করুণাদেবী বল্লেন–এই দেখ যে পৃথিবীর কথা তোমায় বলেছিলাম।
–স্লো–মানে ধীরগামী পৃথিবী?
–করুণাদেবী হেসে ফেলতেই যতীন অপ্রতিভ হয়ে বল্লে–না, ইংরিজিটা আপনি হয়তো জানেন কি না–মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল–ও ভাষা কি আপনারা–মানে ম্লেচ্ছ ভাষা–
গ্রহদেব বল্লেন–তুমি এখনও বুঝলে না। আমাদের কেনো ভাষা নেই, যখন যে পৃথিবীতে, যে মানুষের সঙ্গে কথা কই–তাদের ভাষাই আমাদের ভাষা। পৃথিবীতে প্রচলিত যে কোন ভাষাই হোক–তা। আমাদের আপন। ইটালী দেশের কোনো লোকের সঙ্গে কথা বলবার সময় তাদের ভাষাতেই বলবো
–আপনাদের মধ্যে কথাবর্তা তাহোলে কি ভাষায়–কেন, বাংলাতেই তো আপনাদের মধ্যে বলছিলেন?
করুণাদেবী বল্লেন–মুখ দিয়ে কথা বলার দরকার হয় না কোনো স্বর্গেই–চতুর্থস্তরের ওপরে কোথাও। মনের মধ্যে পরস্পরের কথা ফুটে ওঠে–আরও ওপরে স্বর্গে রঙীন আলোর বিদ্যুৎশিখার মত আলোর ভাষার আদানপ্রদানে কথাবার্তা চলে। আমাদের ভাষা তোমাদের মত “কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো” তা হয় না। মরমেই আগে পশে–কান শুনতেই পায় না–শোনবার দরকার হয়। না। কিন্তু তোমাদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হচ্চে বলেই আমরা মুখের ভাষা ব্যবহার করি।
পুষ্প বল্লে–এই পৃথিবী কিন্তু আমার বেশ লাগচে। একটু বেড়ানো গেলে মন্দ কি?
বৈশ্রবণ বল্লেন–বেশ তো, ভাল করেই দেখতে পারো।
এক হ্রদে কতগুলি সুসজ্জিতা নরনারী নৌকাতে প্রমোদবিহার করছিল। দেবতা সেখানে গিয়ে বল্লেন–ক’বছর এরা এমনিধারা জল-বিহার করচে জানো? তোমাদের পৃথিবীর মাপে তিনটি বছর। তাড়াতাড়ি নেই কিছু এদের।
যতীন সবসময়ে বল্লে–তিনটি বছর!
–ঐ যে বল্লাম ধীরে সুস্থে এখানে সব হয়। নৌকাতে জলবিহার। চলছে তো চলছেই। ওদের গিয়ে বল যদি, বিস্মিত হবে।
যতীনের মনে পড়ে গেল বাল্যে কলেজের ক্লাসে পড়া টেনিসনের কবিতার সেই মৃণালভোজীর দেশ বা Land of Lotus-eaters!… সেখানেও সব লোক–
পরে কার সঙ্গে কথা বলতে যাচ্চে ভেবে সে লজ্জায় চুপ করে গেল।
দেবতা বল্লেন–চলো আরও দেখবে।
এক পাহাড়ের শ্যাম সামুতে বনপুষ্পবিকশিত নির্জন অঞ্চলে সে দেশের কবিকুলের মজলিস বসেচে। সেখানে সুদীর্ঘসময়-ব্যাপী গোধূলিতে তারা আরামে কাব্য আলোচনা করচে, পরস্পর পরস্পরকে আবৃতি করে শোনাচ্চে নৈসর্গিক শোভা, বনপুষ্পের লাবণ্য সম্বন্ধে নানা কবিতা। নারীপ্রেম নিয়ে কত সঙ্গীত রচনা করে বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে অতি সুকুমার মাধুর্য্যের সঙ্গে ললিত স্বরে গাইচেযেন জীবন অনন্ত, সময় অনন্ত। সে সঙ্গীতের ঘুমপাড়ানি মাধুৰ্য্য সত্যিই চোখে ঘুম নিয়ে আসে শুনে যতীনের সত্যিই মনে হচ্ছিল দিগন্তের পাণ্ডুর শোভা শৈলসানুতটে যে শান্তি ও শ্রী বিস্তার করছে তাতে সব ভুলিয়ে দেয়, জীবনের যুদ্ধ অবাস্তব কাহিনী–জীবন শুধু এমন নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব গোধূলি দিয়ে ভরা–আর কোথাও ছুটোছুটি করে কি হবে, এখানেই ঘুমিয়ে পড়া যাক দিব্যি।
যতীন বল্লে–আমাদের পৃথিবীতেও এরকম নেই কি দেব?
