্য জীবলোক, আত্মিক লোক, অনাদি, অনন্ত সময় ব্যেপে কি অনন্ত বিবর্তন! তাদের সবারই ওপর সেই বিশ্বনিয়ন্তা। সত্যিই ভগবানের নাগাল কে পাবে? তিনি। কোথায় আর তারা কোথায়!
