কথা শেষ করে যখন পুষ্প ওর দিকে চাইলে তখন পুষ্পের চোখে জল।
যতীন বল্লে–কি হোল তোমার, পুষ্প?
পুষ্প তখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। বল্লে–সতীলক্ষ্মী উনিজয় হোক ওঁর। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করো মাকে।
তারপর দুজনে আরও অনেকক্ষণ সেখানে রইল। যতীনের মায়ের জ্বর ছেড়ে যায় নি, তিনি আবার শয্যায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন, কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে তিনি জ্বর কমবার সঙ্গে সঙ্গে নির্জীবভাবে ঘুমিয়ে পড়লেন।
যতীন বল্লে–ভালো কথা, মাকে এবার সেই ছবিটি দেখাও না? যেন এক দেববালক ওঁর মাথার শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্চে–এই অবস্থার স্বপ্ন বেশ স্পষ্ট হবে।
পুষ্প বল্লে–না। কি জানো যতীনদা, ভেবে দেখেচি তারপর। ওসব ছবি যে দেখে, সে সংসার করতে পারে না। মন চঞ্চল হয়ে যায়। পৃথিবীর মন একরকম, ভুবর্লোকের মন আলাদা। এর সঙ্গে ওকে জড়াতে নেই। ওসব দর্শন হয় কাঁদের, যারা আধ্যাত্মিক জীবন শুরু করবে। সংসারী লোকদের অমন ছবি দেখাতে নেই। আমি দেখাতে পারি, তোমার মা জেগে উঠে কাঁদবেন, উদাস হয়ে থাকবেন দিনকতক, সংসারের কিছু ভাল লাগবে না। প্রতিদিনের সাংসারিক জীবনে মন দিতে পারবেন না। কি দরকার সুস্থ শরীর ব্যস্ত করে।
যতীন আগ্রহের সুরে বল্লে–নয়তো মাকে একবার ঘুমের মধ্যে। ভুবর্লোকে নিয়ে যাই না কেন? বেড়িয়ে দেখে আসুন।
–উনি এখনও তার উপযুক্ত হন নি। কিছু বুঝতে পারবেন না, হয়তো ওঁর সূক্ষ্ম শরীর অজ্ঞান হয়ে পড়বে সেখানে। সব এক আজগুবি স্বপ্ন বলে ভাববেন। বৃথা পরিশ্রম। চলো যাই, বেলা গেল।
নিকটেই এক ঝোপে তিৎপল্লার হলুদ ফুলে রঙীন প্রজাপতির ঝাঁক উড়তে দেখে ওরা সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। পুষ্প বল্লে–কি সুন্দর, না? শুয়োপোকা থেকে কেমন চমৎকার রঙীন জীব তৈরী হয়েছে। দ্যাখো। শুয়োপোকা মরে যায়, গুটি কেটে প্রজাপতি উড়ে বেরোয়! মাটিতে কত আস্তে চলে শুয়োপোকা–আর কেমন দ্যাখো প্রজাপতি নীল আকাশের তলায় ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্চে। শুয়োপোকা কল্পনা। করতে পারে মরবার পরে সে প্রজাপতি হবে?
যতীন হেসে বল্লে–মানুষ কল্পনা করতে পারে মৃত্যুর পর সে বিশ্বের নীল আকাশের তলায় বিদ্যুদগতিতে উড়ে বেড়াতে পারবে? শুয়োপোকার মন অন্ধ, মানুষও তেমনি অন্ধ।
প্রদোষালোকে ম্লানায়মান ধরণী গতির বেগে ওদের পায়ের নীচে কোথায় অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল। সেই ধরণীর এক প্রান্তে যতীনের দরিদ্রা জননী গভীর ঘুমে অচেতন রইলেন জানতেও পারলেন না তাঁর ভাঙা ঘরে এ অদ্ভুত আত্মিক আবির্ভাবের রহস্য।
সেদিন পুষ্পই প্রথম তাঁকে দেখলে। সেদিন ওরা বুড়োশিবতলার ঘাটে ফিরে আসছিল পৃথিবী থেকে–ফেরবার পথে একটা ক্ষুদ্র পাহাড়ের ওপর বসেচেহঠাৎ আকাশের বিদুৎলেখার মত উজ্জ্বল জ্যোতি দর্শন। করে পুষ্প বল্লে–দ্যাখো দ্যাখো–কোন্ দেবতা আসচেন! যতীনও দেখতে পেলে। একটা বিশাল উল্কা যেন আগুনের অক্ষরে শূন্যের গাঁয়ে তার বার্তা ঘোষণা করচে।…
চক্ষের পলকে সেই পথিক দেবতা কায়া ধারণ করে ওদের সামনে আবির্ভূত হোলেন। পুষ্প ও যতীন উভয়েই চিনলে–যে দেবতা একবার মহাশূন্যে পথ হারিয়ে ওদের কুটির-প্রাঙ্গণে বিভ্রান্ত অবস্থায় এসে পড়েছিলেন, সেই ভ্রাম্যমাণ আবিষ্কারক দেবতা।
দেবতা বল্লেন–তোমাদের কথা স্মরণ রেখেচি। আবার দেখা করবো। বলেছিলাম, মনে আছে কন্যা?
