কিন্তু মায়ের গায়ের কথাখানা উঠানের আলনায় মেলিয়া দেওয়া কেন? কথাখানা মায়ের গায়ে ছিল…সঙ্গেই তো যাওয়ার কথা। অনেক দিনের নিশ্চিন্দিপুরের আমলের, মায়ের হাতে সেলাই করা কল্কা-কাটা রাঙা সুতার কাজ। …কতক্ষণ সে বসিয়া ছিল জানে না, রোদ প্রায় পড়িয়া আসিল। তেলি-বাড়ির বড়ো ছেলে নাদুর ডাকে চমক ভাঙিতেই সে তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাঁড়াইল। ম্লান হাসিয়া বলিল-এই যে, আমার ঘরের চাবিটা তোমাদের বাড়ি?…
নাদু বলিল—কখন এলে, এখানে বসে একলাটি-~-বেশ তো দাদাঠাকুর-এসো আমাদের বাড়ি।
অপু বলিল, না ভাই, তুমি চাবিটা নিয়ে এসো—ঘরের মধ্যে দেখি জিনিসগুলোর কি ব্যবস্থা। চাবি দিয়া নাদু চলিয়া গেল।
—ঘর খুলে দ্যাখো, আমি আসছি এখুনি।
অপু ঘরে ঢুকিল। তক্তপোশের উপর বিছানা নাই, বালিশ, মাদুর কিছু নাই—তক্তপোশটা পড়িয়া আছে—তক্তপোশের তলায় একটা পাথরের খোরায় কি ভিজানো—খোরাটা হাতে তুলিয়া দেখিল। চিরতা না নিমছাল কি ভিজানো-মায়ের ওষুধ।
বাহিরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কে বলিল—ঘরের মধ্যে কে?—অপু খোরাটা তক্তপোশের কোণে নামাইয়া রাখিয়া বাহিরের দাওয়ায় আসিল। নিরুপমা দিদি নিরুপমাও অবাক-গালে আঙুল দিয়া বলিল—তুমি! কখন এলে ভাই?-কই কেউ তো বলে নি!…
অপু বলিলনা, এই তো এলাম,—এই এখনও আধঘণ্টা হয় নি।
নিরুপমা বলিল—আমি বলি রোদ পড়ে গিয়েছে, কাঁথাটা কেচে মেলে দিয়ে এসেছি বাইরে, যাই কাঁথাখানা তুলে রেখে আসি কুতুদের বাড়ি। তাই আসছি—
অপু বলিল—কাঁথাখানা মায়ের গায়ে ছিল, না নিরুদি?
-কোথায়?…পরশু রাতে তো তারপরও বিকেলে বড়ো-বৌকে বলেছেন কাঁথাখানা সরিয়ে রাখো মা-ও আমার অপুর জন্যে, বর্ষাকালে কলকাতা পাঠাতে হবে—সেই পুরানো তুলো জমানো কালো কম্বলটা ছিল…সেইখানা গায়ে দিয়েছিলেন—তিনি আবার প্রাণ ধরে তোমার কথা নষ্ট করবেন?…তাই কাল যখন ওরা তাকে নিয়ে-থুয়ে গেল তখন ভাবলাম রুগীর বিছানায় তো ছিল কাঁথাখানা, জলকাঁচা করে রোদে দিইকাল আর পারি নি আজ সকালে ধুয়ে আলনায় দিয়ে গেলাম—তা এসো-আমাদের বাড়ি-ওসব শুনবো না—মুখ শুকনোহবিষ্যি হয় নি? এসো
নিরুপমার আগে আগে সে কলের পুতুলের মতো তাদের বাড়ি গেল। সরকার মহাশয় কাছে ডাকিয়া বাইয়া অনেক সান্ত্বনার কথা বলিলেন।
নিরুদি কি করিয়া মুখ দেখিয়া বুঝিল খাওয়া হয় নাই! নাদুও তত ছিলকই কোনও কথা তো বলে নাই?
সন্ধ্যার পর নিরুপমা একখানা রেকাবিতে আখ ও ফলমূল কাটিয়া আনিল। একটা কাসাব বাটিতে কাঁচামুগের ডাল-ভিজা, কলা ও আখের গুড় নিয়া নিজে একসঙ্গে মাখিয়া আনিয়াছে। অপু কারুর হাতে চটকানো জিনিস খায় না, ঘেন্না-ঘেন্না করে…প্রথমটা মুখে তুলিতে একটুখানি গা কেমন করিতেছিল। তারপর দুই-এক গ্রাস খাইয়া মনে হইল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আস্বাদই তো!…নিজের হাতে বা মায়ের হাতে মাখিলে যা হইত—তাই। পরদিন হবিষ্যের সময় নিরুপমা গোয়ালে সব জোগাড়পত্র করিয়া অপুকে ডাক দিল। উনুনে ফু পাড়িয়া কাঠ ধরাইয়া দিল। ফুটিয়া উঠিলে বলিল-এইবার নামিয়ে ফ্যালো, ভাই।
অপু বলিল—আর একটু হবে না—নিরুদি?
