কিন্তু উপায় নাই, মনসাপোতায় থাকিলেও আর কুলায় না, অথচ তেরো টাকা ভাড়ায় এর চেয়ে ভালো ঘর শহরে কোথাও মেলে না। তবুও অপর্ণা এই আলো-হাওয়াবিহীন স্থানেও শ্রীছাদ আনিয়াছে, ঘরটা নিজের হাতে সাজাইয়াছে, বাক্স-পেটরাতে নিজের হাতে বোনা ঘেরাটোপ, জানলায় ছিটের পর্দা, বালিশ মশারি সব ধপ ধপ করিতেছে, দিনে দু-তিনবার ঘর ঝাঁট দেয়।
এই বাড়ির উপরের তলার ভাড়াটে গাঙ্গুলিদের একজন দেশস্থ আত্মীয় পীড়িত অবস্থায় এখানে আসিয়া দু-তিন মাস আছেন। আত্মীয়টি প্রৌঢ়, সঙ্গে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে। দেখিয়া মনে হয় অতি দরিদ্র, বড়োলোক আত্মীয়ের আশ্রয়ে এখানে রোগ সারাইতে আসিয়াছেন ও চোরের মতো একপাশে পড়িয়া আছেন। বৌটি যেমন শান্ত তেমনি নিরীহ, ইতিপূর্বে কখনও কলিকাতায় আসে নাই—দিনরাত জুজুর মতো হইয়া আছে। সারাদিন সংসারের খাটুনি খাটে, সময় হইলেই রুগণ স্বামীর মুখের দিকে উদ্বিগ্নদৃষ্টিতে চাহিয়া বসিয়া থাকে। তাহার উপর গাঙ্গুলি বৌয়ের ঝংকার, বিরক্তি প্রদর্শন, মধুবৰ্ষণ তো আছেই। অত্যন্ত গরিব, অপু রোগী দেখিতে যাইবার ছলে মাঝে মাঝে বেদানা, আঙুর, লেবু দিয়া আসিয়াছে। সেদিনও বড়ো ছেলেটিকে জামা কিনিয়া দিয়াছে।
এদিকে তাহারও চলে না। এ সামান্য আয়ে সংসার চালানো একরুপ অসম্ভব। অপর্ণা অন্যদিকে ভালো গৃহিণী হইলেও পয়সা-কড়ির ব্যাপারটা ভালো বোঝে না—দুজনে মিলিয়া মহা আমোদে মাসের প্রথম দিকটা খুব খরচ করিয়া ফেলে—শেষের দিকে কষ্ট পায়।
কিন্তু সকলের অপেক্ষা কষ্টকর হইয়াছে আপিসের এই ভূতগত খাটুনি। ছুটি বলিয়া কোনও জিনিস নাই এখানে। ছোট ঘরটিতে টেবিলের সামনে ঘাড় খুঁজিয়া বসিয়া থাকা সকাল এগারোটা হইতে বৈকাল সাতটা পর্যন্ত। আজ দেড় বৎসর ধরিয়া এই চলিতেছে। এই দেড় বৎসরের মধ্যে সে শহরের বাহিরে কোথাও যায় নাই। আপিস আর বাসা, বাসা আর আপিস। শীলবাবুদের দমদমার বাগানবাড়িতে সে একবার গিয়াছিল, সেই হইতে তাহার মনের সাধ নিজের মনের মতো গাছপালায় সাজানো বাগানবাড়িতে বাস করা। আপিসে যখন কাজ থাকে না, তখন একখানা কাগজে কাল্পনিক বাগানবাড়ির নকশা আঁকে। বাড়িটা যেমন তেমন হউক, গাছপালার বৈচিত্র্যই থাকিবে বেশি। গেটের দুধারে দুটো চীনা বাঁশের ঝাড় থাকুক। রাঙা সুরকির পথের ধারে ধারে রজনীগন্ধা ল্যাভেন্ডার বাসের পাড় বানো বকুল ও কৃষ্ণচূড়ার ছায়া।
বাড়িতে ফিরিয়া চা ও খাবার খাইয়া স্ত্রীর সঙ্গে গল্প করে-হ্যাঁ, তারপর কাটালি চাপার পারগোলাটা কোন দিকে হবে বলো তো?
অপর্ণা স্বামীকে এই দেড় বছরে খুব ভালো করিয়া বুঝিয়াছে। স্বামীর এইসব ছেলেমানুষিতে সেও সোৎসাহে যোগ দেয়। বলে,শুধু কাঁটালি চাঁপা? আর কি কি থাকবে, জানলার জাফরিতে কি উঠিয়ে দেব বলো তো?
