–তা হোলে তো, দেব, পৃথিবীর আসক্তি তাঁর এখনও যায়নি? অর্থাৎ আমি উপনিষদের সেই কবির কথা বলচি–
–তার আসক্তি বিশুদ্ধ সৌন্দর্য্যের ধ্যান। কোনো পার্থিব তৃষ্ণা নয়। তাই জনলোকের অধিবাসী, নিজের আনন্দের জন্যে নেমে আসেন। পৃথিবীতে। তাঁর আগমনে পৃথিবীর অনেক উপকার। বহু লেখক ও কবিকে অদৃশ্যভাবে প্রেরণা দান করেন, সেই জন্যেই তিনি পৃথিবীতে আসতে ভালবাসেন। পৃথিবীর হিসেবে বলতে গেলে বহু শতাব্দী ধরে পৃথিবীতে এ কাজ তিনি করেছেন–তাঁর কাজই ওই। আমার সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট বন্ধুত্ব। আমার নিজের কাজে তিনি যথেষ্ট সাহায্য করেন। আমায়।
এবার পুষ্প বিনীতভাবে বল্লে–দেব, একদিন আমাদের কুটিরে পদার্পণ করবেন দয়া করে? আপনার বন্ধু সেই তাঁকেও নিয়ে? পরে দেবীকে দেখিয়ে বল্লে–ইনিও যাবেন আমায় বলেচেন দয়া করে।
তরুণ দেবতা বল্লেন–যাবো।
পুষ্প তাঁর পাদস্পর্শ করে প্রণাম করে বল্লে–আমাদের ওপর আপনার এ করুণার জন্য ধন্যবাদ।
যতীন বল্লে–প্রভু, আমার সঙ্গে এক মায়াবাদী সন্ন্যাসীর দেখা হয়েছিল, তিনি তাঁর নিজের শক্তি আমার মধ্যে সঞ্চারিত করে আমায় নির্বিকল্প সমাধিলাভ করিয়েছিলেন, সে এক অপূৰ্ব্ব অনুভূতি। সে কথা আমি এখনও ভুলিনি–
–তিনি কোনো যোগী সাধক হবেন। ব্রহ্মে লীন হওয়ার আস্বাদ ইচ্ছামত ভোগ করেন–মুক্ত পুরুষ। তাঁর ইচ্ছামত কায়াব্যুহ রচনা করে যে কোনো দেহে অনুপ্রবেশ করতে পারেন। সমস্ত ঐশ্বৰ্য্য ওদের সংকল্প মাত্রেই উপস্থিত হয়–
–প্রভু, ভারতবর্ষ ছাড়া অন্য কোনো দেশে এই ব্যাপারের চর্চা ছিল?
–নিশ্চয়ই। যে কোনো দেশে যে কোনো সৎ, ঈশ্বরে ভক্তিমান। লোক মানব-আবৰ্ত্তকে জয় করতে পারেন। বিশ্বের যিনি কৰ্ত্তা, তিনি কোনো বিশেষ দেশ বা বিশেষ জাতিকে কৃপা করেন না।
–আচ্ছা আমাদের দেশে যাঁরা বলেন, ভগবানের নাম জপ করলে মুক্তি যেমন ধরুন বৈষ্ণব সম্প্রদায়, তাঁদের মত কি সত্য?
