হাজারির উত্তর দিতে একটু দেরি হইতেছিল, নেপালবাবু ধমক দিয়া বলিলেন—কথার জবাব দাও?
হাজারি থতমত খাইয়া বলিল, আজ্ঞে চিনি।
পদ্ম ঝি দোরের কাছে মুখে আঁচল চাপা দিয়া দাঁড়াইয়া আছে দেখিয়া হাজারি বুঝিল–কুসুমের কথা সে-ই কর্তাকে বলিয়াছে নতুবা তিনি অতশত খোঁজখবর রাখেন না। কৰ্ত্তামশায় দারোগাকে বলিয়াছেন কথাটা–সে ওই পদ্ম ঝিয়ের উসকানিতে।
–কুসুম থাকে কোথায়?
–গোয়ালপাড়ায়, বড় বাজারের দিকে।
–সে কি করে?
–দুধ-দই বেচে। গরীব লোক–
–বয়েস কত?
–এই চব্বিশ-পঁচিশ–
পদ্ম ঝি একটু মুচকি হাসিল এই উত্তর শুনিয়া, হাজারির তাহা চোখ এড়াইল না। দারোগাবাবুর প্রশ্নের গতি তখনও সে বুঝিতে পারে নাই–কিন্তু পদ্ম ঝিয়ের মুখের মুচকি হাসি দেখিয়া সে বুঝিল কেন ইহারা কুসুমের কথা এত করিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছে।
–তোমার সঙ্গে কুসুমের কত দিনের আলাপ?
–সে আমার গায়ের মেয়ে। সে যখন ছেলেমানুষ তখন থেকে তাকে জানি। তার বাবা আমার বন্ধুলোক–আমাদের পাড়ার পাশেই–
–কুসুমের সঙ্গে তুমি প্রায়ই দেখাশোনা কর–না?
–মাঝে মাঝে দেখা করি বৈকি–গাঁয়ের মেয়ে, তার তত্ত্বাবধান করা তো দরকার– নেপালবাবু হঠাৎ হাসিয়া বলিলেন, নিশ্চয়ই দরকার। এখানে তার শশুরবাড়ী?
–আজ্ঞে হাঁ।
–স্বামী আছে?
-না, আজ বছর চার-পাঁচ মারা গিয়েছে–শাশুড়ী আছে বাড়ীতে। এক দেওর-পো আছে।
–তুমি মাঝে মাঝে হোটেলের রান্না জিনিস তাকে দিয়ে আস?
লজ্জায় ও সঙ্কোচে হাজারি যেন কেমন হইয়া গেল। এসব কথা এখানে কেন?
পদ্ম ঝি খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিয়াই মুখে আঁচল চাপা দিল। নেপালবাবু ধমক দিয়া বলিলেন–আঃ, হাসি কিসের? এটা হাসির জায়গা নয়। চুপ–
কিন্তু দারোগাবাবু ধমক দিলে কি হইবে–পদ্ম ঝিয়ের হাসি সংক্রামক হইয়া উঠিয়া উপস্থিত লোকজন সকলেরই মুখে একটা চাপা হাসির ঢেউ আনিয়া দিল। অন্য লোকের হাসি হাজারি তত লক্ষ্য করে নাই কিন্তু পদ্ম ঝিয়ের হাসিতে সে কিসের একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ঠাওর করিয়া মরীয়া হইয়া বলিয়া উঠিল–দারোগাবাবু, সে গরীব লোক, আমাদের গায়ের মেয়ে, সে আমাকে বাবা বলে ডাকে–আমার সে মেয়ের মত–তাই মাঝে মাঝে কোনদিন একটু-আধটু তরকারী কি রাঁধা মাংস তাকে দিয়ে আসি। কত তো ফেলা-ঝেলা যায়, তাই ভাবি যে একজন গরীব মেয়ে–
–বুঝেছি, থাক আর তোমার লেকচার দিতে হবে না। কাল রাত্রে তুমি সেখানে গিয়েছিলে?
–আজ্ঞে না বাবু।
–আজ সকালে গিয়েছিলে?
