পথের ধারে একটা গাছতলায় পাকা বেল পড়িয়া রহিয়াছে দেখিয়া হাজারি সেটা সংগ্রহ করিয়া লইল। কাল সকালে খাওয়া চলিবে।
সব ভাল–কিন্তু তবু হাজারির মনে হয়, এ ধরণের ভবঘুরে জীবন তাহার পছন্দসই নয়। বৃথা ঘুরিয়া বেড়াইয়া কি হইবে? চাকুরি জোটে তো ভাল। নতুবা এ ধরণের জীবন সে কতকাল কাটাতে পারে?…একমাসও নয়। সে চায় কাজ, পরিশ্রম করিতে সে ভয় পায় না, সে চায় কর্মব্যস্ততা, দু-পয়সা উপার্জন, নাম, উন্নতি। ইহার উহার বাড়ী খাইয়া বেড়াইয়া, পথে পথে সময় নষ্ট করিয়া লাভ নাই।
গোপালনগর বাজারে পৌঁছিতে বেলা গেল। বেশ বড় বাজার, অনেকগুলি ছোট দোকান, ভাল ব্যবসার জায়গা বটে। হাজারি একটা বড় কাপড়ের দোকানের সামনের টিউবওয়েলে হাতমুখ ধুইয়া লইল। নিকটে একটা কালীমন্দির–মন্দিরের রোয়াকে বসিয়া সম্ভবত মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণ হুঁকা টানিতেছে দেখিয়া হাজারি তামাক খাইবার জন্য কাছে গিয়া দাঁড়াইয়া বলিল–একবার তামাক খাওয়াবেন?
–আপনারা?
–ব্রাহ্মণ।
–বসুন, এই নিন।
–আপনি কি মন্দিরে মায়ের পূজা করেন?
–আজ্ঞে হাঁ। আপনার কোথা থেকে আসা হচ্চে?
–আমার বাড়ী গাংনাপুরের সন্নিকট এঁডোশোলা। রাঁধুনীর কাজ করি–চাকুরির চেষ্টায় বেরিয়েছি। এখানে কেউ রাঁধুনী রাখবে বলতে পারেন?
–একবার এই বড় কাপড়ের দোকানে গিয়ে খোঁজ করুন। ওঁরা বড়লোক, রাঁধুনী ওঁদের বাড়ীতে থাকেই–বাবুর ছোট ভাইয়ের বিয়ে আছে, যদি এ সময় নতুন লোকের দরকার টরকার পড়ে–ওঁ জাতে তিলি, বাজারের সেরা ব্যবসাদার, ধনী লোক।
হাজারি কাপড়ের দোকানে ঢুকিয়া দেখিল একজন শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারার লোক গদির উপর বসিয়া আছে। সেই লোকটিই যে দোকানের মালিক, ইহা কেহ বলিয়া না দিলেও বোঝা যায়। হাজারিকে ঢুকিতে দেখিয়া লোকটি বলিল–আসুন, কি চাই? ওদিকে যান–ওহে, দেখ ইনি কি নেবেন–
বলিয়া লোকটি দোকানের অন্য যে অংশে অনেকগুলি কর্মচারী কাজ-কর্ম ও কেনাবেচা করিতেছে সে দিকটা দেখাইয়া দিল।
হাজারি বলিল–বাবু, দরকার আপনার কাছে। আমি রান্না করি, ব্রাহ্মণ–শুনলাম আপনার বাড়ীতে রাঁধুনী রাখবেন—তাই–
–ও। আপনি রান্না করবেন? রাঁধতে জানেন ভাল? কোথায় ছিলেন এর আগে?
