গাড়োয়ান বলিল–আমার সঙ্গে আসুন ঠাকুর মশায়, কাছেই ছিনগর-সিমলে আমি বামুন বাড়ী যাবো। তেনাদের গাড়ী–গাড়ীতে আসুন।
হাজারি শ্রীনগর-সিমলে গ্রামের নাম শুনিয়াছিল, গ্রামের মধ্যে গাড়ী ঢুকিতে দেখিল এ তো গ্রাম নয়–বিজন বন। এতখানি বেলা চড়িয়াছে এখনও গ্রামের মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশ করে নাই; শুধু আম-কাঁটালের প্রাচীন বাগান, বাঁশবন, আগাছার জঙ্গল।
একটা গৃহস্থ-বাড়ীর উঠানে গরুর গাড়ী গিয়া থামিল। গাড়োয়ানের ডাকে বাড়ীর ভিতর হইতে গৃহস্বামী আসিলেন, ম্যালেরিয়া-শীর্ণ চেহারা, মাথার চুল প্রায় উঠিয়া গিয়াছে, বয়স ত্রিশও হইতে পারে পঞ্চাশও হইতে পারে। তিনি বাহিরে আসিয়াই হাজারিকে দেখিতে পাইয়া গাড়োয়ানকে বলিলেন–কে রে সঙ্গে?
গাড়োয়ান বলিল–এজ্ঞে উনি পাকা রাস্তায় মুদির পুকুরের ধারে বসে ছিলেন, বল্লেন একটু জল খাবো– তা বল্লাম চলুন আমার সঙ্গে–আমার মনিবেরা ব্রাহ্মণ–সেখানে জল খাবেন, তাই সঙ্গে করে আনলাম।
গৃহস্বামী আগাইয়া আসিয়া হাজারিকে নমস্কার করিয়া বলিলেন–আসুন, আসুন। বসুন, বিশ্রাম করুন। ওরে চণ্ডীমণ্ডপের তক্তপোশে মাদুরটা পেতে দে–আসুন।
এসব পল্লী অঞ্চলে আতিথ্যের কোনো ত্রুটি হয় না। আধঘণ্টা পরে হাজারি হাত পা ধুইয়া বসিয়া গাছ হইতে সদ্য পাড়া কচি ডাবের জল পান করিয়া সুস্থ ও খোশমেজাজে হুঁকা টানিতে লাগিল।
গৃহস্বামীর নাম বিহারীলাল বাঁড়ুয্যে। চাকুরি জীবনে কখনো করেন নাই, যথেষ্ট ধানের আবাদ আছে, গরু আছে, পুকুরে মাছ আছে, আম-কাঁটালের বাগান আছে। এসব কথা গৃহস্বামীর নিকট হইতেই হাজারি গল্পচ্ছলে শুনিল।
বিহারী বাঁড়ুয্যে বলিতেছিলেন, শ্রীনগর-সিমলে মস্ত গ্রাম ছিল, রাজধানী ছিল কেষ্টনগরের রাজাদের পূর্বপুরুষের। জঙ্গলের মধ্যে রাজার গড়খাই আছে, পুরোনো ইটের গাঁথুনি আছে, দেখাবো এখন ওবেলা। না না, আজ যাবেন কি? ওসব হবে না। দুদিন থাকুন, আমাদের সবই আছে আপনার বাপ-মার আশীর্বাদে, তবে মানুষজনের মুখ দেখতে পাইনে এই যা কষ্ট। ছেলেবেলাতেও দেখেছি গাঁয়ে ত্রিশ-বত্ৰিশ ঘর ব্রাহ্মণের বাস ছিল, এখন দাঁড়িয়েচে সাত বর মোট–তার মধ্যেও দু ঘর আছে বারোমাস বিদেশে। আপনার নিবাস কোথায় বল্লেন?
–আরে, এঁড়োশোলা-গাংনাপুর থেকে নেমে যেতে হয়।
–তবে তো আপনি আমাদের এদেশেরই লোক। আন না আমাদের গাঁয়ে? জায়গা দিচ্ছি, জমি দিচ্ছি, ধান করুন, পাট করুন, বাস করুন এখানে। তবুও এক ঘর লোক বাড়ুক গ্রামে। আসুন না?
