দেউড়িতে দারোয়ানেরা বসিয়া খৈনি খাইতেছে, ম্যানেজার ও সুপারিন্টেন্ডেন্টের যাতায়াতের সময় উঠিয়া দাঁড়াইয়া ফৌজের কায়দায় সেলাম করে, ইহাদিগকে পোঁছেও না।
ফুটপাথে পা দিয়া নৃপেন বলিল—দেখলেন অপূর্বাবু, ম্যানেজারবাবুর ব্যাপার? একদিন সাড়ে তিনটের সময় ছুটি চাইলাম, তা দিলে না—অন্য সব আপিস দেখুন গিয়ে, দুটোতে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তারা সব এতক্ষণে ট্রেনে যে যার বাড়ি পৌঁছে চা খাচ্ছে আর আমরা এই বেরুলাম—কি অত্যাচারটা বলুন দিকি?
প্রবোধ মুহুরি বলিল—অত্যাচার বলে মনে করো ভায়া, কাল থেকে এসো না, মিটে গেল। কেউ তো অত্যাচার পোয়াতে বলে নি। ওঃ, ক্ষিদে যা পেয়েছে ভায়া, একটা মানুষ পেলে ধরে খাই এমন অবস্থা। রোজ রোজ এমনিহার্টের রোগ জন্মে গেল ভায়া, শুধু না খেয়ে খেয়ে—
অপু হাসিয়া বলিল—দেখবেন প্রবোধ-দা, আমি পাশে আছি, এ যাত্রা আমাকে না হয় রেহাই দিন। ধরে খেতে হয় রাস্তার লোকের ওপর দিয়ে আজকের ক্ষিদেটা শান্ত করুন। আমি আজ তৈরি হয়ে আসি নি। দোহাই দাদা!
তাহার দুঃখের কথা লইয়া এরুপ ঠাট্টা করাতে প্রবোধ মুহরি খুব খুশি হইল না। বিরক্তমুখে বলিল—তোমাদের তো সব তাতেই হাসি আর ঠাট্টা, ছেলেছোকরার কাছে কি কোন কথা বলতে আছে—আমি যাই, তাই বলি! হাসি সোজা ভাই, কই দাও দিকি ম্যানেজারকে বলে পাঁচ টাকা মাইনে বাড়িয়ে?, তার বেলা
অপুকে হাঁটিতে হয় রোজ অনেকটা। তার বাসা শ্রীগোপাল মল্লিক লেনের মধ্যে, গোলদিঘির কাছে। তেরো টাকা ভাড়াতে নিচু একতলা ঘর, ছোট রান্নাঘর। সামান্য বেতনে দু-জায়গায় সংসার চালানো অসম্ভব বলিয়া আজ বছরখানেক হইল সে অপর্ণাকে কলিকাতায় আনিয়া বাসা করিয়াছে। তবু এখানে চাকরিটি জুটিয়াছিল তাই রক্ষা!
শৈশবের স্বপ্ন এ ভাবেই প্রায় পর্যবসিত হয়। অনভিজ্ঞ তরুণ মনের উচ্ছ্বাস, উৎসাহমাধুর্যভরা বঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন স্বপ্ন থাকিয়া যায়। যে ভাবে বড়ো সওদাগব হইবে, দেশে দেশে বাণিজ্যের কুঠি খুলিবে, তাহাকে হইতে হয় পাড়াগাঁয়েব হাতুড়ে ডাক্তার, যে ভাবে ওকালতি পাস করিয়া বাসবিহারী ঘোষ হইবে, তাহাকে হইতে হয় কয়লাব দোকানী, যাহার আশা থাকে সারা পৃথিবী ঘুরিয়া দেখিয়া বেড়াইবে, কি দ্বিতীয় কলম্বস হইবে, তাহাকে হইতে হয় চল্লিশ টাকা বেতনের স্কুলমাস্টাব।
শতকবা নিরানব্বই জনের বেলা যা হয়, অপুর বেলাও তাহার ব্যতিক্রম হয় নাই। যথানিয়মে সংসার-যাত্রা, গৃহস্থালি, কেবানীগিরি, ভাড়া বাড়ি, মেলি ফুড ও অযেলক্লথ। তবে তাহার শেষোক্ত দুটিব এখনও আবশ্যক হয় নাই—এই যা।
অপর্ণা ঘরের দোরের কাছে বঁটি পাতিয়া কুটনা কুটিতেছে, স্বামীকে দেখিয়া বলিল–আজ এত সকাল সকাল যে! তারপর সে বঁটিখানা ও তরকারির চুপড়ি একপাশে সরাইয়া রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল।
অপু বলিল, খুব সকাল আব কই, সাতটা বেজেছে, তবে অন্যদিকের তুলনায় সকাল বটে। হ্যাঁ, তেলওয়ালা আর আসে নি তো?