যে আমড়াতলার গলির ভিতর দিয়া সে আপিস যায় তাহার মতো নোংরা স্থান আর আছে কিনা সন্দেহ। ঢুকিতেই পুঁটকি চিংড়ি মাছের আড়ত সারি সারি দশ-পনেরোটা। চড়া রৌদ্রের দিনে যেমন তেমন, বৃষ্টির দিনে কার সাধ্য সেখান দিয়া যায়? স্থানে স্থানে মাড়োয়ারিদের গরু ও ষাঁড় পথ রোধ করিয়া দাঁড়াইয়া-পিচপিচে কাদা, গোবর, পচা আপেলের খোলা।
নিত্য দুবেলা আজ দেড় বৎসর এই পথে যাতায়াত।
তা ছাড়া রোজ বেলা এগারোটা হইতে সাতটা পর্যন্ত এই দারুণ বদ্ধতা! আপিসে অন্য যাহারা আছে, তাহাদের ইহাতে তত কষ্ট হয় না। তাহারা প্রবীণ, বহুকাল ধরিয়া তাহাদের খাকের কলম শীলবাবুদের সেরেস্তায় অক্ষয় হইয়া বিরাজ করিতেছে, তাহাদের গর্বও এইখানে। রোকড়-নবীশ রামধনবাবু বলেন-হেঁ হেঁ, কেউ পারবে না মশাই, আজ এক কলমে বাইশ বছর হল বাবুদের এখানে-কোন ব্যাটার ফু খাটবে না বলে দিয়োচার সালের ভূমিকম্প মনে আছে? তখন কর্তা বেঁচে, গদি থেকে বেরুচ্ছি, ওপর থেকে কর্তা হেঁকে বললেন, ওহে রামধন, পোস্তা থেকে ল্যাংড়া আমের দরটা জেনে এসো দিকি চট করে। বেরুতে যাবো মশাই-আর যেন মা বাসুকি একেবারে চৌদ্দ হাজার ফণা নাড়া দিয়ে উঠলেন—সে কি কাণ্ড মশাই? হেঁ হেঁ, আজকের লোক নই—
কষ্ট হয় অপুর ও ছোকরা টাইপিস্ট নৃপেনের। সে বেচারী উকি মারিয়া দেখিয়া আসে ম্যানেজার ঘরে বসিয়া আছে কিনা। অপুর কাছে টুলের উপর বসিয়া বলে, এখনও ম্যানেজার হাইকোর্ট থেকে ফেরেন নি বুঝি, অপূর্ববাবুছটা বাজে, ছুটি সেই সাতটায়
অপু বলে, ওকথা আর মনে করিয়ে দেবেন না, নৃপেনবাবু। বিকেল এত ভালোবাসি, সেই বিকেল দেখি নি যে আজ কত দিন। দেখুন তো বাইরে চেয়ে, এমন চমৎকার বিকেলটি, আর এই অন্ধকার ঘরে ইলেকট্রিক আলো জ্বেলে ঠায় বসে আছি সেই সকাল দশটা থেকে।
মাটির সঙ্গে যোগ অনেকদিনই তো হারাইয়াছে, সে সব বৈকাল তো এখন দূরের স্মৃতি মাত্র। কিন্তু কলিকাতা শহরের যে সাধারণ বৈকালগুলি তাও তো সে হারাইতেছে প্রতিদিন। বেলা পাঁচটা বাজিলে এক-একদিনে লুকাইয়া বাহিরে গিয়া দাঁড়াইয়া সম্মুখের বাড়ির উঁচু কার্নিশের উপর যে একটুখানি বৈকালের আকাশ চোখে পড়ে তারই দিকে বুভুক্ষুর দৃষ্টিতে চাহিয়া থাকে।
সামনেই উপরের ঘরে মেজবাবু বন্ধুবান্ধব লইয়া বিলিয়ার্ড খেলিতেছেন, মার্কারটা রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াইয়া সিগারেট খাইয়া পুনরায় ঘরে ঢুকিল। মেজবাবুর বন্ধু নীলরতনবাবু একবার বারান্দায় আসিয়া কাহাকে হাঁক দিলেন। অপুর মনে হয় তাহার জীবনের সব বৈকালগুলি এরা পয়সা দিয়া কিনিয়া লইয়াছে, সবগুলি এখন ওদের জিম্মায়, তাহার নিজের আর কোন অধিকার নাই উহাতে।