নিরুপমা বলিল—নামাও দেখি, ও হয়ে গিয়েছে। ডালবাটাটা জুড়োতে দাও—
সব মিটিয়া গেলে সে কলিকাতায় ফিরিবার উদ্যোগ করিল। সর্বজয়ার জাতিখানা, সর্বজয়ার হাতে সইকরা খানদুই মনিঅর্ডারের রসিদ চালের বাতায় গোঁজা ছিল—সেগুলি, সর্বজয়ার নখ কাটিবার নরুণটা পুটলির মধ্যে বাঁধিয়া লইল। দোরের পাশে ঘরের কোণে সেই তাকটা—আসিবার সময় সেদিকে নজর পড়িল। আচারভরা ভাড়, আমসত্ত্বের হাঁড়িটা, কুলচুর, মায়ের গঙ্গাজলের পিতলের ঘটি, সবই পড়িয়া আছে…যে যত ইচ্ছা খুশি খাইতে পারে, যাহা খুশি দুইতে পারে, কেহ বকিবার নাই, বাধা দিবার নাই। তাহার প্রাণ ডুকরিয়া কাঁদিয়া উঠিল। সে মুক্তি চায় না…অবাধ অধিকার চায় নাতুমি এসে শাসন করো, এসব ছুঁতে দিয়ো না, হাত দিতে দিয়ো না ফিরে এসো মা…ফিরে এসো…
কলিকাতায় ফিরিয়া আসিল, একটা তীব্র ঔদাসীন্য সব বিষয়ে, সকল কাজে এবং সঙ্গে সঙ্গে সেই ভয়ানক নির্জনতার ভাবটা। পরীক্ষা শেষ হইয়া গিয়াছিল, কলিকাতায় থাকিতে একদণ্ড ইচ্ছা হয় না…মন পাগল হইয়া উঠে, কেমন যেন পালাই-পালাই ভাব হয় সর্বদা, অথচ পালাইবার স্থান নাই, জগতে সে একেবারে একাল-সত্যসত্যই একাকী।
এই ভয়ানক নির্জনতার ভাব এক এক সময় অপুর বুকে পাথরের মতো চাপিয়া বসে, কিছুতেই সেটা সে কাটাইয়া উঠিতে পারে না, ঘরে থাকা তাহার পক্ষে তখন আর সম্ভব হয় না। গলিটার বাহিরে বড়ো রাস্তা, সামনে গোলদিঘি, বৈকালে গাড়ি, মোটর, লোকজন ছেলেমেয়ে। বড়ো মোটরগাড়িতে কোন সম্রান্ত গৃহস্থের মেয়েরা বাড়ির ছেলেমেয়েদের লইয়া বেড়াইতে বাহির হইয়াছে, অপুর মনে হয় কেন সুখী পরিবার!—ভাই, বোন, মা, ঠাকুরমা, পিসিমা, রাঙাদি, বড়দা, ছোটকা। যাহাদের থাকে তাহাদের কি সব দিক দিয়াই এমন করিয়া ভগবান দিয়া দেন। অন্যমনস্ক হইবার জন্য এক-একদিন সে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরিতে গিয়া বিলাতি ম্যাগাজিনের পাতা উলটাইয়া থাকে। কিন্তু কোথাও বেশিক্ষণ বসিবার ইচ্ছা হয় না, শুধুই কেবল এখানে-ওখানে ফুটপাথ হইতে বাসায়, বাসা হইতে ফুটপাতে। এক জায়গায় বসিলেই শুধু মায়ের কথা মনে আসে, উঠিয়া ভাবে গোলদিঘিতে আজ সাঁতারের ম্যাচের কি হল দেখে আসি বরংকলিকাতায় থাকিতে ইচ্ছা করে না, মনে হয় বাহিরে কোথাও চলিয়া গেলে শান্তি পাওয়া যাইত—যে কোনও জায়গায়, যে কোন জায়গায়-পাহাড়ে, জঙ্গলে, হরিদ্বাবে কেদার-বদরীর পথে—মাঝে মাঝে ঝরনা, নির্জন অধিত্যকায় কত ধরনের বিচিত্র বন্যপুষ্প, দেওদার ও পাইন বনের ঘন ছায়া। সাধু সন্ন্যাসী দেবমন্দির, রামচটি, শ্যামচটি কত বর্ণনা তো সে বইয়ে পড়ে, একা বাহির হইয়া পড়া মন্দ কি? কি হইবে এখানে শহরের ঘিঞ্জি ও ধোঁয়ার বেড়াজালের মধ্যে?
