এইভাবেই একদিন রানুদির শববাড়ি সে গিয়াছে–সে গল্প কবিল। রানুদিব শ্বশুরবাড়ি রানাঘাটের কাছে—তাহারা পশ্চিমে কোথায় চাকুরি উপলক্ষে থাকেন-পূজার সময় বাড়ি আসিয়াছিলেন, সপ্তমী পূজার দিন অনাহতভাবে পটু গিযা হাজির। সেখানে আট দিন ছিল। রানুদিব যত্ন কি! তাহার দুরবস্থা শুনিয়া গোপনে তিনটা টাকা দিয়াছিল, আসিবার সময় নতুন ধুতি চাদর, এক পুটুলি বাসি লুচি সন্দেশ।
অপু বলিল—আমার কথা কিছু বললে না?
–শুধুই তোর কথা। যে কয়দিন ছিলাম, সকালে সন্ধ্যাতে তোর কথা। তারা আবার একাদশীর দিনই পশ্চিমে চলে যাবে, আমাকে রানুদি বললে, ভাড়ার টাকা দিচ্ছি, তাকে একবার নিয়ে আয় এখানে—ছবচ্ছব দেখা হয় নিতা আমার আবার জ্বর হল—দিদির বাড়ি এসে দশ-বারোদিন পড়ে রইলাম-তোর ওখানে আর যাওয়া হল না—ওরাও চলে গেল পশ্চিমে
—ভাড়ার টাকা দেয় নি?
পটু লজ্জিত মুখে বলিল—হ্যাঁ, তোর আর আমার যাতায়াতের ভাড়া হিসেব করেসেও খরচ হয়ে গেল, দিদি কোথায় আর পাবে, আমার সেই ভাড়ার টাকা থেকে নেবু ডালিম ওষুধ-সব হল। রানুদির মতন অমন মেয়ে আর দেখি নি অপুদা, তোর কথা বলতে তার চোখে জল পড়ে।
হঠাৎ অপুর গলা যেন কেমন আড়ষ্ট হইয়া উঠিল–সে তাড়াতাড়ি কি দেখিবার ভান করিয়া জানালার বাহিরের দিকে চাহিল।
–শুধু রানুদি না, যত মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গেলাম, রানীদি, আশালতা, ওপাড়ার সুনয়নীদিসবাই তোর কথা আগে জিজ্ঞেস করে—
ঘণ্টা দুই থাকিয়া পটু চলিয়া গেল।
দেওয়ানপুর স্কুলেই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা গৃহীত হয়। খরচ-পত্র করিয়া কোথাও যাইতে হইল। পরীক্ষার পর হেডমাস্টার মিঃ দত্ত অপুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন। বলিলেন-বাড়ি যাবে কবে?
এই কয় বৎসরে হেডমাস্টারের সঙ্গে তাহার কেমন একটা নিবিড় সৌহার্দ্যের সম্বন্ধ গড়িয়া উঠিয়াছে, দু-জনের কেহই এতদিনে জানিতে পারে নাই সে বন্ধন কতটা দৃঢ়।
অপু বলিল—সামনের বুধবার যাব ভাবছি।
–পাশ হলে কি করবে ভাবছো? কলেজে পড়বে তো?
–কলেজে পড়বার খুব ইচ্ছে, স্যর।
–যদি স্কলারশিপ না পাও?
অপু মৃদু হাসিয়া চুপ করিয়া থাকে।
–ভগবানের ওপর নির্ভর করে চলো, সব ঠিক হয়ে যাবে। দাঁড়াও, বাইবেলের একটা জায়গা পড়ে শোনাই তোমাকে
মিঃ দত্ত খ্রিস্টান। ক্লাসে কতদিন বাইবেল খুলিয়া চমৎকার চমৎকার উক্তি তাহাদের পড়িয়া শুনাইয়াছেন, অপুর তরুণ মনে বুদ্ধদেবের পীতবাসধারী সৌম্যমূর্তির পাশে, তাহাদের গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশালাক্ষীর পাশে, বোষ্টমদাদু নবরাত্তম দাসের ঠাকুর শ্রীচৈতন্যের পাশে, দীর্ঘদেহ শান্তনয়ন যীশুর মূর্তি কোন্ কালে অঙ্কিত হইয়া গিয়াছিল—তাহার মন যীশুকে বর্জন করে নাই, কাটার মুকুটপরা, লাঞ্ছিত, অপমানিত এক দেবোন্মাদ যুবককে মনেপ্রাণে বরণ করিতে শিখিয়াছিল।
মিঃ দত্ত বলিলেন—কলকাতাতেই পড়ো—অনেক জিনিস দেখবার শেখবার আছে—কোন কোন পাড়াগাঁয়ের কলেজে খবচ কম পড়ে বটে কিন্তু সেখানে মন বড়ো হয় না, চোখ ফোটে না, আমি কলকাতাকেই ভালো বলি।