পুষ্প ও যতীন দেবতার পাদবন্দনা করলে। পুষ্প বল্লে–দেব, আপনি ভ্রমণের গল্প করুন–
যতীন বল্লে–একটা কথা, দেব। আমাদের পৃথিবীর পন্ডিতরা অনুমান করচেন আমাদের এই সৌরজগতের বাইরে অন্য কোনো নক্ষত্রে কোনো গ্রহ নেই! একথা কি সত্য?
দেবতা হেসে বল্লেন–ভুল কথা। বিশ্বের এই অঞ্চলেই বিভিন্ন নক্ষত্রে লক্ষ লক্ষ গ্রহ বৰ্তমান। বহু শ্রেণীর জীব তাতে বাস করছে। তোমাদের পৃথিবী যতটুকু এর চেয়ে অনেক বৃহত্তর ও সুন্দরতর গ্রহ বিশ্বের এই অঞ্চলে বহু নক্ষত্রে বর্তমান।
–যতীন বল্লে–দেব, বিশ্বের এই অঞ্চল বলে আপনি কতটুকু জিনিসের কথা বলছেন?
–বিদ্যুতের বেগে যদি যাও, তবে এক কোটি বৎসর লাগবে তোমাদের এই নক্ষত্রমণ্ডল পার হতে। এ রকম লক্ষ লক্ষ নাক্ষত্রিক বিশ্ব ছড়ানো রয়েছে চারিধারে। আমি বিশ্বের এ অঞ্চল বলতে তোমাদের ছায়াপথের নিকটবর্তী অঞ্চলের কথা বলছি।
পুষ্প বল্লে–আমাদের একবার নিয়ে যাবেন বলেছিলেন ওই সব দূর দেশে?
চক্ষু মুদ্রিত কর। গতির প্রচন্ড তেজ তোমরা সহ্য করতে অভ্যস্ত নও–জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। দুজনেই চক্ষু মুদ্রিত করো–প্রস্তুত হও– মধ্যপথের কোনো নক্ষত্র বা গ্রহলোক তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে না।
গতির কোনো অনুভূতিই ওদের হোল না, চক্ষের পলক ফেলতে যত বিলম্ব হয়, ততটুকুও বোধ হয়নি–পথিক দেবতা বল্লেন–চোখ চেয়ে দেখতে পারো
পুষ্প ও যতীন সম্মুখের দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো। তারা এ কোথায়। এসেচে–এক বিরাট অগ্নিমণ্ডল তাদের সামনে–সে অগ্নিমণ্ডলের মধ্যে বহুলক্ষ বিশালকায় কটাহে যেন লক্ষ কোটি মণ ধাতু বিগলিত হচ্চে একসঙ্গে–লক্ষ লক্ষ মাইল উর্ধ্বে উঠেচে রক্তবর্ণ স্বয়ম্প্রভ বাষ্পশিখা রক্ত আগুনের শিখার মত। বাল্যকালে জলস্তম্ভের ছবি দেখেছিল যতীন পৃথিবীর পাঠশালার কোন পুস্তকে–এখন ওর চোখের সামনে ধারণার অতীত বিশালকায় অগ্নি ও প্রজ্বলন্ত বাস্পের খাড়া সোজা উঁচু স্তম্ভ চক্ষের নিমিষে উঠে যাচ্ছে যেন দশ হাজার মাইল; যেদিকে চাওয়া যায় দাউ দাউ করচে শুধু আগুন–অথচ পৃথিবীর আগুনের মত নয় ঠিক জলন্ত বাষ্পরাশি হয়তো। অগ্নিমণ্ডলের চারিদিকে শুভ্র ও রক্ত আগুনের ছটা–গ্রহণ যোগে দৃশ্যমান সূর্যের চারিপাশে দৃষ্ট সৌরকিরীটের (Co rona) মত। কোন্ রুদ্র ভৈরবের প্রচণ্ড আবির্ভাব এ! এখানে না আছে নারী, না আছে শিশু, না আছে বনকুসুমের শোভা, না আছে জীবের জীবনস্বরূপ বারি। কিন্তু এই রুদ্রের বামমুখ প্রত্যক্ষভাবে দেখবার সুযোগ ঘটে না কারো–এ ভয়ঙ্কর মূর্তিকে দেখতে পেয়ে অন্তরাত্মা যেমন থর থর কেঁপে উঠলো ওদের, তেমনি ওদের মনে হোল, এই অদ্ভুত ভয়ঙ্করের আবির্ভাবের ও অস্তিত্বের সামনে তাদের সকল ক্ষুদ্রত্ব ও সংকীর্ণতা এখানকার বাস্পমণ্ডলের কটাহে বিগলিত বহু লৌহ, তাম্র, নিকেল, এলুমিনিয়ম, কোবাল্ট, প্রস্তর, স্বর্ণ, রৌপ্যের মতই দ্রবীভূত হয়ে নয় শুধু, বাষ্পীভূত হয়ে যায়–যেমন যাচ্ছ ঐ সব ধাতু নিমেষে তাদের দৃষ্টির সম্মুখে।