–আজ্ঞে রাণাঘাট হোটেলে ছিলাম সাত বছর।
–হোটেলে? হোটেলের কাজ আর বাড়ীর কাজ এক নয়। এ খুব ভাল রান্না চাই। আপনি কি তা পারবেন? কলকাতা থেকে কুটুম্ব আসে প্রায়ই—
হাজারি হাসিয়া ভাবিল–তুমি আর কি রান্না খেয়েছ জীবনে, কাপড়ের দোকান করেই মরেছ বই তো নয়। তেমন রান্না কখনো চোখেও দেখনি।
মুখে বলিল–বাবু, একদিনের জন্যে রেখে দেখুন না হয়। রান্না ভাল না হয়, এমনি চলে যাব। কিছু দিতে হবে না।
দোকানের মালিক পাকা ব্যবসাদার, লোক চেনে। হাজাবির কথার ধরণ দেখিয়া বুঝিল এ বাজে কথা বলিতেছে না। বলিল–আচ্ছা আপনি আমাদের বাড়ী যান। এই সামনের রাস্তা দিয়ে বরাবর গিয়ে বাঁ-দিকে দেখবেন বড় বাড়ী–ওরে নিতাই, তুই বাপু এক বার যা তো, ঠাকুর মশায়কে বাড়ীতে শশধরের হাতে তুলে দিয়ে আয়। বলগে, ইনি এ থেকে রাঁধবেন। বুঝলি? নিয়ে যা–মাইনে-টাইনে কিন্তু, ঠাকুর মশায়, পরে কাজ দেখে ধাৰ্য্য হবে। হ্যাঁ–সে দু-চারদিন পরে তবে–নিয়ে যা।
প্রথম দিনের কাজেই হাজারি নাম কিনিয়া ফেলিল। বাড়ীর কর্তা দশ টাকা বেতন ধার্য করিয়া দিলেন। তাঁহার গৃহিণী অসুস্থ প্রায় বারোমাস, উঠিতে বসিতে পারলেও সংসারের কাজকর্ম বড় একটা দেখেন না–দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গিয়াছে, তাহারা থাকে শ্বশুরবাড়ী একটি ষোল-সতের বছরের ছেলে স্কুলে পড়ে, আর একটি আট বছরের ছোট মেয়ে।
বাড়ীর সকলেই ভাল লোক–এতদিন চাকুরি করিয়া হাজারির যে খারাপ ধারণা হইয়াছিল পরের চাকুরি সম্বন্ধে, এখানে আসিয়া তাহা চলিয়া গেল। ইহারা জাতিতে গন্ধবণিক, বাড়ীর সকলেই ব্রাহ্মণকে খাতির করিয়া চলে–হাজারির মৃদু স্বভাবের জন্যও সে অল্পদিনের মধ্যে বাড়ীর সকলের বিশেষ প্রিয়পাত্র হইয়া উঠিল।
মাসখানেক কাজ করিবার পর হাজারি প্রথম মাসের বেতন পাইয়াই বাড়ী যাইবার ছুটি চাহিল।
অনেকদিন বাড়ী যাওয়া হয় নাই–টেঁপিকে কত কাল দেখে নাই। দোকানের মালিক ছুটিও দিলেন।
.
গোপালনগর স্টেশনে ট্রেনে চড়িয়া বাড়ী আসিতে প্রায় তিন আনা ট্রেন ভাড়া লাগে। মিছামিছি তিন আনা পয়সা খরচ করিয়া লাভ নাই। হাঁটাপথে মাত্র সাত-আট ক্রোশ হাজারিদের গ্রাম–হাঁটিয়া যাওয়াই ভাল।
বাড়ী পৌঁছিতে সন্ধ্যা হইয়া গেল। টেঁপি ছুটিয়া আসিয়া বলিল–বাবা, এসো, এসো। কোত্থেকে এলে এখন?
তারপর সে ঘরের ভিতর হইতে পাখা আনিয়া বাতাস করিতে বসিয়া গেল। হাজারির মনে হইল তার সারা দেহ-মন জুড়াইয়া গেল টেঁপির হাতের পাখার বাতাসে। টেঁপির জন্য খাটিয়া সুখ–যত কষ্ট যত দুঃখ রানাঘাট হোটেলের–সব সে সহ্য করিয়াছে টেঁপির জন্য। ভবিষ্যতে আরও করিবে।
যদি বংশীধর ঠাকুরের ভাগিনেয় সেই ছেলেটির সঙ্গে—
যাক সে সব কথা।
টেঁপি বলিল–বাবা, অতসীদিদি একদিন তোমার কথা বলচিল–
–আমার কথা? হরিচরণবাবুর মেয়ে?
–হ্যাঁ বাবা, বলচিল তুমি অনেকদিন আসো নি। চল না আজ, যাবে? ওখানে গিয়ে চা খাবে এখন। কলের গান শুনবে।
এই সময় টেঁপির মা ঘাট হইতে গা ধুইয়া বাড়ী ফিরিল। হাসিমুখে বলিল–কখন এলে?
