এমন সময় একটি বিস্ময়কর আবির্ভাবের মত করুণাদেবী হঠাৎ যেন জ্যোতিঃপদ্মের মত ফুটে উঠলেন সেই বনস্থলীর প্রান্তে। স্নেহ ও প্রসন্নতা দেবীর বিশাল চক্ষু দুটির ঘন নীল তারকায়। হেসে বল্লেন– আমি তোমাদের দেখে এক জায়গা থেকে ফিরে এলাম–
পুষ্প লজ্জিত ও অপ্রতিভের সুরে বল্লে–আপনার কাজে বাধা দিলাম দেবী?
করুণাদেবী হেসে বল্লেন–না। আমিও ইচ্ছে করেছিলাম তোমরা আজ এখানে আসবে–বসো, এসো এই গাছের তলায়।
যতীন ও পুষ্প গাছের তলায় ওঁর পাশে বসে পথিক দেবতার অদ্ভুত আবির্ভাবের ব্যাপার বল্লে। করুণাদেবী সব শুনে বল্লেন–ভগবান বা ব্রহ্মের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী কোনো নাস্তিক দেবতা, তবে মহাশক্তিধর বটে। আমার জানা নেই।
যতীন বল্লে–এত যিনি দেখে বেড়াচ্ছেন তিনি নাস্তিক?
–ওঁরা অন্য বিবর্তনের প্রাণী।
–পৃথিবীর নয়?
-না, অন্য কল্পের। সে শুনবে এখন। চলো, যেখানকার কাজ ফেলে এখানে এসেছি, সেখানে তোমাদের নিয়ে যাই।
দুজনেই চোখ বোজ। যতীনের জ্ঞান যাতে থাকে, তার ব্যবস্থা। করতে হবে, নয়তো সে উচ্চস্তরে গিয়েও কিছু দেখতে পাবে না, বুঝতে পারবে না। এক মুহূর্তে ওরা অনুভব করলে খুব অদ্ভুত এক জায়গায় এসেচে। ওরা এক নিমিষে যেন বিরাট আত্মা হয়ে গিয়েছে, বাধাবন্ধনহীন সবসংস্কারমুক্ত দেবাত্মা। দেশ ও কাল উপন্যাসের কাহিনী যেন,–এই ছিল কোথায়, এই এল কোথায়। দেশ অতিক্রম করতে হোল না, কালের ব্যবধান অনুভূত হোল কই?
সেও এক বিচিত্র দেশ। বাতাসে যেন নব প্রস্ফুটিতা মৃণালিনীর সুগন্ধ। এক বিশাল সুনীল সমুদ্রের ঢেউ তটশিলায় এসে আছড়ে পড়চে; সমুদ্রের মাঝে মাঝে ম্যাজেন্টা রঙের, ধূসর কৃষ্ণ রঙের ছোট বড় পাহাড় ইতস্তত ছড়িয়ে। সমুদ্রের তীরে একটি অরণ্য-বৃক্ষের তলে এক রূপবান জ্যোতির্ময় তরুণ দেবতা বসে একমনে চিন্তা করছেন।
যতীন এমন দৃশ্য কখনো দেখেনি, এমন অপূৰ্ব্ব রূপবান। মহাজ্যোতিষ্মন দেবমূৰ্ত্তি। সে শ্রদ্ধায় বিস্ময়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল।
পুষ্প তাঁকে দেখে কিন্তু অবাক হয়ে গেল অন্য কারণে। এঁকে সে অনেক বছর আগে দেখেছিল, যেদিন সে যতীনকে পঞ্চমস্তরে নিয়ে যেতে যেতে তার সংজ্ঞাহীন দেহ দ্বারা বিপদগ্রস্ত হয়েছিল। সেই তরুণ দেবতা, যিনি সেদিন শৈলশিখরে বসেছিলেন।
দেবতা করুণাদেবীর দিকে চেয়ে বল্লেন–এরা কে?
