যতীন বার বার ওই এক কথা শুনে একটু বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। সে বিরক্তি না চাপতে পেরে বলে উঠলো–দেব, তার জন্যে আমি দুঃখিত নই। পৃথিবীতে জন্ম নিলে কষ্টটা কি?
–আমি জানি। যে জানে সে ও বিশ্বের সব কিছু এবং বিশ্বদেব। একবস্তু এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই–তার পক্ষে পৃথিবী বা স্বর্গ সমান হয়ে গিয়েছে। যে জানে পৃথিবীর সব কিছুই তিনি, তার কাছে পৃথিবী ও স্বর্গ এক সুরে বাঁধা মোহন সঙ্গীতে। তোমাদের জ্ঞানী লোকেরা তাই তোমাদের শ্রীকৃষ্ণকে বংশীধারী কল্পনা করেছেন। কিন্তু এ চোখে পৃথিবীর সবাই দেখে কি? সাধারণ মানুষ কৰ্ম্ম অনুসারে প্রথম তিন স্তরে গতাগতি করে, ম’রে ভূলোক থেকে ভুবর্লোকে আসে, সেখানে থেকে উন্নতি করে স্বর্গলোকে আসে–আবার সেখান থেকে জন্মায় পৃথিবীতে, আবার মরে, আবার জন্মায়, আবার মরে। এ’কে বলে মানব-আবৰ্ত্ত। চাকার মত ঘুরচে এই আবর্ত-চলো, একটা ব্যাপার তোমায় দেখাই, পৃথিবীতেই চলো, সেখানে তোমরা সহজ ও স্বচ্ছন্দ অবস্থায় থাকবে। চলো তোমাদের দেশেই নিয়ে যাই
মহাশূন্যের পথহীন পথে করুণাদেবী ওদের নিয়ে আগে আগে চল্লেন। দূরে একটা কি বিশাল গ্রহ নিরন্ধ্র অন্ধকার সমুদ্রে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরচে। হু-হুঁ করে নেমে এল–একটু পরে পৃথিবীর এক তুষারাবৃত পর্বতশিখর ডিঙিয়ে ওরা এক নদীর ওপরকার শূন্যে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল।
দেবতা পিছনে পিছনেই আসছিলেন। বল্লেন–এটা চিনতে পারচো কী নদী?
যতীন বল্লেনা দেব, ঘোর অন্ধকার পৃথিবীতে কিছু দেখতে পাচ্চিনে–এখন বোধ হয় রাতদুপুর।
করুণাদেবী হেসে বল্লেন–এত বড় নদী বাংলাদেশে ক’টা আছে। আন্দাজ করে বলো।
–আজ্ঞে, হয় গঙ্গা, নয় পদ্মা।
–ওই রকমই, এটা গঙ্গা।
দেবতা হেসে বল্লেন–তুমিও ঠিক ভাল বলতে পারলে না, গঙ্গা তো বটে। মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গা–
যতীন বিস্ময়ের সুরে বল্লে–আপনি বাংলাদেশের সব খবর জানেন দেখচি।
করুণাদেবী মৃদু সস্নেহ হাস্যে ওকে নেপথ্যে বল্লেন–ও রকম বোলো না। উনি কে তা তোমরা জানো না। পরে বলবো।
একটা ছোট্ট খাল। একটা আমবাগান। মুর্শিদাবাদ জেলা, সুতরাং বনবাগান বেশি নেই, মস্ত বড় মাঠ একদিকে, একদিকে ছোট্ট একটি গ্রাম। যতীন বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলো সেই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেই গ্রামের ঘরের আনাচে-কানাচে অনেকগুলি নিম্নস্তরের ধূসর ও মেটে সিঁদুরের রঙের আত্মা ঘুরে বেড়াচ্চে–কেউ এ-বাড়ী, কেউ ও-বাড়ী। তারা যদি মানুষ হোতো তবে আনাচে-কানাচে এদের এমনতর গতিবিধি দেখে সন্দেহ হোত এরা নিশ্চয়ই চোর বা ডাকাত।
যতীন অবাক হয়ে বল্লে–তাই তো, এরা কি করচে এখানে?
পুষ্প হাসিমুখে বল্লে–আমি বুঝতে পেরেছি অনেকটা, যদি তাই হয়, যা ভেবেচি
যতীন বল্লে–কি পুষ্প?
