পদ্ম ঝি বলিল–ও খায়নি–ও এখান থেকে বের করে ওর সেই পেয়ারের কুসুমকে দিয়ে এসেছে–আমি কচি খুকী? কিছু বুঝি নে? নচ্ছার বদমাইশ লোক কোথাকার–
রতন হাসিয়া বলিল—যা বোঝে সে করুক গিয়ে পদ্মদিদি–তোমার আমার কি? সে মুড়ো নিজে খায়,–পরকে দেয় তোমার তা দেখবার দরকার কি? তুমি কিছু বোল না আজ আর ওকে।
পদ্ম ঝি কুমড়োর ব্যাপার লইয়া কিছু অপ্রস্তুত হইয়া পড়িয়াছিল–নতুবা সে রতনের কথা এত সহজে রাখিত না। বলিল–তাহলে বারণ করে দিও ওকে–বারদিগর যেন এমন আর না করে। তাহলে আমি অনত্থ বাধাবো–কারোর কথা শুনবো না।
সে রাত্রে হোটেলের কাজকর্ম চুকাইয়া হাজারি চূর্ণীর ধারে বেড়াইতে গেল। দিব্য জ্যোৎস্না-রাত–প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে।
আজ কি সর্বনাশই আর একটু হইলে হইয়াছিল! তাহার নিজের জন্য সে ভাবে না, ভাবে কুসুমের জন্য। কুসুম পাড়াগাঁয়ের মেয়ে–সেখানে তার বদনাম রটিলে উভয়েরই সেখানে মুখ দেখানো চলিবে না। আর তাহার এই বয়সে এই বদনাম রটিলে লোকেই বা বলিবে কি?
কুসুমকে সে মেয়ের মত দেখে–ভগবান জানেন। ওসব খেয়াল তাহার থাকিলে এই রাণাঘাট শহরে সে কত মেয়ে জুটাইতে পারিত। এই রাধাবল্লভতলার মাটি ছুঁইয়া সে বলিতে পারে জীবনে কোনদিন ওসব খেয়াল তার নাই। বিশেষতঃ কুসুম। ছিঃ ছিঃ-টেঁপির সঙ্গে যাহাকে সে অভিন্ন দেখে না–তাহার সম্বন্ধে রতন ঠাকুরের কাছে পদ্ম ঝি যে সব বিশ্রী কথা বলিয়াছে শুনিলে কানে আঙুল দিতে হয়।
রাত প্রায় দেড়টা বাজিয়া গেল। শহর নিযুক্তি হইয়া গিয়াছে, কেবল কুণ্ডুদের চূর্ণীর ধারে কাঠের আড়তে হিন্দুস্থানী কুলীরা ঢোলক বাজাইয়া বিকট চিৎকার শুরু করিয়াছে–ওই উহাদের নাকি গান! যখন নর্থবেঙ্গল এক্সপ্রেস আসিয়া দাঁড়ায় স্টেশনে তখন সে হোটেল হইতে বাহির হইয়াছে–আর এখন স্টেশন পর্যন্ত নিস্তব্ধ হইয়া গিয়াছে, কারণ এত রাত্রে কোনো ট্রেন আসে না। রাত চারটা হইতে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হইবে।
হোটেলের দরজা বন্ধ। ডাকাডাকি করিয়া মতি চাকরের ঘুম ভাঙাইতে তাহার প্রবৃত্তি হইল না। বড় গরম–স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে না হয় বাকী রাতটুকু কাটাইয়া দেওয়া যাক। আজ রাত্রে ঘুম আসিতেছে না চোখে।
ভোরে উঠিয়া হোটেলের সামনে আসিয়া হাজারি দেখিল হোটেলের দরজা এখনও বন্ধ। সে একটু আশ্চর্য্য হইল। মতি চাকর তো অনেকক্ষণ উঠিয়া অন্যদিন দরজা খোলে। ডাকাডাকি করিয়াও কাহারো সাড়া পাওয়া গেল না–তারপর গদির ঘরের জানালা দিয়া ঘরের মধ্যে উঁকি মারিয়া দেখিতে গিয়া হাজারি লক্ষ্য করিল–বাসনের ঘরের মধ্যে অত আলো কেন?