পুষ্প বল্লে–দেব, আপনি আমাকে দেখেচেন এর আগে–সেই একদিন–
করুণাদেবী বল্লেন–এদের কথা তোমাকে বলেছিলাম। এর নাম পুষ্প, ওর নাম যতীন, তোমার পৃথিবীরই নাম বাপু–
দেবতা প্রসন্ন দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে বল্লেন–ও, বুঝেচি।
পরে যতীনের দিকে চেয়ে বল্লেন–কিন্তু একে নিয়ে এসে ভাল করলে না। এর এখনো অনেক দেরি। পার্থিব তৃষ্ণা এর এখনও যায়নি। এত উঁচু স্বর্গে একে আনলে এর ফল হবে এই, আগামী জন্মে এর স্মৃতি ওকে কষ্ট দেবে–কোন কিছুতে মন বসাতে পারবে না। তুমি তো জানো, তৃতীয়স্তরের কোনো লোককে এখানে আনা সেই ব্যক্তির পক্ষেই ক্ষতিকর।
করুণাদেবী ঝগড়া করার সুরে বল্লেন–বেশ করেচি, যাও। তুমি ওর সব স্মৃতি মুছে নিও, নয়তো আমি দেবো। দেখাতে নিয়ে আসিনি। শুধু, ওর অনেক প্রশ্ন আছে, জানতে ইচ্ছে হয়েছে।
যতীন ভাবছিল তার কি মহাপুণ্য ছিল, আজই এমন দুটি জ্যোতির্ময় দেবতার দর্শনলাভের সৌভাগ্য তার ঘটলো! কি অদ্ভুত রূপ!
সে বিনীত সুরে বল্লে–যদি দেখার সৌভাগ্যই ঘটলো, তবে দেবতা, আমায় এমন করে দিন, যাতে এখানে বার বার আসতে পারি বা আপনার দেখা পেতে পারি তার ব্যবস্থা করে দিন।
তরুণ দেবতা করুণাদেবীর দিকে চেয়ে হেসে বল্লেন–ওই দেখলে তো কি বলচে? এদের অজ্ঞানতা ঘুচতে অনেক বিলম্ব।
পুষ্প হাত জোড় করে বল্লে–আপনি ওঁকে দয়া করে ক্ষমা করুন। উনি নতুন এ স্তরে এসেছেন, এখানকার কিছুই জানেন না।
যতীন অপ্রতিভ না হয়ে বল্লে–আপনি দয়া করলেই সব হবে। কিছুক্ষণ আগে আমাদের ওদিকে একজন কে এসেছিলেন, তাঁর কথা
যা শুনলাম তাতে আমি অবাক হয়ে গিয়েছি। আমার সব জানবার ইচ্ছে হয়েছে, তিনি কত গ্রহনক্ষত্র বেড়িয়ে এসেছেন–আমায় এর আগে বলেছিলেন সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন–
দেবতা বল্লেন–কে?
করুণাদেবী বল্লেন–পথিক কেউ হবে। দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়ানোই তাঁর কাজ বলে মনে হোল। নাস্তিক দেবতা।
তরুণ দেবতা একটুখানি চুপ করে থেকে বল্লেন–নাস্তিক কি? মনে হয় না। ওদের উপাসনাই ওই। বিশ্বে-ব্রহ্মাণ্ডে এমন অনেক
আবিষ্কারক আছে, এদের শক্তি যথেষ্ট, তেজ অসীম। তাদের মধ্যে কেউ হবে। আচ্ছা, তোমরা আমার সঙ্গে চলো আর একটা জায়গা দেখিয়ে আনি–
যতীন বল্লে–দেবতা, আপনার কথা আমি ওই মেয়েটির মুখে আগে শুনেছি। তবে আপনাকে দেখবার সৌভাগ্য হয় নি আমার।
–না, কি করে দেখবে। পুষ্প আর তুমি এক স্তরের লোক নও
পুষ্প বল্লে–উনি এক বিপদে পড়েছিলেন–চুম্বকের ঢেউএ পড়ে পৃথিবীতে গিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন–সবে এসেছেন সেখান থেকে।
দেবতা ধীরভাবে বল্লেন–তা সম্পূর্ণ সম্ভব। খুব সাবধানে চলাফেরা কোরো। ওই যে পথিক দেবতার কথা বলছিলে, ওঁরা এ কল্পের জীব নন। পূৰ্ব্ব কল্পে ওঁদের দেবত্বপ্রাপ্তি হয়েচে মুক্ত আত্মা হয়ে বহু ঊর্ধ্বে উঠে বহু তেজ সঞ্চয় করেছেন, কিন্তু ওঁরাও পুনর্জন্মের আকর্ষণকে ভয় করে চলেন। তবে এই লোকটির এখনও অনেক জন্ম বাকি একে পৃথিবীতে জন্মাতে হবে অনেকবার।
