দেবতা বল্লেন–এ একটা নক্ষত্র। কিন্তু কর্মচারী বা বিদ্যুৎচারী না। হোলে তোমরা এর বিরাটত্ব কিছুই বুঝতে পারবে না। তোমাদের জড়জগতের অবস্থানকালের কোনো মাপকাঠি ব্যবহার করে এ নক্ষত্রের সীমা পাবে না। চেষ্টা করো–চলো–
পুষ্প ও যতীন যে বেগে যেতে ইচ্ছা করলে, তাকে পৃথিবীতে রেলগাড়ীর বেগ বলা যেতে পারে। দেবতা গতির বেগ কমিয়ে ওদের সঙ্গে চলেছেন। ওরা সবেগে যেন উড়ে চলেচে একটা অগ্নির মহাসমুদ্রের ওপর দিয়ে ও একটা জলন্ত অগ্নিকুন্ডের অগ্নিশিখার মধ্যে দিয়ে–ওদের চারিপাশে ঘিরে অগ্নি দেবতার রক্তচক্ষু। বহুক্ষণ ওরা গেল, পৃথিবীর হিসেবে দশ বারো ঘণ্টা। ওদেরও ক্লান্তি নেই, যাত্রাপথেরও শেষ নেই–মহা অগ্নিসমুদ্রেরও কূলকিনারা নেই।
দেবতা বল্লেন–তোমরা যদি জড় বস্তুর উপাদানে তৈরি হতে এই জ্বলন্ত নক্ষত্রের বহুদূর থেকে তোমাদের দেহ জ্বলে পুড়ে বাষ্প হয়ে উড়ে যেতো–আকর্ষণের বলে সে বাষ্পটুকু এই বৃহত্তর বাষ্পমণ্ডলে প্রজ্বলন্ত অবস্থায় প্রবেশ করে মিশিয়ে যেতো।
পুষ্প বল্লে–আর সহ্য করতে পারবো না–আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে চলুন দেব দয়া করে।
দেবতা প্রসন্ন হেসে বল্লেন–বিশাল বিশ্বের রূপ সবাই সহ্য করতে পারে না, দেখতে চায়ও না। শক্তিমতী হও। ভগবান তাকেই এসব দেখান, যে তাঁর বিশ্বের বিরাটত্ব দেখে ভয় খাবে না। আমি সুদীর্ঘ জন্ম-জন্মান্তর ধরে এ সাধনা করেছিলাম–তারপর জড় জগৎ থেকে এসে বহুঁকাল ধরে শুধু বিশ্বভ্রমণ করে বেড়াচ্চি। এই আমার সাধনা এতে আমি সিদ্ধিলাভ করেছি। কিন্তু আমিই দিশাহারা হয়ে যাই সময় সময়। তোমরা কী দেখেচ, এক কণিকাও নয়।
পুষ্প বল্লে–আর কী দেখাবেন বলুন দেব, এ আগুনের দৃশ্য আমার আর সহ্য হচ্চে না–
–তোমাকে এর চেয়েও বৃহত্তর নক্ষত্রের অগ্নিমণ্ডলে নিয়ে যাবো, চলো। শক্তিমতী হও। এবার চোখ চেয়ে চলো। তোমাকে চোখ তখন মুদ্রিত করতে বলেছিলাম কেন জানো? তোমাদের জড়জগতের অতি নিম্নস্তর অতিক্রম করতে হবে আসবার পথে। সে অতি কুশ্রী স্তর। তোমরা দেখলে ভয় পেতে–তাই দেখাই নি।
যতীন আগ্রহের সুরে বল্লেনরক? সে দেখতে বড় ইচ্ছে, দেব! দয়া করে
দেবতা গম্ভীর স্বরে বল্লেন–প্রত্যেক জড় জগতের অমনি নিম্নতর আত্মিক স্তর আছে। জড় জগতের অপুষ্ট আত্মা ওখানে আসে। পৃথিবীর নরক তবুও ভালো, কারণ গ্রহ হিসাবে পৃথিবীর জীবদের আধ্যাত্মিক প্রগতি অনেক বেশি! তোমাদের দেখে তা মনে হচ্চে। এমন গ্রহ তোমাদের দেখাতে পারি যেখানকার জীবের চৈতন্য নিম্নস্তরের। তোমাদের পৃথিবীতে এমন শ্রেণীর জীব নেই।