ঘুরিয়া আসিয়া দেখিল বাসনের ঘরের দরজা খোলা। ঘরের মধ্যে কেহই নাই। মতি চাকরেরও সাড়াশব্দ নাই কোনদিকে। এরকম তো কখনো হয় না।
এমন সময় যদু বাঁড়ুয্যের হোটেলে একটা চায়ের স্টলও আছে–খুব সকাল হইতেই সেখানে চা বিক্ৰী শুরু হয়।
হাজারির ডাকে নিমাই আসিল। দুজনে ঘরের মধ্যে ঝুঁকিয়া দেখিল মতি চাকর খাবার ঘরে শুইয়া দিব্যি নাক ডাকাইয়া ঘুমাইতেছে। উভয়ের ডাকে মতি ধড়মড় করিয়া উঠিল।
হাজারি বলিল–মতি দোর খোলা কেন?
মতি বলিল–তা তো আমি জানি নে! তুমি রাত্তিরে ছিলে কোথায়? দোর খুললে কে?
তিনজনে ঘরের মধ্যে আসিয়া এদিক ওদিক দেখিল। হঠাৎ মতি বলিয়া উঠিল–হাজারি দা, সর্বনাশ! থালা বাসন কোথায় গেল? একখানও তো দেখছি নে!
–সে কি!
তিনজনে মিলিয়া তন্ন তন্ন করিয়া খুঁজিয়াও কোনো ঘরেই বাসনের সন্ধান পাওয়া গেল না। নিমাই বলিল–চায়ের দুধটা দিয়ে আসি হাজারি-দা, বাসন সব চক্ষুদান দিয়েচে কে। তোমাদের কর্তাকে ডেকে নিয়ে এসো।
ইতিমধ্যে রতন ঠাকুর আসিল। সে-ই গিয়া বেচু চক্কত্তিকে ডাকিয়া আনিল। পদ্ম ঝিও আসিল। চুরি হইয়া গিয়াছে শুনিয়া পাশের হোটেল হইতে যদু বাঁড়ুয্যে আসিলেন, বাজারের লোকজন জড় হইল–থানায় খবর দিতে তখনি, এ. এস. আই নেপালবাবু ও দুজন কনস্টেবল আসিল। হৈ হৈ বাধিয়া গেল। বেচু চক্কত্তি মাথায় হাত দিয়া ততক্ষণ বসিয়া পড়িয়াছেন, প্রায় ষাট-সত্তর টাকার থালা বাসন চুরি গিয়াছে।
বেচু চক্কত্তি বলিলেন–হাজারি রাত্তিরে কোথায় ছিলে?
ইষ্টিশনের প্ল্যাটফর্মে বাবু। বড্ড গরম হচ্ছিল–তাই ঘাটের ধার থেকে ফিরে ওখানেই রাত কাটালাম।
নেপালবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন,–কত রাত্রে প্ল্যাটফর্মে শুয়েছিলে? কোন প্ল্যাটফর্মে?
–আজ্ঞে, বনগাঁ লাইনের প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চির ওপর।
–তোমায় সেখানে কেউ দেখেছিল?
–না বাবু, তখন অনেক রাত।
–কত?
–দেড়টার বেশী।
-এতক্ষণ পর্যন্ত কোথায় ছিলে?
–রোজ খাওয়া-দাওয়ার পরে আমি দুবেলাই চূর্ণীর খেয়াঘাটে গিয়ে বসি। কালও সেখানে ছিলাম।
–আর কোনো দিন হোটেল ছেড়ে প্ল্যাটফর্মে শুয়েছিলে?
–মাঝে মাঝে শুই, তবে খুব কম।
এই সময় বেচু চক্কত্তিকে পদ্ম ঝি চুপি চুপি কি বলিল। বেচু চক্কত্তি নেপালবাবুকে বলিলেন, দারোগাবাবু, একবার ঘরের মধ্যে একটা কথা শুনে যান দয়া করে–
ঘরের ভিতর হইতে কথা শুনিয়া আসিয়া নেপালবাবু বলিলেন–হাজারি ঠাকুর, তুমি কুসুমকে চেন?
হাজারির মুখ শুকাইয়া গেল। ইহার মধ্যে ইহারা কুসুমের কথা আনিয়া ফেলিল কেন? কুসুমের সঙ্গে ইহার কি সম্পর্ক?
হাজাবির মুখের ভাব নেপালবাবু লক্ষ্য করিলেন।
