–আমি এর সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে পারি?
–কি করে? তুমি স্থূল দেহ ত্যাগ করেচ, উনি এখন দেহে অবস্থান করচেন। তা সম্ভব নয়।
–আচ্ছা, ওই যে একজন তিব্বতী লোক মানস-সরোবরের ধারে বেড়াচ্ছিল তখন, ওরা কি অবস্থায় আছে? ওদের মুক্তি বা উন্নতি
দেবতা হেসে বল্লেন–ওদের থাক্ আলাদা। নিম্নস্তরের চৈতন্য নিয়ে জন্মেচে–সঙ্কুচিত চেতন। ওরা মরবে, অমনি অল্পদিন পরেই আবার দেহ নিয়ে পৃথিবীতে জন্মাবে, কারণ ভুবর্লোকে ওদের চৈতন্য মোটেই থাকে না। যদিও থাকে, খুব কম। দেহ না নিলে উপায় হয় না–সুতরাং দীর্ঘ সময় ধরে ওদের প্রায় স্থূলদেহেই বর্তমান থাকতে হয়–পৃথিবীর কামনা বাসনার ঊর্ধ্বে ওদের উঠতে অনেক দেরি। সভ্য সমাজেয় এমন অনেক আছে–খুনী, দস্যু, অলস, চোর, পরপীড়ক ইত্যাদি।
করুণাদেবী হেসে দেবতার দিকে বক্রদৃষ্টিতে চেয়ে বল্লেন–এ তুমি খুব ভালই জানো কারণ তোমার হাতের কাজ এটা, কে কতদিন ভুবর্লোকে বাস করবে কি নতুন জন্ম নেবে। উঃ, দু-একটা ব্যাপার এমন নিষ্ঠুর আর করুণ হয়ে ওঠে তখন আমি অনুরোধ করতে বাধ্য হই–
তরুণদেবতা হাসলেন মাত্র–সে হাসির মধ্যে অসীম দয়া, অনন্ত জ্ঞান ও গভীর শক্তির আভাস।
পুষ্প চুপি চুপি দেবীকে জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা, উনি কে? এই অদ্ভুত দেবতা?
–উনি?
পরে হেসে দেবতার দিকে চেয়ে বল্লেন–এইবার ওদের বলি?
বলেই চুপ করে গেলেন।
পুষ্প বিস্ময়ের সঙ্গে বল্লে–আমাদের সঙ্গে এমন ভাবে মিশচেন! এত বড় উনি! অথচ
দেবতা এবার হেসে এগিয়ে এসে বল্লেন–মানুষ কি কীট? তোমরাও তিনি। তোমাদের ঋষিরাই বলেচেন–কিঞ্চাইং ন তু ত্বাং ভৃত্যবৎ যাচে, যোহসৌ আদিত্যমণ্ডলস্থো ব্যাহৃতাবয়বঃ পুরুষঃ সোহহং ভবামি–আমি ভৃত্যভাবে তোমার সাক্ষাৎকার যাচঞা করচিনে–সবিতৃমণ্ডলে যে ওঙ্কারময় পুরুষ, আমিই সেই। তুমি আমি ভিন্ন কোথায়? ছোট ভাবো কেন, তাই তো ছোট হয়ে থাকো। বড় হও, বীৰ্য্যবান হও। সচেতন হয়ে যদি তোমরা আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও দাঁড়াও বিদ্রোহের পথে সেও ভাল। তার দ্বারা শক্তি অর্জন করবে। যে দুৰ্বল, তার দ্বারা কি কাজ হবে? যে শক্তিমান, অথচ বিদ্রোহী–তাকে ঠিক পথে নিয়ে আসতে আমরা জানি।
যতীন কৌতূহলের সঙ্গে বল্লে–এই যে যুদ্ধ, জাতিতে জাতিতে রক্তারক্তি,… এও কি আপনার ইচ্ছার অনুযায়ী?