-ভক্তি দ্বারা তাঁরা ভগবানে আতস্থ হয়ে দেবযান প্রাপ্ত হন। জীব মাত্রেই ব্রহ্মের অংশ জানবে। উপাধি ও নামরূপ ত্যাগ করে পরব্রহ্মে লীন হওয়ার নামই মুক্তি। বিভিন্ন পথ, বিভিন্ন মত। কিন্তু জ্ঞানী লোক ধ্যানদৃষ্টি দ্বারা সেই একই সত্যকে উপলব্ধি করচেন বহু প্রাচীন যুগ থেকে। শুধু এ কল্প নয়, পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কল্পের তাই হয়েছিল। পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব কল্পের মুক্ত পুরুষেরা এ কল্পে পৃথিবীতে দেহ ধরে তাঁদের পূর্ব জীবনের সাধনলব্ধ জ্ঞান প্রচার করতে নামেন। তাঁরাই তোমাদের শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, শঙ্কর, চৈতন্য, বাল্মীকি, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ইত্যাদি
এ পর্যন্ত বলেই তিনি চুপ করে গেলেন। হঠাৎ পূৰ্ব্বদিগন্তে অরুণ সূর্যোদয় দূরদূরান্তরের তুষারাবৃত্ত শৈলশিখর অনুরঞ্জিত করে অপূৰ্ব্ব মহিমায় স্বপ্রকাশিত হোল এক মুহূর্তে। পলকে পলকে শিখর থেকে শিখরান্তরে বর্ণসমুদ্রের বিভিন্ন রঙের ঢেউ গেল ছড়িয়ে। সকলে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সে মহিমময় সৌন্দর্য্যের দিকে।
করুণাদেবী বলে উঠলেন সাগ্রহে–চলো মানস-সরোবরে–চলো, চলো–
তখনি ঠিক পটপরিবর্তনের মত একটা ব্যাপার ঘটে গেল। এই ছিল অরুণরাগে রঞ্জিত শৈলশিখর ও অরণ্যানী, তখনি যতীন ও পুষ্প বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলে তাদের সামনে কোনো বিশাল জলাশয়ের নীল জলরাশি বিস্তৃত।
অপরকূলে তুষারাবৃত শৈলচুড়া, সবে প্রভাত হয়েছে কিন্তু সেই তুষারময় মেরুবৎ প্রদেশে কোনো বিহঙ্গকাকলী নেই কোনোদিকে। সমগ্র পাৰ্ব্বত্যহ্রদের গম্ভীর সৌন্দর্য্য যতীন ও পুষ্পকে মুগ্ধ করলে।
করুণাদেবী বল্লেন–ওই দূরে রাবণহূদ, সামনে এটা মানস-সরোবর।
তরুণদেবতা বল্লেন–সামনের ওই পাহাড়ের চূড়া গুরলা মান্ধাতা আর ওই দূরে কৈলাসপুষ্পের মনে পড়ে গেল কৈলাস পর্বতে অনেক সিদ্ধ মহাপুরুষ লোকচক্ষুর অগোচরে বাস করেন–ওঁদের কাউকে দেখবার ইচ্ছা অনেকদিন থেকেই আছে তার। করুণাদেবীর কাছে। সেকথা তুলতেই তিনি তরুণদেবতাকে পুষ্পের বাসনা জানালেন।
তিনি বল্লেন–একজন জীবন্মুক্ত সাধু ওখানে আছেন, আমি দু একবার তাঁকে সাহায্য করেছিলাম কোনো কাজে। তবে তিনি আমাকে দেখেননি–চলো নিয়ে যাই।
কৈলাসপৰ্ব্বত ও সম্মুখবর্তী গুরলা মান্ধাতা চূড়ার মধ্যে বরফের বিশাল ক্ষেত্র–যতীন কখনো গ্লেসিয়ার বা তুষার প্রবাহ দেখেনি, ওর। মনে কথাটা উঠলো, যা সামনে দেখচে, সেটাই বোধ হয় গ্লেসিয়ার। তরুণদেবতা ওর মনের ভাব বুঝে বল্লেন–তুমি যা ভাবছো তা এ নয়। চলো এখান থেকে তোমায় শতপন্থ বরফস্রোত দেখিয়ে আনবো।
ওরা কৈলাস পর্বতে গিয়ে দেখলে কৈলাস একটি সম্পূর্ণ আলাদা। পৰ্ব্বত, তার তুষারমণ্ডিত পিনাকসদৃশ শিখরের নিম্নভাগে অনেকগুলি গুহ। সাধু যোগীদের আবাস। একটি গুহায় একজন শীর্ণকায় সাধুকে দেখিয়ে দেবতা বল্লেন–এঁর কথা বলছিলাম। উনি এখন স্থূলদেহের স্থলচক্ষে আমাদের দেখতে পাবেন না–নিৰ্ব্বিকল্প সমাধিস্থ অবস্থায় ইনি ব্রহ্মের সঙ্গে এক হয়ে যান, তখন আমাদেরও অনেক ওপরে চলে যান উনি। তবে স্থূল দেহে ওঁরা সাধারণ মানুষের সমান।
যতীন বল্লে–আচ্ছা, এরা একা আছেন কেন?
–নির্জনতা আত্মার উন্নতির একটি প্রধান উপায়। নিম্নজগতের কোনো প্রভাব এই উত্তুঙ্গ জনহীন পৰ্ব্বতচূড়ায় এঁদের দেহমন স্পর্শ করে না। নির্জনতায় এঁরা শক্তি অর্জন করেন ব্রহ্মজ্যোতিঃ এঁদের মনে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে এ অবস্থায়।