এসেছিল একবার দুপুরে, বলে দিয়েছি বুধবাবে মাইনে হলে আসতে, তোমার আসবার দেরি হবে ভেবে এখনও আমি চায়ের জল চড়াই নি।
কলের কাছে অন্য ভাড়াটেদের ঝি-বৌয়েরা এ সময় থাকে বলিযা অপর্ণা স্বামীর হাত-মুখ ধুইবার জল বারান্দার কোণে তুলিয়া রাখে। অপু মুখ ধুইতে গিযা বলিল, রজনীগন্ধা গাছটা হেলে পড়েছে কেন বলো তো? একটু বেঁধে দিয়ো।
চা খাইতে বসিয়াছে, এমন সময়ে কলের কাছে কোন প্রৌঢ় কণ্ঠেব কর্কশ আওয়াজ শোনা গেল-তা হলে বাপু একশো টাকা বাড়িভাড়া দিয়ে সায়েবপাড়ায় থাকো গে। আজ আমার মাথা ধরেহে, কাল আমার ছেলের সর্দি লেগেছে-পালার দিন হলেই যত ছুতো। নাও না, সারা ওপরটাই তোমরা ভাড়া নাও না; দাও না পৰ্যষট্টি টাকা—আমরা না হয় আর কোথাও উঠে যাই, রোজ রোজ হাঙ্গামা কে সহি করে বাপু!
অপু বলিল—আবার বুঝি আজ বেধেছে গাঙ্গুলি-গিন্নির সঙ্গে?
অপর্ণা বলিল—নতুন করে বাধবে কি, বেধেই তো আছে। গাঙ্গুলি-গিন্নিরও মুখ বড়ো খারাপ, হালদারদের বৌটা ছেলেমানুষ, কোলের মেয়ে নিয়ে পেরে ওঠে না, সংসারে তো আর মানুষ নেই, তবুও আমি এক-একদিন গিয়ে বাটনা বেটে দিয়ে আসি।
সিঁড়ি ও বোয়াক ধুইবার পালা লইয়া উপরের ভাড়াটেদের মধ্যে এ রেষারেষি, দ্বন্দ্ব-অপু আসিয়া অবধি এই এক বৎসরের মধ্যে মিটিল না। সকলের অপেক্ষা তাহার খারাপ লাগে ইহাদের এই সংকীর্ণতা, অনুদারতা। কট কট করিয়া শক্ত কথা শুনাইয়া দেয়-বাঁচিয়া, বাঁচাইয়া কথা বলে না, কোন্ কথায় লোকের মনে আঘাত লাগে, সে কথা ভাবিয়াও দেখে না।
বাড়িটাতে হাওয়া খেলে না, বারান্দাটাতে বসিলে হয়তো একটু পাওয়া যায়, কিন্তু একটু দূরেই ঝাঝরি-ড্রেন, সেখানে সারা বাসার তরকারির খোসা, মাছের আঁশ, আবর্জনা, বাসি ভাত-তরকারি পচিতেছে, বর্ষার দিনে বাড়িময় ময়লা ও আধময়লা কাপড় শুকাইতেছে, এখানে তোবড়ানো টিনের বাক্স, ওখানে কয়লার ঝুড়ি। ছেলেমেয়েগুলা অপরিষ্কার, ময়লা পেনি বা ফ্রক পরা। অপুদের নিজেদের দিকটা ওরই মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকিলে কি হয়, এই ছোট্ট বারান্দার টবে দু-চারটে রজনীগন্ধা, বিদ্যাপাতার গাছ রাখিলে কি হয়, এই এক বৎসর সেখানে আসিয়া অপু বুঝিয়াছে, জীবনের সকল সৌন্দর্য, পবিত্রতা, মাধুর্য এখানে পলে পলে নষ্ট করিয়া দেয়, এই আবহাওয়ার বিষাক্ত বাস্পে মনের আনন্দকে গলা টিপিয়া মারে। চোখে পীড়া দেয় যে অসুন্দর, তা ইহাদের অঙ্গের আভরণ। থাকিতে জানে না, বাস করিতে জানে না, শূকরপালের মতো খায় আর কাদায় গড়াগড়ি দিয়া মহা আনন্দে দিন কাটায়। এত কুশ্রী বেষ্টনীর মধ্যে দিন দিন যেন তার দম বন্ধ হইয়া আসিতেছে।
