কিন্তু পয়সা কই? তাও তো পয়সার দরকার। তেলিরা কুড়ি টাকা দিয়াছিল মাতৃশ্রাদ্ধের দরুন, নিরুপমা নিজে হইতে পনেরো, বড়ো-বৌ আলাদা দশ। অপু সে টাকার এক পয়সাও রাখে নাই, অনেক লোকজন খাওয়াইয়াছে। তবু তো সামান্যভাবে তিলকাঞ্চন শ্রাদ্ধ!
দশপিণ্ড দানেব দিন সে কি তীব্র বেদনা! পুরোহিত বলিতেছেন-প্রেতা শ্রীসর্বজয়া দেবী— অপু ভাবে কাহাকে প্রেত বলিতেছে? সর্বজয়া দেবী প্রেত? তাহার মা, প্রীতি আনন্দ ও দুঃখ-মুহূর্তের সঙ্গিনী, এত আশাময়ী, হাস্যময়ী, এত জীবন্ত যে ছিল কিছুদিন আগেও, সে প্রেত? সে আকাশছো নিরালম্বো বায়ুভূত-নিরাশ্রয়ঃ?
তারপরই মধুর আশার বাণী—আকাশ মধুময় হউক, বাতাস মধুময় হউক, পথের ধূলি মধুময় হউক, ওষধি সকল মধুময় হউক, বনস্পতি মধুময় হউক, সূর্য চন্দ্র, অন্তরীক্ষস্থিত আমাদের পিতা মধুময় হউন।
সারাদিনব্যাপী উপবাস অবসাদ, শোকের পর এ মন্ত্র অপুর মনে সত্য সত্যই মধুবৰ্ষণ করিয়াছিল, চোখের জল সে রাখিতে পারে নাই। হে আকাশের দেবতা, বাতাসের দেবতা, তাই করো, মা আমার অনেক কষ্ট কবে গিয়েছেন, তার প্রাণে তোমাদের উদার আশীর্বাদের অমৃতধারা বর্ষণ করো।
এই অবস্থায় শুধুই ইচ্ছা কবে যারা আপনার লোক, যারা তাহাকে জানে ও মাকে জানিত তাহাদের কাছে যাইতে। এক জ্যাঠাইমারা আছেন—কিন্তু তাঁহাদেব সহানুভূতি নাই, তবু সেখানেই যাইতে ইচ্ছা করে। তবুও মনে হয়, হয়তো জ্যাঠাইমা মায়ের দু-পাঁচটা কথা বলিবেন এখন, দুটা সহানুভূতির কথা হয়তো বলিবেন—
মাস-তিনেক এভাবে কাটিল। এ তিন মাসের কাহিনী তাহার জীবনের ইতিহাসে একটা একটানা নিরবচ্ছিন্ন দুঃখের কাহিনী। ভবিষ্যৎ জীবনে অপু এ গলিটাব নিকট দিয়া যাইতে যাইতে নিজের অজ্ঞাতসারে একবার বড়ো রাস্তা হইতে গলির মোড়ে চাহিয়া দেখিত, আর কখনও সে ইহার মধ্যে ঢোকে নাই।
জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে সে একদিন খবরের কাগজে দেখিল-যুদ্ধের জন্য তোক লওয়া হইতেছে, পার্ক স্ট্রীটে তাহার অফিস। দুপুরে ঘুরিতে ঘুরিতে সে গেল পার্ক স্ট্রীটে।
টেবিলে একরাশ আপানো ফর্ম পড়িয়া ছিল, অপু একখানা তুলিয়া পড়িয়া রিক্রুটিং অফিসারকে বলিল-কোথাকার জন্য লোক নেওয়া হবে?
–মেসোপটেমিয়া, রেলওয়ে ও ট্রান্সপোর্ট বিভাগের জন্য। তুমি কি টেলিগ্রাফ জানোনা মোটর মিন্ত্রি?