-না বাবু, সকালে প্ল্যাটফর্ম থেকেই হোটেলে এসেছি।
দারোগাবাবু অন্য সকলের জবানবন্দী লইয়া ছাড়িয়া দিলেন। কেবল মতি চাকর ও হাজারিকে বলিলেন–আমার সঙ্গে তোমাদের থানায় যেতে হবে। কনস্টেবলদের বলিলেন –এদের ধরে নিয়ে চল।
মতি কান্নাকাটি করিতে লাগিল–একবার বেচু চক্কত্তি, একবার দারোগাবাবুর হাতে পায়ে পড়িতে লাগিল। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ–ঘরের মধ্যে ঘুমাইয়া ছিল, তাহাকে থানায় লইয়া গিয়া কি ফল?–ইত্যাদি।
হাজারির প্রাণ উড়িয়া গেল থানায় ধরিয়া লইয়া যাইবে শুনিয়া।
এ কি বিপদে ভগবান তাহাকে ফেলিলেন?
থানা-পুলিস বড় ভয়ানক ব্যাপার, মোকদ্দমা হইলে উকীল দিবার ক্ষমতা হইবে না তাহার, বিনা কৈফিয়তে জেল খাটিতে হইবে–কত বছর তাই বা কে জানে? না খাইয়া স্ত্রীপুত্র মারা পড়িবে। জেলখাটা আসামীকে ইহার পর চাকুরিই বা দিবে কে?
কিন্তু তার চেয়েও ভয়ানক ব্যাপার, যদি ইহারা কুসুমকে ইহার মধ্যে জড়ায়? জড়াইবেই বোধ হয়। হয়তো কুসুমের বাড়ী খানাতল্লাস করিতে চাহিবে।
নিরপরাধিনী কুসুম! লজ্জায় ঘৃণায় তাহা হইলে সে হয়তো গলায় দড়ি দিবে। আরও কত কি কথা লোকে রটাইবে এই সূত্র ধরিয়া। তাহাদের গ্রামে একথা তো গেলে তাহার নিজেরও আর মুখ দেখাইবার উপায় থাকবে না।
কখনও সে একটা বিড়ি-দেশলাই কাহারও চুরি করে নাই জীবনে–সে করিবে হোটেলের বাসন চুরি! নিজের মুখের জিনিস নিজেকে বঞ্চিত করিয়া সে কুসুমকে মাঝে মাঝে দিয়া আসে বটে–চুরির জিনিস নয় সে সব। সে খাইত, না হয় কুসুম খায়।
থানায় গিয়া প্রায় ঘণ্টা দুই হাজারি ও মতি বসিয়া রহিল। হাজারি শুনিল বেচু চক্কত্তি ও পদ্ম ঝি দুজনেই বলিয়াছে উহাদের উপরই তাহাদের সন্দেহ হয়। সুতরাং পুলিস তো তাহাদের ধরিবেই।
থানার বড় দারোগা থানায় ছিলেন না–বেলা একটার সময় তিনি আসিয়া চুরির সব বিবরণ শুনিয়া হাজারি ও মতিকে তাহার সামনে হাজির করিতে বলিলেন। হাজারি হাত জোড় করিয়া দারোগাবাবুর সামনে দাঁড়াইল। দারোগাবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন–হোটেলে কতদিন কাজ করচ?
–আজ্ঞে বাবু, ছবছর।
–বাসন চুরি করে কোথায় রেখে দিয়েচ?
–দোহাই বাবু–আমার বয়েস ছচল্লিশ-সাতচল্লিশ হোল–কখনো জীবনে একটা বিড়ি কারো চুরি করিনি।
দারোগাবাবু ধমক দিয়া বলিলেন–ওসব বাজে কথা রাখো। তুমি আর ওই চাকর বেটা দুজনে মিলে যোগসাজসে চুরি করেচ। স্বীকার করো–
–বাবু আমি এর কোনো বার্তা জানি নে! আমি সে রাত্তিরে হোটেলেই ছিলাম না।
–কোথায় ছিলে?
–ইষ্টিশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে ছিলাম সারারাত।
–কেন?
–বাবু, আমি খাওয়া-দাওয়া করে চূর্ণীর ঘাটে বেড়াতে যাই রোজ। বড্ড গরম ছিল বলে সেখানে একটু বেশী রাত পর্যন্ত ছিলাম–ফিরে এসে দেখি দরজা বন্ধ, তাই ইষ্টিশানে–