অপু অনেকদিন হইতেই ঠিক করিয়া রাখিয়াছে, কলেজে পড়িবে এবং কলিকাতার কলেজেই পড়িবে।
মিঃ দত্ত বলিলেন—স্কুল লাইব্রেরির লে মিজারেবল-খানা তুমি খুব ভালোবাসতে-ওখানা তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি, আমি আর একখানা কিনে নেবো।
অপু বেশি কথা বলিতে জানে না—এখনও পারিল না— মুখচোরার মতো খানিকক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া হেডমাস্টারের পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিয়া বাহির হইয়া আসিল।
হেডমাস্টারের মনে হইল—তাহার দীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের শিক্ষকজীবনে এ রকম আর কোন ছেলের সংস্পর্শে তিনি কখনও আসেন নাই।—ভাবময়, স্বপ্নদর্শী বালক, জগতে সহায়হীন, সম্পদহীন! হয়তো একটু নির্বোধ, একটু অপরিণামদশী-কিন্তু উদার, সরল, নিষ্পাপ, জ্ঞান-পিপাসু ও জিজ্ঞাসু। মনে মনে তিনি বালকটিকে বড়ো ভালোবাসিয়াছিলেন।
তাঁহার জীবনে এই একটি আসিয়াছিল, চলিয়া গেল। ক্লাসে পড়াইবার সময় ইহার কৌতূহলী ডাগর চোখ ও আগ্রহোজ্জল মুখের দিকে চাহিয়া ইংরেজির ঘণ্টায় কত নতুন কথা, কত গল্প, ইতিহাসের কাহিনী বলিয়া যাইতেন–ইহার নীরব, জিজ্ঞাসু চোখ দুটি তাহার নিকট হইতে যেরুপ জোর করিয়া পাঠ আদায় করিয়া লইয়াছে, সেরুপ আর কেহ পারে নাই, সে প্রেরণা সহজলভ্য নয়, তিনি তাহা জানেন।
গত চার বৎসরের স্মৃতি-জড়ানো দেওয়ানপুর হইতে বিদায় লইবার সময়ে অপুর মন ভালো ছিল না। দেবব্রত বলিল-তুমি চলে গেলে অপূর্বদা, এবার পড়া ছেড়ে দেবো।
নির্মলার সঙ্গে বাহিরের ঘরে দেখা। ফাখুন মাসের অপূর্ব অদ্ভুত দিনগুলি। বাতাসে কিসের যেন মৃদু মিগ্ধ, অনির্দেশ্য সুগন্ধ। আমের বউলের সুবাস সকালের রৌদ্রকে যেন মাতাল করিয়া তুলিয়াছে। কিন্তু অপুর আনন্দ সে-সব হইতে আসে নাই—গত কয়েকদিন ধরিয়া সে রাইডার হ্যাগার্ডের ক্লিওপেট্রা পড়িতেছিল। তাহার তরুণ কল্পনাকে অদ্ভুতভাবে নাড়া দিয়াছে বইখানা। কোথায় এই হাজার হাজার বৎসরের পুরাতন সমাধি-জ্যোৎস্নাভরা নীলনদ, বিস্মৃত রা দেবের মন্দির!-ঔপন্যাসিক হ্যাগার্ডের স্থান সমালোচকের মতে যেখানেই নির্দিষ্ট হউক তাহাতে আসে যায় না—তাহার নবীন, অবিকৃত মন একদিন যে গভীর আনন্দ পাইয়াছিল বইখানা হইতে—এইটাই বড়ো কথা তাহার কাছে।
নির্মলার সহিত দেখা অপুর মনের সেই অবস্থায়,—অপ্রকৃতিস্থ, মত্ত, রঙিন—সে তখন শুধু একটা সুপ্রাচীন রহস্যময়, অধুনালুপ্ত জাতির দেশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে! ক্লিওপেট্রা? হউন তিনি সুন্দরী—তাহাকে সে গ্রাহ্য কবে না! পিরামিডের অন্ধকার গর্ভগৃহে বহু হাজার বৎসরের সুপ্তি ভাঙিয়া সম্রাট মেঙ্কাউরা গ্রানাইট পাথরের সমাধি-সিন্দুকে যখন রোষে পার্শ্বপরিবর্তন করেন-মনুষ্য সৃষ্টির পূর্বেকার জনহীন আদিম পৃথিবীর নীরবতার মধ্যে শুধু সিহোর নদী লিবিয়া মরুভূমির বুকের উপর দিয়া বহিয়া যায়—অপূর্ব রহস্যে ভরা মিশর! অদ্ভুত নিয়তির অকাট্য লিপি! তাহার মন সারা দুপুর আর কিছু ভাবিতে চায় না।