হাজারি শিহরিয়া উঠিল। সর্বনাশ! এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে সে বাস করিতে আসিবে –সেইটকু অদৃষ্টে বাকী আছে বটে! শহর বাজারে থাকিয়া সে শহরের কল-কোলাহল কৰ্মব্যস্ততাকে পছন্দ করিয়া ফেলিয়াছে–এই বনের মধ্যে সমাধিপ্রাপ্ত হইতে হয় যে বৃদ্ধ বয়সে। ছ’চল্লিশ বৎসর বয়স তার–দিন এখনও যায় নাই, এখনও যথেষ্ট উৎসাহ শক্তি তার মনে ও শরীরে। তা ছাড়া সে বোঝে হোটেলের কাজ, একটা হোটেল খুলিতে পারিলে তাহার বয়স দশ বছর কমিয়া যাইবে–নব যৌবন লাভ করিবে সে। চাষবাসের সে কি জানে?
হোটেলের কথা হাজারি এখানে বলিল না। সে জানে হোটেলওয়ালা বামুন বলিলে অনেকে ঘৃণার চক্ষে দেখে–বিশেষত এই সব পাড়াগাঁয়ে।
শ্রীনগরে হাজারির মোটেই মন টিকিতেছিল না–এত বনজঙ্গলের ন্ধকার ও নির্জনতার মধ্যে তাহার যেন দম বন্ধ হইয়া আসিতেছিল। সুতরাং বৈকালের দিকেই সে গ্রামের বাহিরে আসিয়া পথে উঠিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল। ভাবিল–বাপরে! কুড়ি বিঘে ধানের জমি দিলেও এ গাঁয়ে নয় রে বাবা! মানুষ থাকে এখানে? মানুষজনের মুখ দেখার যো নেই, কাজ নেই, কৰ্ম্ম নেই-–কুঁড়ের মতো বসে থাকে। আর গোলার ধানের ভাত খাও– সর্বনাশ!…আর কি জঙ্গল রে বাবা!…
রাস্তার ধারে একটা লোক কাঠ ভাঙিতেছিল। হাজারি তাহাকে বলিল–সামনে কি বাজার আছে বাপু?
লোকটা একবার হাজারির দিকে নীরবে চাহিয়া দেখিল। পরে বলিল–আপনি কি আলেন সিমলে ত্থে?
–হ্যাঁ।
–এখানে আপনাদের এত্ম্য-কুটুম্ব আছেন বুঝি? আপনারা?
–ব্রাহ্মণ।
–পেরণাম হই। কোথায় যাবেন আপনি?
হাজারি জানে পল্লীগ্রাম-অঞ্চলে এই সব শ্রেণীর লোক তাহাকে অকারণে হাজার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া বিরক্ত করিয়া মারিবে। ইহাই ইহাদের স্বভাব। হাজারিও পূর্বে এই রকম ছিল–কিন্তু রাণাঘাট শহরে এতকাল থাকিয়া বুঝিয়াছে অপরিচিত লোককে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে নাই বা করিলে লোকে চটে। হাজারি বর্তমান প্রশ্নকর্তার হাত এড়াই বার জন্য সংক্ষেপে দু-একটি কথার উত্তর দিয়া তাহাকে আবার জিজ্ঞাসা করিল–সামনে কি বাজার পড়বে বাপু?
–এজ্ঞে যান, গোপালনগরের বড় বাজার পড়বে–কোশ দুই আর আছেন।
গোপালনগরের নাম হাজারির কাছে অত্যন্ত পরিচিত। এদিকের বড় গঞ্জ গোপালনগর, সকলেই নাম জানে।
মধ্যাহ্নভোজনটা একটু বেশী হইয়া গিয়াছিল, রাতে খাইবার আবশ্যক নাই। একটু আশ্রয় পাইলেই হইল। সুতরাং হাজারির মন সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত ছিল। এ কয়দিন সে যেন নূতন জীবন যাপন করিতেছে–সকালে উঠিবার তাড়া নাই, পদ্মঝিয়ের মুথনাড়া নাই–বেচু চক্কত্তির কাছে বাজারের হিসাব দিতে যাওয়া নাই–দশ সের কয়লাজ্বলা অগ্নিকুণ্ডের তাতে বসিয়া সকাল হইতে বেলা একটা এবং ওদিকে সন্ধ্যা হইতে রাত বারোটা পর্যন্ত হাতাখুন্তি নাড়া নাই, বাঁচিয়াছে সে।