তরুণ দেবতা বল্লেন–পুষ্প বুঝেচে। ওরা পৃথিবীতে জন্ম নেবার জন্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতি রাত্রেই এমনি লোকের বাড়ীর আশে পাশে ঘোরে। কিন্তু ভিড় বেশি–সবাই সুবিধে পায় না। তৃষ্ণাই পুনর্জন্ম গ্রহণ করায়। ভুবর্লোকে ওদের ভাল লাগছে না, সেখানে পৃথিবীর স্থল বাসনা কামনার পরিতৃপ্তি হয় না–সুতরাং ওরা চাইচে আবার দেহ ধরতে। কিন্তু তার প্রার্থী অনেক। ওদেরই মত। সুতরাং জন্ম নিতে চাইলেও জন্ম নেওয়া হয় না। উচ্চতর আত্মারা বংশ দেখে, পিতামাতা দেখে জন্ম নেওয়ার সময়ে। এদের সে সব নেই, যে কোন বংশ, জাত, কুল হোলেই হোল। দেহ ধারণ নিয়ে কথা।
যতীন বল্লে–দেব, এরা কতদিন ধরে এমন ঘোরে?
–পৃথিবীর হিসেবে কেউ কেউ দশ বছর পর্যন্ত ঘোরে। এই এক যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা–এই অবস্থাকে প্রেতত্ব বলে তোমরা। কারো স্বাধীন। কাজে আমরা কোনো বাঁধা দিই না–জীব যখন নিজের ভ্ৰম বুঝবে তখন সে নিবৃত্ত হবে। যতদিন তৃষ্ণা, ততদিন তাকে বাধা দিয়ে ফল হবে না। সে ভুবর্লোকে ঘোর অসুখী অবস্থায় থাকবে–তার চেয়ে, যাও বাপু, পৃথিবীতেই গিয়ে সুখী হও। চলো, এখানে কষ্ট হচ্চে–আর নয়–
ওরা যেখানে এসে বসলো, সেটা একটা পর্বতশিখর, বড় চমৎকার পাইন এবং দেওদার গাছের নির্জন অরণ্যানী। গাছের ডালে ডালে অগণিত পরগাছার রঙ-বেরঙের ফুল। পায়ের নীচে পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে আছে, গভীর রাত্রি। আকাশের মাঝখানে চওড়া জ্বলজ্বলে ছায়াপথ, অসংখ্য ঝঝকে তারকারাজি। ব্রহ্মান্ডের বিরাটত্বের সঙ্কেত!
তরুণ দেবতা বল্লেন–এই হোল হিমালয়। বাংলাদেশের ওপরেই– ওই দ্যাখো দূরে একটা নদী নেমেচে পাহাড় থেকে
যতীন বল্লে–তা হলে বোধ হয় তিস্তা
–তুমি দেখলে তো মানুষের অবস্থা?
–আশ্চৰ্য্য লাগলো, এমন হয় তা জানতাম না, দেব। আপনি যাকে মানব-অবৰ্ত্ত বল্লেন, ওর উচ্চতর অবস্থা কি?
–উচ্চতর সাধনা মানুষকে দেবযান-পথে উচ্চতর লোকে নিয়ে যায়। স্বঃ জনঃ, মহঃ, তপঃ ও সত্যলোক বলেচেন ভারতবর্ষের জ্ঞানী লোকেরা। এত কল্পকাল সেখানে থাকে উচ্চতর জীবাত্মা।
–কল্প কি?
–প্রত্যেকবার সৃষ্টির পরে প্রলয়, প্রলয়ের পরে আবার সৃষ্টি। এই কালব্যাপ্তির নাম কল্প। কল্পান্তে উচ্চতর জীবাত্মারও পতন হয়। তবে সত্যলোকেরও দূরপারে ব্রহ্মাণ্ডের বহিঃস্থিত যে ব্রহ্মলোক, সেখানে যাঁরা যান ভগবানের সঙ্গে তাঁরা এক হয়ে যান। মানবআবর্তে তাঁরা আর ফিরে আসেন না।
–এরই নাম মুক্তি?
–একেই ভারতবর্ষের ঋষিরা মুক্তি বলেচেন। চলো তোমাকে একটি ভারতবর্ষের প্রাচীন কবির কাছে নিয়ে যাবো। উপনিষদ বলে দার্শনিক কবিতা ভারতবর্ষের, তিনিও তার একজন রচয়িতা। ভ্রাম্যমান কবি, সব সময় পাহাড়ে সমুদ্রতীরে বনানীর নির্জনতায় কাল কাটান। পৃথিবীর মধ্যে এই হিমালয় এবং আরও অনেক উচ্চতর পর্বতের বনে। বৃক্ষলতায় প্রায়ই মাঝে মাঝে রূপের ধ্যানে মগ্ন থাকেন। আর মিশর। দেশের এক উচ্চ আত্মার সঙ্গে পরিচয় করাবো।