-তুমি বুঝতে পারলে না। প্রত্যেক ঘটনা মানুষকে উন্নতির পথে। নিয়ে যায়। যুদ্ধ জাতিতে জাতিতে সংঘর্ষ–এর দ্বারা জাতি শক্তিমান হয়। কি হয় যুদ্ধে? মানুষ মারা যায়। মানুষের আরামের ব্যাঘাত ঘটে। এই তো? কিন্তু মৃত্যুর অসত্যতা এতদিনে তুমি নিশ্চয় বুঝেছ। আরামের। অত্যন্ত সুযোগ মানুষকে অলস, পশুবৎ করে তোলে। আমার পৃথিবী কতকগুলি আরামপ্রিয়, রোমন্থনকারী, নিজের অবস্থায় মহাপরিতুষ্ট গোরুর দলে ভ’রে তুলতে আমি চাইনে। শক্তিমান হয়ে উঠুক সব। কে কাকে মারচে? সব মিথ্যে। দুদিনের আরাম কিসের? অনন্ত বিশ্ব তোমাদের পায়ের তলায়। সংকল্পাদেব ততেঃ, যা যখন ভাববে, মুক্ত পুরুষে তাই তখন পায়। পৃথিবীর স্কুল বাসনা কামনাকে জয় করো আরামের ইচ্ছা মন থেকে তাড়াও। নয়তো ঘুমিয়ে পড়বে।
করুণাদেবী বল্লেন–এদের বৃহস্পতি গ্রহের দুই উপগ্রহে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দাও না?
–দেখাবো। সেদুটো ধীরগামী জগৎ, যারা পৃথিবীতে সুবিধেমত উন্নতি করতে পারছে না, আমরা তাদের ওই সব মন্থরগতি জগতে পাঠিয়ে দিই জন্ম নিতে। সেখানে গেলে আশ্চর্য ব্যাপার দেখবে।
করুণাদেবী বল্লেন–ওদের এখুনি নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিই–
আবার মানস-সরোবর ও হিমালয় ওদের পায়ের তলায় দেখতে দেখতে মিলিয়ে গেল। আবার অসীম ব্যোম–অন্ধকারে ডুবে পৃথিবী দিগন্তহীন আকাশে অদৃশ্য হোল। আকাশের অদ্ভুত দৃশ্য, দিনমানে।
সব দিক নক্ষত্রযুক্ত।
তারপরে নক্ষত্রজ্যোৎস্নায় প্লাবিত আকাশপথে এক বিশাল মহাগ্রহ ওদের দিকে যেন দ্রুত ছুটে আসছে। করুণাদেবী বল্লেন–বৃহস্পতি!
কিন্তু বৃহস্পতি খুব বড় মশালের আলোর মত ওদের দক্ষিণে দূরে। পড়ে রইল। ওরা অন্য একটি ক্ষুদ্র পৃথিবীর খুব নিকটে এসে তার। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়লো।
যতীন বল্লে–কিসে যেন পড়েছিলুম, পৃথিবী ছাড়া সোলার সিস্টেমের অন্য কোনো কিছুতে মানুষ নেই!
গ্রহদেব বল্লে–সে সব কথা এখন থাক্। এই পৃথিবীটা দেখে নাও আগে–
পৃথিবীর মত অবিকল সে স্থান, খুব বেশি ফুল, ছোট বড় নদী। বসন্তের হাওয়া বইছে, বিহঙ্গের সুস্বর সর্বত্র, নিৰ্ম্মল জলাশয়। গ্রহটির একদিকে রাত্রির অন্ধকার, অন্যদিকে দিবসের আলো। যে অংশে ওরা গেল সেখানে মানুষের কর্মব্যস্ততা নেই, নিশ্চিত মনে সকলে। নিজের নিজের বাড়ীতে বসে আছে। গৃহস্থাপত্য অতি সুন্দর, সব রকম শিল্পকলার অদ্ভুত উন্নতি হয়েচে সেখানে, দেখেই মনে হোল, সর্বত্র সঙ্গীত, বাদ্য, নৃত্য। অত্যন্ত সুন্দরী মেয়েরা বনে উপবনে ভ্রমণ করে বেড়াচ্চে পরম নিশ্চিন্ত মনে, যেন তাদের হাতে অতি সুদীর্ঘ অবকাশ, যেন সারা দিনমান শুধু কমলের বনে অলস পদচারণ জীবনের সব মুহূর্তগুলি ভরে দেবে অমৃতে। শান্ত ও অপরূপ সৌন্দর্য্যের রূপায়তন সে পৃথিবীর সুশ্যামল শম্পাস্তৃত প্রান্তরে, ফুলফোঁটা বনে ঝোপে, গন্ধে ভরা কুঞ্জতলে। বৃহস্পতির আলো পড়ে যে অংশে রাত্রির অন্ধকার, সে অংশের শোভাও চমৎকার–তবে সমগ্র পৃথিবীটি একটি নিশ্চিন্ত, নিরুপদ্রব শান্তির গভীরতায়, ব্যস্ততাহীন জীবনমুহূর্তগুলির পুঞ্জীভূত ভারে যেন ঘুমিয়ে আছে, এলিয়ে আছে, কিসের অলীক স্বপ্নে দিনরাত্রি বিভোর।