অপু বলিল—সে কিছুই নহে। ও-সব কাজ জানে না, তবে অন্য যে কোন কাজ—কি কেরানীগিরি।
সাহেব বলিল-না, দুঃখিত আমরা শুধু কাজ জানা লোক নিচ্ছি—বেশির ভাগ মোটর ড্রাইভার, সিগন্যালার, স্টেশন মাস্টার সব।
এই অবস্থায় একদিন লীলার সঙ্গে দেখা। ইতস্তত লক্ষ্যহীনভাবে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন ডালহাউসি স্কোয়ারের মোড়ে সে রাস্তা পার হইবার জন্য অপেক্ষা করিতেছে, সামনে একখানা হলদে রঙের বড়ো মিনার্ভা গাড়ি ট্রাফিক পুলিশে দাঁড় করাইয়া রাখিয়াছিল হঠাৎ গাড়িখানার দিক হইতে তাহার নাম ধরিয়া কে ডাকিল।
সে গাড়ির কাছে গিয়া দেখিল, লীলা ও আর দুই-তিনটি অপরিচিত মেয়ে। লীলার ছোটভাই ড্রাইভারের পাশে বসিয়া। লীলা আগ্রহের সুরে বলিল—আপনি আচ্ছা তো অপূর্ববাবু? তিন-চার মাসের মধ্যে দেখা করলেন না, কেন বলুন তো? মা সেদিনও আপনার কথা—
অপুর আকৃতিতে একটা কিছু লক্ষ করিয়া সে বিস্ময়ের সুরে বলিল–আপনার কি হয়েছে? অসুখ থেকে উঠেছেন নাকি, শরীর-মাথার চুল অমন ছোেট-ঘোট, কি হয়েছে বলুন তো?
অপু হাসিয়া বলিল-কই না, কি হবে কিছু তো হয় নি?
–মা কেমন আছেন?
—মা? তা মামা তো নেই। ফাগুন মাসে মারা গিয়েছেন।
কথা শেষ করিয়া অপু আর এক দফা পাগলের মতো হাসিল।
হয়তো বাল্যের সে প্রীতি নানা ঘটনায়, বহু বৎসরের চাপে লীলার মনে নিষ্প্রভ হইয়া গিয়াছিল, হয়তো ঐশ্বর্যের আঁচ লাগিয়া সে মধুর বাল্যমন অন্যভাবে পরিবর্তিত হইয়াছিল ধীরে ধীরে, অপুর মুখের এই অর্থহীন হাসিটা যেন একখানা তীক্ষ্ণ ছুরির মতো গিয়া তাহার মনের কোন গোপন মণিমঞ্জুষার রুদ্ধ ঢাকনির ফাঁকটাকে হঠাৎ একটা সজোরে চাড়া দিল, এক মুহূর্তে অপুর সমস্ত ছবিটা তাহার মনের চোখে ভাসিয়া উঠিল—সহায়হীন, মাতৃহীন, আশ্রয়হীন, পথে-পথে বেড়াইতেছে-কে মুখের দিকে চাহিবার আছে?
লীলার গলা আড়ষ্ট হইয়া গেল, একটু চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল,আপনি আমাদের ওখানে কবে আসবেন বলুন-না, ও রকম বললে হবে না। এ-কথা আমাদের জানানো আপনার উচিত ছিল না? অন্তত মাকেও বলা তো কাল সকালে আসুন—ঠিক বলুন আসবেন? কেমন ঠিক তাসেবারকার মতো করবেন না কিন্তু ভালো কথা, আপনার ঠিকানাটা বলুন তো, কি—ভুলবেন না কিন্তু–।
গাড়ি চলিয়া গেল।
বাসায় ফিরিয়া অপু মনের মধ্যে অনেক তোলাপাড়া করিল। লীলার মুখে সে একটা কিসের ছাপ দেখিয়াছে, বর্তমান অবস্থায় মন তাহার এই আন্তরিকতার স্নেহস্পর্শটুকুরই কাঙ্গাল বটে—কিন্তু এই বেশে কোথাও যাইতে ইচ্ছা হয় না, এই জামায়, এই কাপড়ে, এই ভাবে। থাক বরং।
তিনদিন পর নিজের নামে একখানা পত্ৰ আসিতে দেখিয়া সে বিস্মিত হইল—মা ছাড়া আর তো কাহারও পত্র সে পায় নাই। কে পত্ৰ দিল? পত্ৰ খুলিয়া পড়িল :
অপূর্ববাবু,
আপনার এখানে আসবার কথা ছিল সোমবারে, কিন্তু আজ শুক্রবার হয়ে গেল আপনি এলেন। আপনাকে মা একবার অবিশ্যি অবিশ্যি আসতে বলেছেন, না এলে তিনি খুব দুঃখিত হবেন। আজ বিকেলে পাচটার সময় আপনার আসা চাই-ই। নমস্কার নেবেন।