ওরা অনন্তব্যোমের যে অংশ দিয়ে যাচ্ছিল, যতীন তার চারিদিকে চেয়ে কোনো পরিচিত নক্ষত্রমণ্ডল দেখতে পেলে না–সপ্তর্ষিমণ্ডল, কালপুরুষ, ধ্রুবনক্ষত্র, এমন কি বৃশ্চিক পৰ্য্যন্ত না! অসীম বিশ্বের কোন সুন্দর অংশে তারা এসে পড়েছে যেখান থেকে সপ্তর্ষিমণ্ডল বা বৃশ্চিক কিংবা ক্যাসিওপিয়া দেখা যায় না? প্রশ্নটা সে পথপ্রদর্শক দেবতাকে করলে।
দেবতা হেসে বল্লেন–আমি তোমাদের ওসব নক্ষত্র চিনি না। তোমাদের জড়জগৎ থেকে চিরকাল দেখে আসচো বলে ওগুলো পৃথিবীর জীবের কাছে সুপরিচিত। বিশ্বের পথিক আমি, আমার কাছে ও-রকম লক্ষকোটি ধ্রুব আর সপ্তর্ষি অগণ্য জ্যোতির্লোকের ভিড়ে মিশিয়ে গিয়েছে।
পুষ্প অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছিল আকাশের ওপরদিকে বকের পালকের মত বহুদূরব্যাপী রঙীন মেঘরাশি এক জায়গায় স্থির ছবির মত দৃশ্যমান।
পুষ্প কৌতূহলী হয়ে বল্লে–ওই মেঘের মত কী ওগুলো দেব?
–আমি জানি কিন্তু কখনো দেখিনি। ওগুলো বহু উচ্চস্তরের জীবলোক।
–জড়দেহধারী জীব?
–না। তোমরা যাকে বলবে আত্মিক লোক–
–অনেক উঁচু স্তরের আত্মা?
–খুব উঁচু।
যতীন ওদের কথা শুনছিল–সাগ্রহে বল্লে, একটা প্রশ্ন করবো যদি কিছু মনে না করেন স্যার–আই মিন্–মানে, দেব।
পুষ্প ভ্রূকুটি করে বল্লে–তোমার এখনও পৃথিবীর সংস্কার গেল না। যতীনদা?
দেবতা ওদের মনোবৃত্তি অনেক সময় ঠিক বুঝতে পারেন না; বাগ, অশ্রদ্ধা, হিংসা প্রভৃতি মনোভাবের বহু ঊর্ধ্বের তাঁরা। তিনি অনেক পরিমাণে সরল বালকের মত। পুষ্প লক্ষ্য করচে–করুণাদেবীও অনেক সময় বারো বৎসরের পার্থিব বালিকার মত কথা বলেন, ব্যবহার করেন। উচ্চতর দেবচরিত্রের এদিকটা আজকাল বেশি করে ওদের দুজনেরই চোখে পড়ছে।
যতীন আরও বিনয়ের সঙ্গে বল্লে–একটা প্রশ্ন ছিল–আপনি ওখানে যান নি কেন?
দেবতা বল্লেন–ওর উত্তর খুব সোজা। ওসব লোক আমার নিকট অদৃশ্য।
পুষ্প ও যতীন দুজনেই বিস্ময়ে স্তব্ধ। পুষ্প বল্লে–আপনার কাছেও অদৃশ্য? দেব, ঠিক বুঝতে পারলাম না।
এইবার সামনে বহুদূর থেকে ওরা দেখতে পেলে সারা আকাশ। জুড়ে একটা বিশাল অগ্নিক্ষেত্র ওদের দিকে যেন ছুটে আসছে। ঘোর শুভ্রবর্ণ মহাপ্রজ্বলন্ত বাষ্পপরিবেশ, মাঝে মাঝে তা থেকে সহস্র সহস্র যোজনব্যাপী বাম্পাগ্নি বহু ঊর্ধ্বে উঠে মহারুদ্রের মত সৰ্ব্বধ্বংসকারী। প্রলয়ের হুঙ্কার ছাড়চে। সে দৃশ্য দেখে পুষ্পের চেতনা লোপ পাবার মত হোল।
যতীন সেই কালাগ্নির ভৈরব দৃশ্যের দিকে পেছন ফিরে ধল্লে– ভীষণ ব্যাপার, আমাদের পক্ষে এ দৃশ্য না দেখাই ভালো। ভয় করে
দেবতা হেসে বল্লেন–শুধু বিশ্বদেবের মোহনমূৰ্ত্তিই দেখবে, তাঁর করাল, রুদ্র রূপ দেখলে ভয় পাব কেন? ধ্বংসদেবের বিষাণ-ধ্বনি শোনাবো তোমাদের। আত্মার দুর্বলতা দূর কর।