–আছে, সে অন্য রকম। এরা এদেশের বসন্তকালের ব্যেপে এরকম উৎসব চালাচ্চে–এদের বসন্তের স্থায়িত্ব কত জানো? ন’বছর। পৃথিবীর হিসেবে।
যতীন হাঁ করে অবাক হয়ে চেয়ে রইল দেবতার মুখের দিকে।
করুণাদেবী ওর বিস্ময় দেখে কৌতুক অনুভব করলেন। বল্লেন– নইলে তোমার ভাষায় স্লো ওয়ার্ল্ড হবে কি করে?
ও আরও অবাক হয়ে বল্লে–বা রে, আপনি যে ইংরিজি–
–সব ভাষাতেই কথা বলতে পারি, আমরা, বল্লাম যে। ভাষা কিছুই নয় আমাদের কাছে। তারপর শোনো, এদের বছর কতদিনে জানো? পৃথিবীর ষাট বছরে এদের দেশের এক বছর। ঐ দেখ বৃহস্পতি গ্রহ ঘুরচে কত আস্তে আস্তে। সূর্য থেকে যে গ্রহ যত দূরে, তাঁর আবৰ্ত্তণ তত স্লো। আবার এই উপগ্রহের একটা নিজস্ব আবৰ্ত্তন আছে নিজের কক্ষে–সব মিলিয়ে দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ রাত্রি, দীর্ঘ পথ, দীর্ঘ বছর এখানে। মানুষও ধীর গতিতে চলে, বহু সময় নিয়ে কাজ করে, বহু সময় নিয়ে আমোদ করে, বদলায় অনেক সময় নিয়ে। পৃথিবীর মত তাড়াহুড়ো নেই, ব্যস্ততা নেই।
–এদের আয়ু?
–তিনশো বছর প্রায়, তোমার পৃথিবীর হিসেবে। ধীরগামী আত্মা, পৃথিবীর পঞ্চাশ-ষাট বছর বয়সে যারা উন্নতি করতে পারবে না, কিছু বুঝতে পারবে না–এখানে পুনর্জন্ম গ্রহণ করিয়ে দেওয়া হয়। এখানে তারা যাতে ঘুমিয়ে না পড়ে তার ব্যবস্থা আছে।
–কি রকম ব্যবস্থা বড় জানতে ইচ্ছে হচ্চে–
দেবতা হেসে বল্লেন–রুদ্র ব্যবস্থা কিছু নেই, পৃথিবীতে যেমন আছে। যুদ্ধ-বিগ্রহ, ব্যাধি, মহামারী, বিপ্লব, দুর্ভিক্ষ। এখানকার মানুষেরা একটু অলস, একটু ধীর-বুদ্ধি–এদের ওপর দয়া করতে হয় অনেকখানি। সবই তাঁর ব্যবস্থা (এখানে গ্রহদেবের মুখশ্রী শ্রদ্ধায়, সম্বমে, ভক্তিতে কোমল হয়ে এল), তিনি তাঁর অসীম করুণায় এ ব্যবস্থা করেছেন আমরা তাঁর নিয়োজিত ভৃত্য মাত্র। এ কি দেখছো। এর চেয়েও ধীরগামী জগৎ আছে, তবে এ সৌরমণ্ডলে নয়। তিনিই এই সব অলস জড়বুদ্ধি জীবের জগতে উচ্চস্তরের দেবদূত পাঠিয়ে দেন, তাঁরা দেহধারণ করে আসেন এদের শিক্ষা দিতে। তাঁরাই এ সকল পৃথিবীর শ্রীকৃষ্ণ, বুদ্ধ, যীশু, শ্রীচৈতন্য, শঙ্কর, ব্যাস, দ্বৈপায়ন–সবাইকে তাঁর লীলাসহচর না করে নিলে তাঁর সুখ নেই। তাঁর অপার অনন্ত করুণার কথা তোমরা কি জানো? কেবল দুঃখ হয় মানুষে তাঁকে আগাগোড়া ভুল বুঝছে। কে তাঁকে জানে বা জানবার চেষ্টা করে? মানুষ যদি এক পা এগিয়ে যায়, তিনি তিন পা এগিয়ে আসেন মানুষের দিকে। অথচ সবাই নিজেকে নিয়ে উন্মত্ত, পৃথিবীর সুখ নিয়ে দিশাহারা–তিনি। উদাসীন, কেউ তাঁকে চায় না দেখে অপেক্ষা করে করে দোর থেকে চলে যান। কেউ গ্রাহ্য করে না। জগৎজোড়া বনফুলের মালা তাঁর গলায়—অথচ–
